রামপুরায় গুলি ও হত্যা: ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি এবং দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বুধবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর তিন বিচারকের স্বাক্ষরের পর রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম এবং বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। তিনজনই বর্তমানে পলাতক।
এ ছাড়া রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চঞ্চল চন্দ্র সরকার বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। রায় ঘোষণার দিন থেকে এক মাসের মধ্যে সাজাপ্রাপ্তরা আপিল করতে পারবেন।
রায়ে যা বলা হয়েছে
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সমন্বিত, ব্যাপক ও পরিকল্পিত আক্রমণের অংশ। রামপুরার হত্যাকাণ্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা সমন্বিতভাবে অংশ নেন।
রায়ে বলা হয়, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে অধীনস্থদের উসকানি দিয়ে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন। তার নির্দেশনায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করা হয়।
এছাড়া রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি টেলিফোন আলাপচারিতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন।
ট্রাইব্যুনালের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এবং ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানকে নিয়ে গঠিত একটি কোর কমিটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে বৈঠক করে। সেখানে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং পরে তা মাঠপর্যায়ের পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
রায়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর বনশ্রী এলাকায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি চালায়। এ সময় রামপুরা থানার কাছে একটি বাসার গ্যারেজে দাঁড়িয়ে থাকা সাত বছর বয়সী মুসা খান ও তার দাদি মায়া ইসলাম একই গুলিতে আহত হন। গুলিটি প্রথমে শিশুটির মাথা ভেদ করে পরে তার দাদির তলপেটে লাগে।
রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনার পর ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান রামপুরা থানায় গিয়ে অভিযানে ভূমিকার জন্য ওসি মশিউর রহমানকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেন।
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অভিযানের তত্ত্বাবধানে ছিলেন এডিসি রাশেদুল ইসলাম ও ওসি মশিউর রহমান। তারা নিজেরাই ভুক্তভোগীদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। পরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে আশ্রয় নেওয়া আমির হোসেনকে এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার আবারও গুলি করেন।
মতামত দিন