Views Bangladesh Logo

গ্রামীণ ব্যাংকের সুদহার বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো কেন নয়, প্রশ্ন হাই কোর্টের

গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কেন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাই কোর্ট। একই সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইউনূসকে বিবাদী করে তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও কর ফাঁকিসহ একাধিক অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়েছে।

সোমবার জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট মামলার প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের বেঞ্চ এই রুল জারি করে। রিটকারী পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাসুদ আর সোবহান ও ফাতেমা চৌধুরী।

আইনজীবী ফাতেমা চৌধুরী জানান, আদালত দুটি বিষয়ে রুল দিয়েছে। প্রথমত, গ্রামীণ ব্যাংকের সাধারণ ক্ষুদ্রঋণে প্রায় ২০ শতাংশ সুদের হার বাণিজ্যিক ব্যাংকের হারের সঙ্গে সমন্বয় করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক ব্যাংকে ১০০ টাকা ঋণ নিয়ে ৩০০ টাকা পরিশোধ করলে ঋণ থেকে অব্যাহতির যে সুবিধা আছে, গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষেত্রেও কেন একই সুবিধা দেওয়া হবে না। রিট আবেদনে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের আইনে এমন কোনো সুবিধা না থাকায় ভূমিহীন ঋণগ্রহীতারা বছরের পর বছর কেবল পরিশোধ করতে থাকেন, কিন্তু ঋণমুক্ত হতে পারেন না। তবে মামলায় কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়া হয়নি বলে জানান এই আইনজীবী।

রিট আবেদনে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদের হারকে ‘অত্যন্ত বেশি ও শোষণমূলক’ বলে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংককে এই হার কমানোর নির্দেশ দিতে আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়। মামলায় বিবাদী করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব, গ্রামীণ ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বর্তমান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে।

রিট আবেদনে ইউনূসের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী ৬০ বছর বয়সে পদ ছাড়ার নিয়ম থাকলেও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানকে ‘প্রভাবিত করে’ আরও পাঁচ বছর পদে থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। এরপর ৬৫ বছরের বেশি বয়সেও আরেক মেয়াদের জন্য নিয়োগ দাবি করলে অর্থ মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাখ্যান করে এবং হাই কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াইয়েও হেরে যান তিনি। এরপর থেকে ‘পরামর্শক’ হিসেবে ব্যাংকটির নীতি নির্ধারণ করে আসছেন বলে রিটে দাবি করা হয়। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের মুনাফা দিয়ে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নিয়ে ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে কর দিতে অস্বীকৃতির অভিযোগও রয়েছে, যদিও শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ তা আদায় করতে সক্ষম হয়।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বলা হয়েছে, ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালীন ২০২৫ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত ৬৭৭ কোটি টাকা বা প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ডলারের আয়কর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড হঠাৎ সম্পূর্ণ মওকুফ করে দেয়, যার কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না বলে দাবি করা হয় রিটে। এটিকে ‘আর্থিক লাভের জন্য ক্ষমতার অপব্যবহারের স্পষ্ট দৃষ্টান্ত’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক কর্মচারীকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও আনা হয়েছে, যদিও শ্রমিক ইউনিয়ন শ্রম আদালতে মামলা করে জয়লাভের পর ব্যাংক শেষ পর্যন্ত পাওনা মেটাতে বাধ্য হয়।

উল্লেখ্য, ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ২৮ বছর গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক ও ইউনূসকে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অবসরের বয়স পেরিয়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর সেই ইউনূসের নেতৃত্বেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় এবং পরে তার বিরুদ্ধে আগের রায়ও বাতিল করা হয়।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ