Views Bangladesh Logo

ভেটিং শেষে পূর্ণাঙ্গ আইন শীঘ্রই

গুমের ক্ষতিপূরণ দেবে সরকার, তদন্তে থাকছে না মানবাধিকার কমিশন

গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সুরক্ষা, বিচার এবং ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা দিতে শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের পাশাপাশি গুমের কারণে মৃত্যু, মরদেহ উদ্ধার বা পাঁচ বছরেও নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান না মিললে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রকেই সেই অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে চূড়ান্ত আইনে গুমের তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এখতিয়ার থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আইনটি এখন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং শেষে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপ নেওয়ার পথে।

আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনটির খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। এখন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং শেষে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এটি পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপ দেওয়ার কথা রয়েছে। সূত্র জানায়- গুমের নতুন আইনে একে আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি গুম প্রতিরোধ, দায়ীদের বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও পরিবারের অধিকার সুরক্ষাকে আইনের মূল লক্ষ্য করা হয়েছে।

গুমের শিকার ব্যক্তিকে উদ্ধারে আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারির বিধান রাখা হয়েছে। অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতেও বিচার চালানোর সুযোগ থাকবে। ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণের পাশাপাশি সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও থাকছে।

ভুক্তভোগীর পরিবারকে তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকবে। ক্ষতিপূরণ দিতে গঠন করা হবে তহবিল। ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে প্রথমে দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে অর্থ আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। সেটি সম্ভব না হলে রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ দেবে। গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তাঁর সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগও থাকবে।

কোনো ব্যক্তি গুম হওয়ার পর পাঁচ বছরেও জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার না হলে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য গুম সনদ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। গুমের ঘটনাগুলোর তথ্য সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও থাকবে। তদন্ত ও বিচার দ্রুত শেষ করতে সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত এবং পরবর্তী ১২০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে।

গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। আর গুমের ফলে মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে অথবা পাঁচ বছর পরও নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা না গেলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘গুমের মতো গুরুতর অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনের অসঙ্গতি ও ‘গ্যাপ’ দূর করতে সরকার যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের কাজ করছে। গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, বিচার এবং ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা দিতে শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। গুমসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে অংশীজন সভায় তিনি বলেন, ‘গুমের তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এখতিয়ার থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল গুম প্রতিরোধ আইনটি যাতে কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকার গুম থেকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে; সেই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন আইনের শুরুতেই থাকা প্রয়োজন।’ কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা না দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য রাখার পক্ষেও মত দেন তিনি।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে গুমের বিচার ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছি। স্বাধীন দেশে স্বাধীন নাগরিকদের গুম হওয়া মেনে নেওয়া যায় না এবং প্রতিটি গুমের বিচার দেশেই হওয়া উচিত।’ তবে চূড়ান্ত আইনে গুমের তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এখতিয়ার থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত মোটেই যুক্তিযুক্ত হয়নি বলে মন্তব্য করে তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মো. ওমর ফারুক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘গুম সংক্রান্ত ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত খসড়া আইনটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষায় এই আইনের কোনো বিকল্প নেই। এ ধরণের আইন অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিলো।’

তিনি বলেন, ‘নতুন আইনটি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে শুধু কঠোর শাস্তির বিধানের ওপর নয়; গুমের অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান, দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগী পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও। তাই আইনে গুমের তদন্তের দায়িত্ব থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এখতিয়ার থেকে বাদ দেওয়াটা ঠিক হবে না। এতে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।’

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ