হ্যালোইন: মৃত আত্মার স্মৃতি থেকে উৎসবের হাজার বছরের ইতিহাস
বছরের শেষ সন্ধ্যা। চারদিকে ঘনিয়ে আসছে অন্ধকার। কোথাও জ্বলছে আগুন, কোথাও মুখোশে ঢাকা মানুষের আনাগোনা। কারও বিশ্বাস, এই রাতে জীবিত আর মৃতের জগতের মাঝখানের অদৃশ্য দেয়ালটি হয়ে ওঠে অনেকটাই স্বচ্ছ।
মৃত মানুষের আত্মারা ফিরে আসে পৃথিবীতে, ঘুরে বেড়ায় পরিচিত পথঘাটে। তাদের ভয়েই কেউ মুখ ঢাকে, কেউ আগুন জ্বালায়, আবার কেউ সাজিয়ে রাখে খাবার। সময়ের দীর্ঘ পরিক্রমায় সেই ভয়ই একদিন রূপ নেয় উৎসবে। নাম তার হ্যালোইন।
প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর রাত নামলেই বিশ্বের নানা প্রান্তে শুরু হয় এই ব্যতিক্রমী আয়োজন। ভূত, প্রেত, ডাইনি, ভ্যাম্পায়ার কিংবা কঙ্কালের বেশে রাস্তায় নামে মানুষ। বাড়ির দরজায় ঝোলে মাকড়সার জাল, জানালায় উঁকি দেয় কৃত্রিম ভূত, আর অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে ভয়ংকর মুখের কুমড়া। শিশুদের কণ্ঠে শোনা যায় ‘ট্রিক অর ট্রিট’। কোথাও চলে সাজসজ্জার প্রতিযোগিতা, কোথাও জমে ওঠে মুখোশের পার্টি।
আজকের পৃথিবীতে হ্যালোইন মানেই আনন্দ, বিনোদন আর রঙিন আয়োজন। অথচ এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে মৃত্যু, আত্মা, পরলোক এবং ঋতু পরিবর্তন ঘিরে কয়েক হাজার বছরের পুরোনো লোকবিশ্বাসে। যে উৎসব একসময় ছিল অজানা জগতের আতঙ্ক থেকে নিজেকে রক্ষার আয়োজন, আধুনিক সময়ে সেটিই পরিণত হয়েছে বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক সাংস্কৃতিক উৎসবে।
হ্যালোইনের ইতিহাসের শুরু প্রায় দুই হাজার বছর আগে, প্রাচীন কেল্টিক জনগোষ্ঠীর হাত ধরে। বর্তমান আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও উত্তর ফ্রান্সের কিছু অঞ্চলে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ছিল ‘সাওইন’। প্রতি বছর ১ নভেম্বর তারা নববর্ষ উদযাপন করত। দিনটি ছিল গ্রীষ্মের বিদায় এবং দীর্ঘ, শীতল অন্ধকারের আগমনী বার্তা। ফসল তোলার মৌসুম শেষ হয়ে শুরু হতো শীতকাল।
কেল্টিকদের বিশ্বাস ছিল, বছরের শেষ রাত অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর জীবিত মানুষের পৃথিবী ও মৃতদের জগতের মধ্যকার সীমারেখা ক্ষীণ হয়ে আসে। এ সময় মৃতদের আত্মা পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। অতিপ্রাকৃত অশুভ শক্তির আনাগোনাও বেড়ে যায়। সেই অদৃশ্য আতঙ্ক থেকে বাঁচতে তারা বড় বড় আগুন জ্বালাতেন। পশুর চামড়া ও ভয়ংকর মুখোশ পরে নিজেদের চেহারা আড়াল করতেন, যাতে আত্মারা তাদের চিনতে না পারে। মৃত আত্মাদের উদ্দেশে খাবার ও পানীয় উৎসর্গ করার রীতিও প্রচলিত ছিল।
কালের পরিক্রমায় এই লোকজ উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয় ধর্মীয় ঐতিহ্য। রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তারের পর কেল্টিক অঞ্চলে রোমানদের বিভিন্ন উৎসব ও স্থানীয় সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটে। পরে খ্রিষ্টধর্মের প্রসারের সঙ্গে ১ নভেম্বর পালিত হতে শুরু করে ‘অল সেইন্টস ডে’ বা সব সন্তের স্মরণ দিবস। এর আগের সন্ধ্যা পরিচিত হয় ‘অল হ্যালোজ ইভ’ নামে। সময়ের ব্যবধানে সেই নাম সংক্ষিপ্ত হয়ে দাঁড়ায় ‘হ্যালোইন’। ২ নভেম্বর পালিত হতে থাকে ‘অল সোলস ডে’, যে দিন সাধারণ মৃত মানুষের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করা হতো।
হ্যালোইনের আরেক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ কুমড়া। বাইরে থেকে সাধারণ একটি কুমড়া, অথচ ভেতরটা ফাঁপা করে তাতে খোদাই করা হয় ভয়ংকর মুখ। চোখ-মুখের ফাঁক দিয়ে জ্বলে ওঠে আলো। এই বিশেষ সাজের নাম ‘জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন’। তবে এই ঐতিহ্যের শুরু কুমড়া দিয়ে নয়, আয়ারল্যান্ডে শালগম, আলু কিংবা অন্য সবজিতে মুখ খোদাই করার প্রচলন ছিল।
এর পেছনে রয়েছে স্টিঞ্জি জ্যাক নামের এক ব্যক্তিকে ঘিরে আইরিশ লোককাহিনি। কথিত আছে, জ্যাক শয়তানকে একাধিকবার ধোঁকা দিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর স্বর্গ কিংবা নরক—কোথাও তার স্থান হয়নি। হাতে জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে তাকে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতে হয়। সেই গল্প থেকেই আলো জ্বালানো খোদাই করা সবজির সঙ্গে জড়িয়ে যায় জ্যাক-ও-ল্যান্টার্নের নাম। পরবর্তী সময়ে আইরিশ অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে এই ঐতিহ্য নিয়ে গেলে শালগমের জায়গা দখল করে বড় আকারের কুমড়া। সহজে খোদাই করা যায় বলে সেটিই হয়ে ওঠে হ্যালোইনের প্রধান প্রতীকগুলোর একটি।
শিশুদের কাছে হ্যালোইনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন ‘ট্রিক অর ট্রিট’। বিচিত্র পোশাকে সেজে তারা প্রতিবেশীদের দরজায় কড়া নাড়ে। চায় মিষ্টি, চকলেট কিংবা ক্যান্ডি। না পেলে মজা করে দুষ্টুমি করার হুমকি দেয়। এই রীতির শিকড় মধ্যযুগীয় ইউরোপে। অল সোলস ডে উপলক্ষে দরিদ্র মানুষেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘সোল কেক’ চাইতেন। বিনিময়ে বাড়ির মৃত স্বজনদের আত্মার জন্য প্রার্থনা করতেন। সময়ের সঙ্গে শিশুদের খাবার সংগ্রহের এই রীতি বদলে যায় আধুনিক ট্রিক অর ট্রিটে। আইরিশ ও স্কটিশ অভিবাসীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়া প্রথাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় হ্যালোইন সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে এখনো এর ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ দেখা যায়। যুক্তরাজ্যেও শিশু-কিশোরদের মধ্যে উৎসবটির জনপ্রিয়তা রয়েছে।
অন্যদিকে মেক্সিকোতে ১ ও ২ নভেম্বর পালিত হয় ‘ডে অব দ্য ডেড’। প্রয়াত স্বজনদের স্মরণে কবর সাজানো, প্রিয় খাবার রাখা এবং রঙিন কঙ্কালের সাজে উৎসবে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করা হয়।
তবে ডে অব দ্য ডেড ও হ্যালোইন এক নয়; দুটির রয়েছে স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক শিকড়।
একসময় যে রাতকে ঘিরে মানুষের মনে ছিল অজানা আতঙ্ক, আজ সেই রাতেই আলো, রং আর হাসির মেলা বসে। আত্মার ভয়কে মানুষ পরিণত করেছে কল্পনার খেলায়, মৃত্যুর স্মৃতিকে সাজিয়েছে উৎসবের অনুষঙ্গে। পোশাক, মুখোশ, কুমড়া, মিষ্টি আর বিনোদনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল বাণিজ্যিক আয়োজন। তবু হ্যালোইনের বাহারি মুখোশের আড়ালে আজও বেঁচে আছে প্রাচীন মানুষের সেই বিশ্বাস—জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে হয়তো এমন কিছু রহস্য রয়েছে, যার ব্যাখ্যা মানুষের জানা নেই।
মতামত দিন