Views Bangladesh Logo

হাইকোর্টে নজিরবিহীন মামলা নিষ্পত্তি, ১১ দিনেই ৫৮ হাজার

মামলার পাহাড়, বছরের পর বছর অপেক্ষা, আর ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের বারান্দায় ঘুরতে থাকা বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘশ্বাস- বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার চিত্রে এসব যেন পুরোনো বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার মধ্যেই এবার পুরোনো মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে রেকর্ড গড়লো সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ।

মামলার ভারে নুয়ে থাকা বিচারব্যবস্থার ছবিটা বাংলাদেশের কাছে নতুন নয়। একটি মামলা আদালতে গড়ানোর পর তার রায় দেখতে কখনও কখনও পেরিয়ে যায় বছরের পর বছর। এর সঙ্গে অপেক্ষা বাড়ে, খরচ বাড়ে, বাড়ে অনিশ্চয়তাও। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার ভিড়ে এবার কিছুটা ভিন্ন ছবি দেখা গেল সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে। বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় মাত্র ১১ কার্যদিবসে প্রায় ৫৮ হাজারের বেশি পুরোনো ক্রিমিনাল মিস ও রিট মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। সর্বশেষ গত ৬ আগস্ট ১৪টি ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চে এক যোগে এক দিনেই নিষ্পত্তি হয়েছে ৬ হাজার ৯৬৮টি পুরোনো ক্রিমিনাল মিস মামলা।

সুপ্রিম কোর্ট সূত্র জানায়, গত ৬ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের ১৪টি ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চে এক দিনেই ৬ হাজার ৯৬৮টি পুরোনো ক্রিমিনাল মিস মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর ফলে গত ৭ মে শুরু হওয়া বিশেষ কার্যক্রমে ক্রিমিনাল মিস ও পুরোনো রিট মামলা মিলিয়ে মোট নিষ্পত্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ২৩২টি।

এই সংখ্যা যখন সামনে আসে, তখন পেছনে তাকালে বোঝা যায়, হাইকোর্টের মামলাজটের আকার কতটা বড়। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন ছিল ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি মামলা। এর মধ্যে দেওয়ানি মামলা ১ লাখ ১ হাজার ১৬৮টি, আর ফৌজদারি মামলা ৪ লাখ ২১ হাজার ১৬৩টি। একই সময়ে আপিল বিভাগে বিচারাধীন ছিল আরও ৩৮ হাজার ৭১৩টি মামলা। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের দুই বিভাগ মিলিয়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৫ লাখ ৬১ হাজার ৪৪টি।

এই বিশাল সংখ্যার বিপরীতে পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির বিশেষ উদ্যোগটি যেন স্থির জলের ওপর হঠাৎ ছুটে চলা স্রোত। গত ৭ মে থেকে হাইকোর্টের ক্রিমিনাল মোশন ও রিট মোশন বেঞ্চের বিচারপতিরা প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে দীর্ঘদিনের পুরোনো মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে শুনানি ও নিষ্পত্তি শুরু করেন। শুরুতে কয়েক হাজার করে মামলা নিষ্পত্তি হলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই গতি বেড়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘গত ১৬ জুলাই এক দিনেই ৬ হাজার ৩১৭টি পুরোনো ক্রিমিনাল মিস মামলা নিষ্পত্তি হয়। রিটসহ ওই দিন মোট পুরোনো মামলা নিষ্পত্তি হয় ৬ হাজার ৩৪০টি। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর, ২৩ জুলাই, এক দিনের নিষ্পত্তির সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। হাইকোর্টের ১০টি ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চে সেদিন নিষ্পত্তি হয় ৭ হাজার ৮৫৩টি পুরোনো ক্রিমিনাল মিস মামলা—তখন পর্যন্ত এক কার্যদিবসে এত বেশি পুরোনো ক্রিমিনাল মিস মামলা নিষ্পত্তির এটিই ছিল সর্বোচ্চ রেকর্ড।’

সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২৩ জুলাই পর্যন্ত নয় কার্যদিবসে ৩৫ হাজার ৭৯২টি পুরোনো ক্রিমিনাল মিস মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল। রিট মামলাসহ মোট নিষ্পত্তির সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ৬৯৯টি। এরপর ৬ আগস্ট ১৪টি ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চে আরও ৬ হাজার ৯৬৮টি পুরোনো ক্রিমিনাল মিস মামলা নিষ্পত্তি হয়। ধারাবাহিক এই কার্যক্রমেই ৫৮ হাজার ১০৩ মামলার নিষ্পত্তির তথ্য সামনে এসেছে।

এতো বিপুল সংখ্যক পেনডিং মামলা নিষ্পত্তির নজিরবিহীন ঘটনার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই সাফল্যের গুরুত্ব শুধু সংখ্যার অঙ্কে আটকে নেই। একটি মামলা আদালতে পড়ে থাকা মানে শুধু একটি ফাইলের নড়াচড়া বন্ধ থাকা নয়। তার ভেতরে থাকে কোনো পরিবারের অপেক্ষা, কারও সম্পত্তির অনিশ্চয়তা, কারও ব্যবসার ক্ষতি, কারও জামিনের আশঙ্কা কিংবা ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষা। ফৌজদারি মামলায় সেই অপেক্ষার ভার আরও গভীর। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামি, ভুক্তভোগী, সাক্ষী- সবার জীবনেই মামলার ছায়া থেকে যায়। তাই কয়েক সপ্তাহে হাজার হাজার পুরোনো মামলা নিষ্পত্তি হওয়া বিচারপ্রার্থীদের কাছে শুধু পরিসংখ্যান নয়, অপেক্ষার অবসানেরও বার্তা। বিশেষ করে হাইকোর্টে বিচারাধীন ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি মামলার মধ্যে ৪ লাখ ২১ হাজার ১৬৩টিই যখন ফৌজদারি, তখন পুরোনো ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তিতে এই গতি মামলাজট কমানোর ক্ষেত্রে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।’

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, মামলাজট কমানো এবং বিচার ব্যবস্থার গতিশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই সুপ্রিম কোর্টে এই বিশেষ কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে পুরোনো মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তি অব্যাহত থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘মামলার পাহাড় এক দিনে সরবে না। কিন্তু পাহাড়ের গায়ে যদি প্রতিদিন একটু একটু করে পথ তৈরি হয়, একসময় সেই পথই গন্তব্যের দিকে নিয়ে যায়। হাইকোর্টের এই বিশেষ কার্যক্রমও এখন সেই পথ তৈরিরই এক বড় পরীক্ষা, যেখানে প্রতিটি নিষ্পত্তি শুধু একটি মামলার সমাপ্তি নয়, একজন বিচারপ্রার্থীর দীর্ঘ অপেক্ষারও শেষ।’

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ