নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
ফেনীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে দুজনের সাজা বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। চারজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পেয়েছেন বাকি ১০ আসামি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের ১১২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। এর আগে ২৪ আগস্ট একই বেঞ্চ এ মামলার রায় ঘোষণা করেছিলেন।
হাইকোর্ট সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। অন্যদিকে নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা ওরফে পপির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
খালাস পাওয়া ১০ আসামি হলেন কামরুন নাহার মনি, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, আবছার উদ্দিন এবং মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে হাইকোর্টের কাছে ১০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। এ কারণে তাদের খালাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চার আসামির ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে উপযুক্ত সাজা হিসেবে বিবেচনা করেছেন আদালত।
রায়ে নিম্ন আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদের দেওয়া দণ্ডের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল। হাইকোর্ট বলেছেন, ১৬ আসামিকে একসঙ্গে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারক প্রয়োজনীয় বিচারিক বিবেচনা প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রত্যেক আসামির ভূমিকা ও অপরাধে সম্পৃক্ততার মাত্রা পৃথকভাবে মূল্যায়ন না করেই দণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে আদালত পর্যবেক্ষণ করেছেন। এ কারণে বিচারক মামুনুর রশিদকে ফৌজদারি মামলার বিচার ও সাজা নির্ধারণের দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ নুসরাতকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে মামলা করেন তার মা শিরীন আখতার। অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে নুসরাতের ওপর হামলার পরিকল্পনা করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে।
এর ধারাবাহিকতায় ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদরাসায় গেলে নুসরাতকে কৌশলে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।
এরপর ৮ এপ্রিল নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২৮ মে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। দ্রুত বিচার শেষে ৮৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয় ৬১ কার্যদিবসে। পরে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট সাজা পুনর্মূল্যায়ন করে এ রায় দেন।
মতামত দিন