তেলের আগুনে বাজার গরম, লোডশেডিংয়ে রাত, চাপে জনজীবন বেহাল
এক হাতে বাজারের ব্যাগ, অন্য হাতে হিসাবের খাতা—কিন্তু হিসাব আর মিলছে না। বাজারে ঢুকলেই যেন নতুন নতুন দামের ধাক্কা। চাল, ডিম, দুধ, আটা, ময়দা, সবজি—নিত্যদিনের খাবারের তালিকাই এখন সংসারের বাজেটকে টেনে নিচ্ছে নিচের দিকে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের নতুন আগুন। আর সেই আগুনের তাপে শুধু পাম্প নয়, উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পরিবহন, উৎপাদন, বাজার ও মানুষের জীবনযাত্রার খরচ।
এর মধ্যেই বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, দোকান ও কারখানা। কোথাও জেনারেটর চালাতে বাড়তি ডিজেল, কোথাও উৎপাদন বন্ধ, কোথাও ব্যবসার সময় কমে যাচ্ছে। আবার বিদ্যুতের দাম সম্প্রতি বেড়ে যাওয়ায় বিলও আসছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ একদিকে বিদ্যুতের সংকট আর বাড়তি বিল অন্যদিকে জ্বালানির দাম— সব দিকের চাপ এসে পড়ছে একই মানুষের ঘাড়ে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিদ্যুৎ ঘাটতি গ্রামাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, পোলট্রি ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সেপ্টেম্বরের নতুন ধাক্কাটি এসেছে জ্বালানি তেলে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ চার ধরনের প্রধান জ্বালানির প্রতিটির দাম এক লাফে ২০ টাকা বেড়েছে।
এই ২০ টাকা কেবল পাম্পে থেমে নেই- এটাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। তেলের দাম বাড়তেই ট্রাকের ভাড়া বেড়েছে, ট্রাকের ভাড়া বাড়ায় পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে, এতে করে পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে যোগ হয়েছে নতুন মাশুল। ফলে বাজারে যে দুধ, ডিম, চাল, আটা, ময়দা কিংবা সবজি পৌঁছায়, তার দামের ভেতরেও ঢুকে পড়ে জ্বালানির বাড়তি খরচ।
ইতিমধ্যে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পর বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। অর্থাৎ কর্মজীবী মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই খরচ বাড়ছে। বাসভাড়া বাড়ে, অফিসে যেতে খরচ বাড়ে; পণ্য আনতে খরচ বাড়ে, বাজারের দাম বাড়ে। আর বিদ্যুৎ না থাকলে দোকান, কারখানা কিংবা ছোট ব্যবসায় জেনারেটর চালাতে হয়—সেখানেও লাগে ডিজেল। জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যয়ও ফুলে ওঠে।
শিল্পখাতের সংকটও কম নয়। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে অনেক কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বহু কারখানা উৎপাদন কমাতে বা আংশিক বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
সরকারের যুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, জাহাজভাড়া ও আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বিপিসির লোকসানও বেড়েছে। ফলে মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া বিকল্প ছিল না—এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা যে বাস্তব, তা নিয়ে সন্দেহ নেই; কিন্তু সেই ধাক্কার প্রতিটি ঢেউ যখন বাজারের থলে, বাসের সিট আর মাসের বেতনের ওপর এসে আছড়ে পড়ে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই চাপ সামলাবে কিভাবে?
কারণ আয় তো তেলের দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না। বাড়ছে না শ্রমজীবীর মজুরি, বাড়ছে না নিম্ন-মধ্যবিত্তের মাসিক বেতন। বরং সংসারের তালিকা ছোট হচ্ছে। মাছের বদলে ডিম, ডিমের বদলে ডাল; দুধ কমছে, মাংস কমছে, বাজারের পরিমাণ কমছে। তবু মাস শেষে হিসাবের খাতা বলছে—ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধিকে তাই শুধু ‘তেলের দাম বাড়া’ বলে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাসভাড়া, পণ্য পরিবহন, কৃষি উৎপাদন, শিল্পের জ্বালানি, বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার বাজার। অর্থাৎ তেলের দামের এক ফোঁটা ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, জ্বালানি ব্যয়ের ধাক্কা পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে পণ্য ও সেবার দামে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়বে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।’ বাড়তি এই চাপ মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর কৌশল এখনো স্পষ্ট নয় বলেও মনে করেন তিনি।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কৃষি, পরিবহন ও শিল্পসহ অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই পড়বে। বিশেষ করে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ায় নিম্নআয়ের মানুষ, গণপরিবহন ও শিল্পখাতে চাপ বাড়তে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. দীন ইসলাম বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু পরিবহন ব্যয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ঋণের খরচ ও পণ্য বিপণনের ব্যয়ও বাড়তে পারে। ফলে একসঙ্গে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার চাপ তৈরি হবে।’
মিরপুর কাজীপাড়ার বাসিন্দা ও চাকরিজীবী মেইনুল হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, “জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাসভাড়া ও বাজার খরচ দুটোই বাড়ছে। আয় তো বাড়েনি। আগে যে টাকায় সপ্তাহের বাজার করতাম, এখন সেই টাকায় কয়েক দিনের বাজারও ঠিকমতো হচ্ছে না।”
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা ও কাপড় ব্যবসায়ী আনিচ রহমান বলেন, “তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, আর সেই খরচ শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদেরই বহন করতে হয়। পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ বেড়েছে। সবকিছুর দাম বাড়লেও ক্রেতার সামর্থ্য বাড়েনি, তাই ব্যবসায়ও চাপ তৈরি হয়েছে।”
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “অফিসে যাতায়াতের খরচ বেড়েছে, পাশাপাশি বাজারের প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ছে। মাসিক আয় একই থাকায় সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখন প্রয়োজনের বাইরে কোনো খরচ করার সুযোগ নেই।”
খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা ও শিক্ষিকা নারগিস বেগম বলেন, “লোডশেডিং আর দ্রব্যমূল্যের চাপ একসঙ্গে মানুষকে বিপাকে ফেলেছে। সংসারের বাজেট ঠিক রাখতে অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসের পরিমাণ কমাতে হচ্ছে। আয় না বাড়লে এভাবে একের পর এক খরচ বাড়া সাধারণ মানুষের জন্য খুবই কঠিন।”
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ব্যাখ্যায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের চড়া দাম, সমুদ্রপথে পরিবহন ও বিমা ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানির দাম কম থাকায় সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এসব কারণেই সরকারকে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করতে হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্য সমন্বয় ছাড়া সরকারের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।’
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সারা বছর বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করা হবে। ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হবে। বাজারে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করতে দেওয়া হবে না এবং অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর চেষ্টা হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে কাজ চলছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রতিবন্ধকতাগুলোও দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৮৮ শতাংশ ইতোমধ্যে পুনরুদ্ধার হয়েছে। চলমান সমস্যা দ্রুত কাটিয়ে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে।’
এরপরও নির্মম বাস্তবতা হলো- বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে। যে মানুষটি সকালে বাসে চড়ে কাজে যায়, সন্ধ্যায় বাজারের ব্যাগ হাতে বাড়ি ফেরে, রাতে লোডশেডিংয়ে ঘামতে ঘামতে সন্তানকে পড়ায়- তার জীবনে একসঙ্গে এসে জড়ো হচ্ছে তেল, ভাড়া, বাজার আর বিদ্যুতের হিসাব।
পাম্পে তেলের দাম ২০ টাকা বেড়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নটা ২০ টাকার নয়। প্রশ্ন হলো—এই ২০ টাকার ঢেউ আর কত দূর যাবে? আর কত জিনিসের দাম বাড়বে? আর কত ছোট হবে বাজারের ব্যাগ? আর কত অন্ধকার নামবে ঘরে?
মতামত দিন