Views Bangladesh Logo

এআই যুগের বিশ্বযুদ্ধ: কোন জোটে বাংলাদেশ?

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন এক বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হলো। আগের মতোই বিশ্বযুদ্ধের একপক্ষের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যপক্ষে চীন আর রাশিয়া। যথারীতি যুদ্ধের শুরুটা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে ইন্টারন্যাশনাল টেক সামিটের শেষ দিনে ২৫টি দেশের চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্যাক্স সিলিকা জোট গঠিত হয়। এই জোট গঠনের মূল লক্ষ্য ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বিশ্ব প্রযুক্তি বাজারে চীনের প্রভাবকে দুর্বল করা। মূলত এই জোটে সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রযুক্তি খাতের শক্তিশালী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এক ছাতার নিচে আসে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে এ জোটে যোগ দিয়েছে ভারত।

প্যাক্স সিলিকা জোট গঠনের পর চীন বসে থাকেনি। স্বভাবসুলভভাবে চীনের নেতৃত্ব নীরব থেকেই প্যাক্স সিলিকার কার্যক্রম এবং এর গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যাচ্ছে, সেদিকে নজর রাখছিল। তবে চলতি বছরের জুন মাসে ২৭টি সদস্য দেশের সমর্থন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্যাক্স সিলিকায় যোগ দেওয়ার পর চীনের সামনে তড়িঘড়ি পাল্টা জোট গঠনের কোনো বিকল্প থাকল না। মাত্র এক মাস পরই ১৬ জুলাই চীনের নেতৃত্বে পাল্টা জোট গঠন করা হয়, যার নাম ওয়ার্ল্ড এআই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (ওয়াইকো)। ২৯টি দেশ এ জোটের সদস্য। দক্ষিণ এশিয়া থেকে এ জোটের সদস্য পাকিস্তান। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এই জোট গঠনে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ গত পহেলা আগস্ট ওয়াইকোর পর্যবেক্ষক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ‘এআই উদ্ভাবনে বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং তথ্যপ্রযুক্তির বৈষম্য কমিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায় ওয়াইকো। একইসঙ্গে এআই প্রযুক্তির বিকাশে একটি উন্মুক্ত, ন্যায্য ও বৈষম্যহীন পরিবেশ তৈরি করা এর লক্ষ্য। সংস্থাটি এমন নিয়মকানুনকে উৎসাহিত করে, যা মানবজাতির জন্য এআই প্রযুক্তিকে নিরাপদ ও কল্যাণকর রাখবে।’ অর্থাৎ, বাংলাদেশ সরকার ওয়াইকোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি সমর্থন দিচ্ছে, বিজ্ঞপ্তি থেকে এটাই প্রমাণিত হয়। তবে যে সময় বাংলাদেশ এই সমর্থন দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সের্গিও গর ঢাকা সফরে ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি পাঠানোর পরের দিন ২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করলেন মার্কিন দূত। আর সে বৈঠকে সের্গিও গর বাংলাদেশকে প্যাক্স সিলিকা জোটে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোন দিকে যাবে বাংলাদেশ? যদিও বাংলাদেশ একঅর্থে ওয়াইকোর প্রতি সমর্থন দিয়েছে, তবে যেহেতু সদস্য হয়নি, শুধু পর্যবেক্ষক, সে কারণে প্যাক্স সিলিকায় যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায়নি। প্রশ্ন আরও উঠছে, যখন মার্কিন দূত ঢাকায়, ঠিক সেই মুহূর্তেই কেন ওয়াইকোর পর্যবেক্ষক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘোষণা দিল বাংলাদেশ? চীনের দিক থেকে বড় কোনো চাপ ছিল, প্যাক্স সিলিকায় যোগ না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য?

আসুন কোন জোটে কোন কোন দেশ আছে, সেই তালিকাটা একটু দেখে নেই। প্যাক্স সিলিকাভুক্ত ২৫টি দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র (নেতৃত্বদানকারী দেশ), যুক্তরাজ্য, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, গ্রিস, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ইসরায়েল, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, আর্জেন্টিনা, চিলি, কোস্টারিকা, এল সালভাদর, পানামা এবং কাজাখস্তান। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে এ জোটের অংশীদার হয়েছে।

অন্যদিকে ওয়াইকোভুক্ত দেশগুলো হচ্ছে চীন (নেতৃত্বদানকারী দেশ), রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, বেলারুশ, সার্বিয়া, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, আলজেরিয়া, ক্যামেরুন, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, লেসোথো, মোজাম্বিক, সেনেগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাম্বিয়া, ব্রাজিল, কিউবা, নিকারাগুয়া এবং ভেনেজুয়েলা।

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, কাজাখস্তান দুই জোটেই আছে। পররাষ্ট্রনীতিতে কাজাখস্তান ‘মাল্টি-ভেক্টর’ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে। এই নীতি দেশটির পৃথিবীর প্রতিদ্বন্দ্বী সব পক্ষ বা দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন ও রক্ষার বিষয়টি অনুমোদন করে। প্যাক্স সিলিকা কিংবা ওয়াইকোতে একই সঙ্গে দুটি দেশ যোগ দিতে পারে এবং দুই জোটের নীতিও এটা সমর্থন করে। সেই সুযোগই কাজাখস্তান নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে কি এই সুযোগ নেওয়া সম্ভব?

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সুযোগ নেওয়া অসম্ভব নয়, তবে কঠিন। কারণ ঐতিহাসিকভাবে এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থান থেকে কাজাখস্তান যে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, বাংলাদেশ সে অবস্থানে নেই। বাংলাদেশ ভারসাম্যের কূটনীতিতেই বিশ্বাস করে। কিন্তু বাস্তবে সেই নীতি সব সময় রক্ষা করতে পারে না, মূলত তিনটি কারণে। প্রথমত, বাংলাদেশে সরকার বদলালেই জাতীয় নীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির বাঁক বদল হয়। নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্থিতিশীল নয়। কারণ বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলই দেশের আভ্যন্তরীণ উন্নয়নের নীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সর্বোত্তম নীতি কী হবে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন এবং সংবেদনশীল নয়। ফলে প্রভাবশালী বিদেশি রাষ্ট্রগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের বলয়ে রেখে স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করে অবিরত। যে কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিভক্তও হয়ে পড়ে বিদেশি প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সমর্থক হিসেবে। আমাদের দেশের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতাও এ কারণেই।

দ্বিতীয়ত, উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তানের শত্রুতার সম্পর্কও এ অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য বাড়তি চাপ। বাংলাদেশের জন্য চাপটা আরও বেশি। কারণ বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে। আর সেই যুদ্ধে ভারত বাংলাদেশকে সক্রিয় সমর্থন দিয়েছে। ফলে ভারত-পাকিস্তান শত্রুতার মধ্যে বাংলাদেশ যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চাপের মধ্যে থাকে। যেমন ধরুন, ভারত প্যাক্স সিলিকায় এবং পাকিস্তান ওয়াইকোতে যোগ দিয়েছে। দুই দেশ একসঙ্গে কোনো জোটে যোগ দেয়নি। প্রতিটি ক্ষেত্রে এই শত্রুতার সম্পর্ক শুধু ভারত-পাকিস্তান নয়, পুরো উপমহাদেশকেই উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধি থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে।

তৃতীয়ত, বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সরাসরি অংশ হয়ে গেছে। ফলে বাংলাদেশ চাইলেই একপক্ষকে জোরালোভাবে যেমন সমর্থন দিতে পারে না, তেমনি দুই পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যের নীতি রক্ষা করাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। প্যাক্স সিলিকা এবং ওয়াইকোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ দুটি জোটের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে দুই জোট থেকেই সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলে সেটাই সর্বোত্তম নীতিগত অবস্থান হবে। কারণ তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্ব এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। এমনকি চীন, রাশিয়াও এই নিয়ন্ত্রণের পুরোপুরি বাইরে নয়। অন্যদিকে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দখল করতে চীন প্রস্তুত হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশকে সার্বিক বাস্তবতা এবং অদূর ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে, তার যথাযথ বিশ্লেষণের পরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চাপ আসবে, কিন্তু সেই চাপ মোকাবিলার জন্য কার্যকর কৌশলই সবচেয়ে জরুরি।

প্রকৃতপক্ষে প্রযুক্তি-ভূরাজনীতির এই নতুন অধ্যায়ে নিরপেক্ষতা রক্ষা করা আগের চেয়ে অনেক জটিল। কারণ এখানে প্রশ্নটা শুধু কূটনৈতিক অবস্থানের নয়। বরং তথ্যপ্রযুক্তির উন্নততর অধ্যায়ে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল বিস্ফোরণের এই সময়ে চিপ কোথা থেকে আসবে, ডেটা সেন্টারের প্রযুক্তি কার হবে, ফাইভ-জি এবং ভবিষ্যতের সিক্স-জি নেটওয়ার্কের ভেন্ডর কে হবে, এআই প্রশিক্ষণ ও ক্লাউড অবকাঠামো কোন বলয় থেকে নেওয়া হবে—প্রতিটি বিষয় সামনে রেখে জোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের টেলিকম নেটওয়ার্কের উল্লেখযোগ্য অংশ চীনা ভেন্ডরদের সরঞ্জামে নির্মিত। অন্যদিকে প্রধান রপ্তানি বাজার, রেমিট্যান্সের বড় উৎস এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব। ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি সেবা রপ্তানিতে আমাদের তরুণদের যে সম্ভাবনা, তা বিকশিত হতে পারে পশ্চিমা বিশ্বকে ঘিরেই। এখন বাংলাদেশকে ভাবতে হবে, বাংলাদেশ উচ্চপ্রযুক্তির অংশীদার হবে, নাকি বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তির বাজারেও কেবল সস্তা শ্রমের জোগানদার হয়ে থাকবে? এই প্রশ্ন সামনে রেখেই দুই জোটের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হবে।

সমস্যাটা হচ্ছে, যে দেশের নিজস্ব জাতীয় এআই কৌশল পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, ডেটা সুরক্ষা আইন নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি, সেমিকন্ডাক্টর নীতিমালা কাগজ থেকে কারখানায় পৌঁছায়নি, সে দেশ আন্তর্জাতিক দর-কষাকষিতে দুর্বল অবস্থানে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। একই সঙ্গে দর-কষাকষির মুদ্রা চিনতে হবে। প্যাক্স সিলিকার কাছে বাংলাদেশের আকর্ষণ তার তরুণ জনশক্তি, ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল বাজার ও ভূকৌশলগত অবস্থান। আর ওয়াইকোর কাছে আকর্ষণ গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব ও বিশাল জনসংখ্যা। এই আকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিনিয়োগ ও বাজারসুবিধা আদায় করাই হবে সফল কূটনীতির মাপকাঠি। মনে রাখতে হবে, জোট আমাদের জন্য লক্ষ্য নয়, উপায় মাত্র। প্যাক্স সিলিকা আর ওয়াইকো—দুই দরজাই আপাতত খোলা রাখুক বাংলাদেশ। তবে যে দরজা দিয়েই হাঁটুক, পা ফেলতে হবে নিজের শর্তে, নিজের স্বার্থে।

রাশেদ মেহেদী
তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিশ্লেষক, সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ