Views Bangladesh Logo

ভাদ্রের গরমে হাঁসফাঁস, আশ্বিনে শীতের আভাস

ভাদ্রের দুপুর। জানালার বাইরে রোদ ঝলসে দিচ্ছে উঠোন। বাতাস বইছে, অথচ শরীরে তার কোনো শীতলতা নেই। ঘামের আস্তরণে ভিজে যাচ্ছে কপাল, ঘাড়, পিঠ। ফ্যানের নিচেও যেন বাতাস গরম। তার ওপর ঘন ঘন লোডশেডিং—বিদ্যুৎ চলে গেলেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ফ্যান, ঘরের চার দেয়াল মুহূর্তেই হয়ে উঠছে উত্তপ্ত বাক্স। বাইরে বৃষ্টি নামার অপেক্ষা, ভেতরে স্বস্তির অপেক্ষা—দুই-ই যেন দীর্ঘ হচ্ছে। এই ভ্যাপসা গরমের সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে বৈশ্বিক আবহাওয়ার আরেক অস্বস্তিকর বার্তা—শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো।

তবে প্রকৃতি যেন উত্তাপের এই শেষ অধ্যায়ও লিখে ফেলেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক, অর্থাৎ আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি থেকেই ধীরে ধীরে গরম কমতে শুরু করবে। সকালের বাতাসে ফিরবে হালকা শীতলতা, কোথাও কোথাও দেখা দেবে শিশিরের রেখা। দেশের সর্বোত্তরের জেলা পঞ্চগড়—হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘার সবচেয়ে কাছের এই জনপদেই হয়তো সবার আগে ভোরের বাতাসে টের পাওয়া যাবে ঋতুবদলের সেই গোপন সংবাদ। তারপর ধীরে ধীরে উত্তরের সেই শীতলতা নামবে দেশের অন্য প্রান্তে। ভাদ্রের এই গরম তাই কেবল গরম নয়; এর বুকের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি।

গ্রামবাংলার পুরোনো কথায় এই সময়টাকে বলা হতো ‘ভাদ্রের তালপাকা গরম’। বর্ষা তখনও পুরোপুরি বিদায় নেয়নি, আবার শরৎও তার সাদা মেঘের নৌকা নিয়ে পুরোপুরি হাজির হয়নি। আকাশে রোদ, মাটিতে জমে থাকা বর্ষার পানি, বাতাসে জলীয় বাষ্প—সব মিলিয়ে প্রকৃতি তৈরি করে এক অদ্ভুত উষ্ণ আবরণ।

আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ সোমবার বলেন, ভাদ্র মাসের এই গরম অনেকটাই চিরাচরিত। একসময় গ্রামবাংলায় একে বলা হতো ‘ভাদ্রের তালপাকা গরম’। বর্ষার শেষ প্রান্তে এসে প্রকৃতি যেন গ্রীষ্মের উত্তাপটুকু আরেকবার ফিরিয়ে আনে। এটা ন্যাচারালিই এরকম। এই সময়টাতে ন্যাচারালিই এই গরমটা থাকে। আশ্বিন আসতেই গরমের তীব্রতা কমে আসবে। তখন রোদে থাকলে অনেক গরম লাগলেও ছায়ায় গেলেই ঠান্ডা অনুভূত হবে। শেষ রাতে ও ভোরে কিছুটা ঠান্ডা ভাব চলে আসবে।

এই গরমের সবচেয়ে বড় কারণ বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য। বর্ষাকালে খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ে জমে থাকা বিপুল পানি সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে বাতাসে মিশে যায়। দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে আসা বাতাসেও থাকে প্রচুর জলীয় বাষ্প।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকলে তার তাপ ধারণক্ষমতাও বেশি হয়। ফলে চারপাশের বাতাস নিজেই উষ্ণ থাকে। তার সঙ্গে যোগ হয় সূর্যের তাপ। বৃষ্টিপাত সামান্য কমে গেলেই তৈরি হয় সেই পরিচিত ভ্যাপসা গরম—যে গরমে ছায়াতেও স্বস্তি মেলে না। এটা স্বাভাবিক ঋতুচক্রের অংশ। তবে ভাদ্র মাস শেষ হলেই, অর্থাৎ ইংরেজি ক্যালেন্ডারে সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে এই গরম কমতে শুরু করবে। সূর্যের আলো তখন উত্তর গোলার্ধে (যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান) তীর্যকভাবে পড়বে। তাই রোদের তাপ কমতে থাকবে। তখন ধীরে ধীরে উত্তরের শীতল হাওয়া বিচ্ছিন্নভাবে দেশে প্রবেশ করবে। এতে জলীয় বাষ্পের আধিক্য কমে আসবে এবং ভ্যাপসা গরম কমতে থাকবে।

কিন্তু এখন কেন এতটা হাঁসফাঁস?
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতা। বর্ষাকালে নদী, খাল-বিল, পুকুর ও জলাশয়ে জমে থাকা বিপুল পানি সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে বাতাসে মিশে যায়। বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে আসা বাতাসও বয়ে আনে বিপুল জলীয় বাষ্প।

ফলে বাতাস শুধু গরম নয়, হয়ে ওঠে ভারীও। শরীরের ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। ঘাম শুকিয়ে শরীরকে ঠান্ডা করার যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, আর্দ্র বাতাসে সেটিই বাধাগ্রস্ত হয়। তাই থার্মোমিটারে তাপমাত্রা যতটা দেখায়, শরীরে অনুভূত হয় তার চেয়ে বেশি।

এই অস্বস্তির মধ্যেই অবশ্য বৃষ্টির সম্ভাবনা স্বস্তির খবর হয়ে আসছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১ থেকে ৪ সেপ্টেম্বর দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর ও খুলনা বিভাগে বৃষ্টির প্রবণতা তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। ঢাকা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহেও দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

বৃষ্টি নামলে মেঘের আড়ালে চলে যায় সূর্যের তেজ। মাটিতে সরাসরি কম পৌঁছায় সৌর বিকিরণ। সঙ্গে বাড়ে বাতাসের প্রবাহ। ফলে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু বৃষ্টি না থাকলে সেই আর্দ্রতা আর তাপ মিলে আবারও ফিরিয়ে আনতে পারে ভ্যাপসা অস্বস্তি।

এরই মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া এল নিনো পরিস্থিতি নতুন করে নজর কেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA)-এর আগস্টের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। উত্তর গোলার্ধের ২০২৬ সালের শরৎ ও শীত মৌসুমে খুব শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি। অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে ১৯৫০ সালের পরের ঘটনাগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক মাত্রার শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনাও ৬৯ শতাংশ।

এল নিনো নিজে বাংলাদেশের প্রতিটি দিনের গরমের সরাসরি কারণ—এমন সরল সমীকরণ অবশ্য নেই। কিন্তু এটি প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহে বড় পরিবর্তন ঘটিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ু ও বৃষ্টিপাতের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে এশিয়ার কিছু অঞ্চলে কম বৃষ্টিপাত ও বেশি উষ্ণতার ঝুঁকি বাড়ে। চলতি বছর ভারতের মৌসুমি বৃষ্টিপাতেও এল নিনোর প্রভাবের কথা উঠে এসেছে।

তারপরও ঋতুর নিজস্ব ঘড়ি থেমে নেই। ভাদ্র পেরিয়ে আসবে আশ্বিন। ক্যালেন্ডারের পাতায় সেপ্টেম্বরের শেষভাগে পৌঁছাতেই প্রকৃতির শরীরে বদলের প্রথম রেখা স্পষ্ট হতে শুরু করবে। পঞ্চগড়ের ভোরে হয়তো দেখা যাবে পাতলা কুয়াশা। ঘাসের ডগায় শিশির। দূরের পাহাড়ের গায়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার সাদা আভা তখনও জেগে থাকবে, কিন্তু বাতাসে থাকবে অন্য এক অনুভূতি—শীত আসছে। কার্তিকে সেই বার্তা আরও স্পষ্ট হবে। অগ্রহায়ণে রাত বাড়বে, কমবে তাপমাত্রা। তারপর পৌষ-মাঘে এসে উত্তর-পশ্চিমের শুষ্ক ঠান্ডা বাতাস আর কুয়াশা মিলে বাংলাকে পরিয়ে দেবে শীতের চাদর।

তাই ভাদ্রের এই দমবন্ধ গরমের মধ্যেও স্বস্তির একটি গল্প আছে। এই গরমই শেষ গরম নয়তো, অন্তত শেষ বড় অস্বস্তির গরম। সামনে অপেক্ষা করছে ঋতুবদলের নরম দরজা। ভাদ্র তাই শুধু তীব্র ভ্যাপসা গরমের নাম নয়; তার বুকেই লুকিয়ে থাকে ঋতু বদলের প্রথম গোপন সংকেত।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ