হোলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ড: ১০ বছর পরেও শুনানির অপেক্ষায় লিভ টু আপিল
রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ও হত্যাকাণ্ডের এক দশক পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের সেই ভয়াবহ হামলায় ২২ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টের ধাপ পেরিয়ে এখন মামলাটি রয়েছে আপিল বিভাগের দোরগোড়ায়। হাইকোর্টের দেওয়া আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে জীবিত ছয় আসামির করা লিভ টু আপিল এখনও শুনানির অপেক্ষায় থাকায় মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
লিভ টু আপিল হলো আপিল করার অনুমতি চেয়ে করা আবেদন। আপিল বিভাগ আবেদনগুলো গ্রহণ করলে মামলাটি পূর্ণাঙ্গ আপিল হিসেবে শুনানি হবে। অন্যথায় হাইকোর্টের রায় বহাল থাকবে। ফলে বহুল আলোচিত এই মামলার পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করছে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে নব্য জেএমবির সশস্ত্র সদস্যরা হামলা চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জন জিম্মিকে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ইতালির ৯ জন, জাপানের ৭ জন, ভারতের একজন এবং বাংলাদেশের তিনজন নাগরিক। জিম্মিদের উদ্ধারে অভিযানের প্রস্তুতিকালে জঙ্গিদের হামলায় পুলিশের দুই কর্মকর্তা নিহত হন। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এ পাঁচ হামলাকারী নিহত হয় এবং ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল নব্য জেএমবির সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের ২২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় ২০২৫ সালের ১৭ জুন প্রকাশিত হওয়ার পর আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জীবিত ছয় আসামি আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন। বর্তমানে সেই আবেদনগুলোর শুনানির তারিখ নির্ধারণের অপেক্ষা চলছে।
আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামির একজন আসলাম হোসেন ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দিদের পালানোর চেষ্টার সময় কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন। ফলে বর্তমানে জীবিত ছয় আসামির আবেদনই বিচারাধীন রয়েছে।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, সাক্ষ্য-প্রমাণ, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ফরেনসিক, ব্যালিস্টিক, ডিএনএ ও ইমিগ্রেশন রিপোর্টসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে নিষিদ্ধঘোষিত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের উগ্রপন্থি অংশ নব্য জেএমবি পরিচয়ে এই হামলা পরিচালনা করে।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গি জীবিত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেত। তবে পরিকল্পনাকারী সাত আসামির বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, অর্থায়ন, অস্ত্র সংগ্রহ, হামলাকারী নির্বাচন, প্রশিক্ষণ ও হামলায় প্ররোচনার অভিযোগ প্রমাণিত হলেও বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড আইনগতভাবে যথাযথ ছিল না। তাই তাঁদের আমৃত্যু কারাদণ্ডই ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মত দেন হাইকোর্ট।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হোলি আর্টিজান হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জঙ্গি হামলা। বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন নয়, তবে সরকার চায় আইনের সব ধাপ অনুসরণ করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হোক।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ায় এই মামলার আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে। তাই আপিল বিভাগে মামলাটির দ্রুত শুনানি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপক্ষ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে এবং আইনানুগভাবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
মতামত দিন