Views Bangladesh Logo

বায়ুদূষণ রোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাগুলো তিন বছরেও উপেক্ষিত

দিন দিন বেড়েই চলছে রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ। বাংলাদেশের রাজধানীর নাম বিশ্বে শীর্ষ দশ দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঘুরেফিরে থাকছেই। এই শহরের দূষণ প্রতিনিয়ত ভেঙেছে পূর্বের রেকর্ড। এরপরেও বায়ুদূষণ রোধে ২০২০ সালে হাইকোর্টের দেওয়া ঐতিহাসিক ৯ দফা নির্দেশনা মানছে না সংশ্লিষ্টরা।

বায়ুদূষণের শারীরিক ও মানসিক প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গিয়েছে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ হচ্ছে ঢাকায়। এই শহরের যানজট ও নির্মাণাধীন প্রকল্পের কারণে যে পরিমাণ বায়ুদূষণ হয়, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুমানের চেয়ে ১৫০ শতাংশ বেশি এবং ইটভাটার কারণে যে দূষণ হয় তা ১৩৬ শতাংশ বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রা থেকে ১ শতাংশ দূষণ বাড়লে বিষণ্নতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা ২০ গুণ বেড়ে যেতে পারে।

ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করে আসছে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, চলতি বছরের প্রথম দুই মাস গত ৭ বছরে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষিত সময় নিয়ে বিগত ৭ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে শীর্ষ অবস্থানে ছিল ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস। ওই মাসে ১০ দিন ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকরের মাত্রায়। একই সঙ্গে ছিল বিশ্বের শীর্ষস্থানে। বাকি দিনগুলোতেও শীর্ষ দশের নিচে নামেনি। এই অবস্থা ছিল গত ফেব্রুয়ারি মাসেও। ওই মাসের ৬ দিন বায়ুদূষণে বিশ্বে শীর্ষ স্থানে ছিল তিলোত্তমা ঢাকার নাম। এই সময়ে ৮ দিন অস্বাস্থ্যকর, ১৪ দিন খুবই অস্বাস্থ্যকর এবং ৬ দিন ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর মাত্রায়। ক্যাপস আরও জানায়, গত বছরের তুলনায় ঢাকায় ২০২৩ সালে বায়ুদূষণ বেড়েছে ৮ শতাংশ। ২০২২ সালে ঢাকার গড় বায়ুমান ছিল ২১৪ একিইউআই। তবে ২০২৩ সালের প্রথম দুই মাসে সেটা দাঁড়িয়েছে ২৩১ একিইউআই। গত ৭ বছরের ক্যাপসের করা বায়ুমানের গড় পর্যালোচনায় বলা হয়েছে বিগত ৬ বছরে বায়ুমানের গড় ছিল ২২১ একিউআই। তবে চলতি বছরের তা দাঁড়িয়েছে ২৩১ একিইউআই।

এমন পরিস্থিতিতে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ এর পার্শ্ববর্তী ৫ জেলার সব অবৈধ ইটভাটা দুই সপ্তাহের মধ্যে উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই আদেশ দেন। আদেশে হাইকোর্ট ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও গাজীপুর জেলায় থাকা অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ করে দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিজিকে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। গত ৩১ জানুয়ারি হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে ঢাকার বায়ুদূষণে কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা জানাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। সেই আদেশ অনুযায়ী গত ৫ ফেব্রুয়ারি রোববার পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ওই প্রতিবেদন দেখে বায়ুদূষণ রোধে আদেশ বাস্তবায়নে দুই সপ্তাহ সময় দেন।

সুইজারল্যান্ডের সংস্থা আইকিউএয়ারের প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিশ্বে বায়ুদূষণের মাত্রার বিচারে গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে গড় হিসেবে সবার ওপরে ছিল বাংলাদেশ ও এই দেশের রাজধানীর নাম। বিশ্বের ১১৭টি দেশ, ৬ হাজার ৪৭৫টি অঞ্চল এবং স্থলভিত্তিক বায়ুর গুণমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে বায়ুদূষণ ডেটার ওপর ভিত্তি করে আইকিউএয়ারের প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে হাইকোর্ট যে আদেশ দেন, তাতে বলা হয়, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া টায়ার পোড়ানো ও ব্যাটারি রিসাইকেলিং বন্ধ। পাশাপাশি ঢাকার পাশের চার জেলা গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা, ঢাকায় বালু, ময়লা ও বর্জ্য বহনের সময় ট্রাকসহ সংশ্লিষ্ট যানবাহন ঢেকে চলাচল করার ব্যবস্থা নিশ্চিতসহ ৯ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়। আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হলে ফেব্রুয়ারিতে বায়ুদূষণ কিছুটা কমতে থাকে। তবে বর্তমানে ঢাকা শহর আবার সর্বোচ্চ বায়ুদূষণের শহর বলে গণমাধ্যমে এসেছে। তাই গণমাধ্যমের খবর যুক্ত করে ১৫ নভেম্বর আবেদনটি করা হয়। গণমাধ্যমে বায়ুদূষণের যে বর্ণনা আছে, তা সবার জন্য উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে নাগরিকদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার খর্ব হতে পারে বলে পর্যবেক্ষণ দেন আদালত।’ মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তর যে প্রতিবেদন দিয়েছে সেটাতে আদালত বলছেন- ‘যথেষ্ট নয়।’ কয়েকটা গাড়ির কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু অবৈধ ইটভাটার উচ্ছেদে ব্যবস্থা নেয়নি। তাই দুই সপ্তাহের মধ্যে ঢাকার আশেপাশের পাঁচ জেলায় অবৈধ ইটাভাটা বন্ধ করে পরিবেশ অধিদপ্তরকে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। সিটি করপোরেশনকে বলেছেন পর্যাপ্ত পানি ছিটাতে। ঢাকা শহরের মধ্যে বালি বা মাটি বহনকারী ট্রাকগুলোকে ঢেকে পরিবহন করা, যে সব জায়গায় নির্মাণকাজ চলছে সেসব জায়গার ঢেকে রাখাসহ আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০২০ সালে হাইকোর্ট ৯ দফা নির্দেশনা দিলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এটা খুবই দুঃখজনক। কারণ যারা বাস্তবায়ন করবেন তারাও তো এই শহরেরই বাসিন্দা। তাদের কারো মধ্যে কোনো সচেতনতা নেই।’

এর আগে বায়ুদূষণরোধে ৯ দফা নির্দেশনা দিয়ে ২০২০ সালে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। নির্দেশনাগুলো হচ্ছে- ১. ঢাকা শহরের মধ্যে বালি বা মাটি বহনকারী ট্রাকগুলোকে ঢেকে পরিবহন করতে হবে। ২. যেসব জায়গায় নির্মাণকাজ চলছে সেসব জায়গার কনট্রাকটররা তা ঢেকে রাখবেন। ৩. ঢাকার সড়কগুলোতে পানি ছিটানোর নির্দেশ ছিল, এখনো পানি ছিটানো হচ্ছে না, সব সড়কে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ৪. সড়কের মেগা প্রজেক্টের নির্মাণ কাজ এবং কার্পেটিংসহ যেসব কাজ চলছে, সেসব কাজ যেন আইন কানুন এবং চুক্তির টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন মেনে করা হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ৫. যেসব গাড়ি কালো ধোঁয়া ছাড়ে সেগুলোকে জব্দ করতে হবে। ৬. সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির ইকোনমিক লাইফ নির্ধারণ করতে হবে এবং যেসব গাড়ি পুরাতন হয়ে গেছে, সেগুলো চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। ৭. যেসব ইটভাটা লাইসেন্সবিহীন চলছে, এর মধ্যে যেগুলো এখনো বন্ধ করা হয়নি, সেগুলো বন্ধ করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়। ৮. পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া টায়ার পোড়ানো এবং ব্যাটারি রিসাইক্লিং বন্ধ করতে হবেএবং ৯. মার্কেট এবং দোকানের বর্জ্য প্যাকেট করে রাখতে হবে। এরপর মার্কেট ও দোকান বন্ধ হলে সিটি করপোরেশনকে ওই বর্জ্য অপসারণ করার নির্দেশ দেয়া হয়।

বায়ুদূষণ রোধে সারাদেশে অবৈধ ইটভাটা বন্ধে অভিযান চালানোসহ দ্রুত পদক্ষেপ নিতে গত ১ মার্চ দেশের সব জেলা প্রশাসককে (ডিসি) নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিতে দেশের সব অবৈধ ইটভাটা, বিশেষ করে অধিক ক্ষতিকর ইটভাটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বন্ধ করতে বলা হয়েছে। কোনো লাইসেন্স ছাড়াই নতুন করে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম জোরদার করতে বলা হয়। যে জেলাগুলোতে বৈধ ইটভাটার চেয়ে অবৈধ ইটভাটা বেশি, সেসব জেলার প্রশাসককে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বলা হয়েছে।

এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার পাশের আমিন বাজার, সাভার, নরসিংদী, গাজীপুর, টঙ্গী, মানিকগঞ্জ, নায়াণগঞ্জ, ফতুল্লাহ, ও মুন্সীগঞ্জে এখনো চলছে শতাধিক অবৈধ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ইটভাটা। হাইকোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে প্রশাসনের নাকের ডগায় চলছে এসব ইটভাটা। এসব এলাকার কিছু ইটভাটা বন্ধ করার সময় চিমনি দিয়ে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস ও কালো ধোঁয়ার কারণে কৃষকদের বোরো খেত ঝলসে গেছে। অধিকাংশ ইটভাটার মালিক আইনকানুনের তোয়াক্কা করেন না। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে মোট ইটভাটার সংখ্যা ৮ হাজার ৩৩টি। এগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৫১৩টির পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই।পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইটভাটা সৃষ্ট দূষণে বয়স্ক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইটভাটার কালো ধোঁয়ার কারণে মানুষের ফুসফুসের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট ও ঠান্ডাজনিত নানা রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া ইটভাটাগুলোতে অবাধে পোড়ানো হচ্ছে জ্বালানি কাঠ। এতে উজাড় হচ্ছে গাছপালা। অধিকাংশ ইটভাটায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স ছাড়াই চলছে ইট পোড়ানো কার্যক্রম। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইনে (২০১৩) নিষেধ থাকার পরেও বেশির ভাগ ভাটাই স্থাপন করা হচ্ছে লোকালয় তথা মানুষের বসতবাড়ি, গ্রাম-গঞ্জ, শহর-বন্দরের অতি সন্নিকটে, কৃষি জমিতে ও নদীর তীরে।

এ বিষয়ে জানাতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার যানবাহনের কালো ধোঁয়া, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও ঢাকার আশাপাশের ইটভাটা এই শহরের বায়ুদূষণের প্রধান কারণ। এসব কারণে ঢাকার বায়ুদূষণ দিন দিন বাড়ছে। দূষণের কারণে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় ও পরিবেশ বিপর্যয় তৈরি হতে পারে। এটাকে সরকারের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। নইলে ভবিষ্যতে এমন ক্ষতি হবে, যেটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।’

রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণে ক্ষোভ প্রকাশ করে এ-সংক্রান্ত রুলের শুনানিতে গত ২৭ নভেম্বর হাইকোর্ট বলেছেন, ‘সন্তানরা বিদেশে থাকে, তাই দেশের বায়ুদূষণ নিয়ে মাথাব্যথা নেই পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের।’ বায়ুদূষণে রাজধানী ঢাকা শীর্ষে- গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সম্পর্কিত সংবাদ নজরে আনলে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন। এদিন বায়ুদূষণ নিয়ে জারি করা রুলের শুনানিও অনুষ্ঠিত হয়। এসময় ঢাকার বায়ুদূষণ রোধে আদালতের ৯ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে সময়সীমা বেঁধে দেন হাইকোর্ট। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ