রাজধানীজুড়ে তেল সংকট আতঙ্ক: পাম্পে দীর্ঘ সাড়ি, ভোগান্তি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হতে পারে— এমন আশঙ্কায় রাজধানীবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আজ শুক্রবার (৬ মার্চ) ছুটির দিনেও এর প্রভাব দেখা গেছে।
সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পের সামনে তেল নিতে মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। চাহিদা মিটাতে না পেরে অনেক পাম্পে ক্রেতাদের মধ্যে তর্কাতর্কি ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে আসাদগেট এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা যানবাহনের দীর্ঘ লাইন সৃষ্টি হয়। এসময় স্টেশনটির সামনে থেকে শুরু হয়ে সড়কের ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির লম্বা সারি চোখে পড়ে। ধীরগতিতে এগোতে থাকা এই লাইনকে ঘিরে ক্রেতাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়।
লাইনে দাঁড়ানো পাঠাও রাইডার ইকবাল হোসেন নিজের হতাশা জানিয়ে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, "আমি রাইড শেয়ার করি, তাই সবসময় ৫ লিটার তেল নিই। কিন্তু গতকাল থেকে লাইনে দাঁড়ানোর পরও ৫ লিটার তেল চাইলে ২টা স্টেশনে পাইনি। আমাকে মাত্র ৩ লিটার তেল দিয়ে বলেছে আর দেয়া যাবে না। আমারা যারা রাইড শেয়ার করি তারা এত কম তেলে কয়দিন চালাব।"
লাইনে অপেক্ষারত আরেক বাইকার মকবুল হোসেন জীবন জানান, তিনি কোনো বড় ধরণের সংকটের আগেই নিরাপদ থাকতে ট্যাংক-ভর্তি করতে পাম্পে এসেছেন। এসময় লাইনে শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে কি না জানি না, কিন্তু বিপর্যয়ের আগে নিরাপদ থাকতেই ট্যাংক ফুল করতে এসেছি। কিন্তু এখানে অনেকেই লাইন ভেঙ্গে সামনে চলে যাচ্ছেন, এতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। অনেকক্ষণ ধরে লাইনে আছি, অনেক আস্তে আস্তে আগাচ্ছে। কখন তেল পাবো, তা জানি না।"
সাধারণ যাত্রীদের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। দুপুর ১২টার দিকে একটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির কর্মী ইমতিয়াজ আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমি রেগুলার বাইকে করে গুলশানে অফিসে যাই। আজকে একটা জরুরি মিটিং আছে। কিন্তু আধঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়েও বাইক পাচ্ছি না। রাইড শেয়ারিং অ্যাপেও বাইক পাচ্ছি না। যারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, তারাও অনেকে বেশি ভাড়া চাচ্ছেন। আমরা সাধারণ মানুষও বিপদে পড়েছি।"
আসাদগেট ছাড়াও, মতিঝিলের শাপলা চত্বর, শান্তিনগর, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার পাম্পগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। শুধু রাজধানী ঢাকাই নয়, এই সংকট ও আতঙ্কের ছোঁয়া লেগেছে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও, সারাদেশ থেকেই পাম্পে তেলের জন্য যানবাহনের লম্বা লাইনের খবর পাওয়া গেছে।
পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আতঙ্কিত হয়ে মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি তেল কিনছেন, যার ফলে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগের দাবি, মজুত পর্যাপ্ত থাকলেও মানুষের মধ্যে আতঙ্কই এই সংকটের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, চলমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল ক্রয়-বিক্রয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এতে বলা হয়েছে, এখন থেকে মোটরবাইক সর্বোচ্চ ২ লিটার ও প্রাইভেটকার সর্বোচ্চ ১০ লিটার পেট্রোল/অকটেন কিনতে পারবে।
জ্বালানি বিভাগ থেকে জারি করা নির্দেশনায় পাঁচটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল নিতে হলে ভোক্তাকে আবশ্যিকভাবে তেলের ধরন, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখসহ ক্রয় রসিদ নিতে হবে। পরবর্তীতে তেল নিতে এলে পূর্ববর্তী ক্রয় রসিদ দেখাতে হবে। ডিলাররা বরাদ্দ ও নির্দেশনা অনুযায়ী ক্রয় রসিদ প্রদান করে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ করবেন। তেল বিপণন কোম্পানিগুলো ডিলারদের জ্বালানি তেল সরবরাহের পূর্বে বর্তমান বরাদ্দের আলোকে মজুত ও বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করবে এবং কোনোভাবেই বরাদ্দের অতিরিক্ত তেল দেওয়া যাবে না বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়।
আজ রাজধানীর পরীবাগের একটি পেট্রোল পাম্প পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, "দীর্ঘমেয়াদি সংকট এড়াতে রোববার থেকে রেশনিং পদ্ধতি চালু করা হবে।"
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং এই আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশেও দাম সমন্বয় করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
উল্লেখ্য, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়। তারই প্রভাব হিসেবে গত দুদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে ক্রেতাদের মধ্যে উপচেপড়া ভিড় ও অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে