Views Bangladesh Logo

ম্যারাডোনা থেকে মেসি, ইংল্যান্ডের ধারাবাহিক দুঃস্বপ্নের নাম আর্জেন্টিনা

Anjan Kar

অঞ্জন কর

বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের দেখা হওয়া মানেই ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন মহাকাব্যের সূচনা। এটি কেবল একটি ম্যাচ নয়, বরং কয়েক দশকের জমে থাকা আবেগ, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিতর্ক আর অসংখ্য অমর স্মৃতির পুনর্জাগরণ। প্রতিবারই এই দুই দলের লড়াই যেন সময়কে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ম্যারাডোনার জাদু, যুদ্ধের প্রতীকী ছায়া আর মেসির শিল্পে আঁকা নতুন ইতিহাসের কাছে। এই দ্বৈরথে বাঁশি বাজলে সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। ম্যারাডোনার উত্তরাধিকার বয়ে চলা আর্জেন্টিনা ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সেই ঐতিহাসিক গল্পে যোগ করল বিজয়ের নতুন এক পৃষ্ঠা।

১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড বা আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস যুদ্ধের ক্ষত এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও আবেগময় করে তুলেছিল। সেই যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে দুই দেশের লড়াই যেন শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না, ছিল এক প্রতীকী প্রতিশোধের মঞ্চ। এরপর যতবার বিশ্বকাপে দুই দল মুখোমুখি হয়েছে, ইতিহাস যেন নতুন করে নিজেকে লিখেছে।

২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও সেই ইতিহাসে যুক্ত হলো আরেকটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইংল্যান্ডকে তৃতীয়বার বিদায় করে দিয়ে আলবিসেলেস্তেরা আবারও মনে করিয়ে দিল, সবচেয়ে বড় মঞ্চে ইংল্যান্ডের জন্য তারা এখনও এক অনিবার্য দুঃস্বপ্ন।

এই জয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের নকআউট লড়াইয়ে দুই দলের পরিসংখ্যান আরও একপেশে হয়ে উঠেছে। ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনাল, ১৯৯৮ সালের শেষ ষোলো এবং ২০২৬ সালের সেমিফাইনাল, তিনবারই শেষ হাসি হেসেছে আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের কাছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় লড়াইগুলো যেন বারবার একই গল্পের পুনরাবৃত্তি হয়ে ফিরে এসেছে।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং বিতর্কিত অধ্যায় লেখা হয়েছিল ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে। কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ম্যাচে দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা একাই হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। প্রথমে হাত দিয়ে করা সেই বিতর্কিত গোল, যা পরবর্তীতে 'হ্যান্ড অব গড' নামে ফুটবল ইতিহাসের চিরকালীন আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তারপর মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একের পর এক ইংলিশ ফুটবলারকে কাটিয়ে করা অবিশ্বাস্য গোলটি আজও 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি' নামে অমর হয়ে আছে। সেই ২-১ জয়ের পথ ধরেই আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিল।

এর ঠিক এক যুগ পরে, ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় আবারও মুখোমুখি হয় দুই দল। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় শেষে ২-২ সমতায় থাকা ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। কিন্তু তার আগেই নাটকের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন ইংল্যান্ডের তরুণ তারকা ডেভিড বেকহ্যাম। দিয়েগো সিমিওনের প্ররোচনায় লাথি মেরে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন তিনি। ১০ জনের ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হার মানে। গোলরক্ষক কার্লোস রোয়া ডেভিড ব্যাটির শট ঠেকিয়ে আর্জেন্টিনাকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে নেন, আর ইংল্যান্ডের আরেকটি বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে যায়।

ইংল্যান্ড অবশ্য পুরোপুরি সাফল্যহীন নয়। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছিল। ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বেও ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল ইংলিশরা। তবে সেই দুই জয়ই নকআউটের সাম্প্রতিক ইতিহাসের ভারসাম্য বদলাতে পারেনি। কারণ যখনই বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই এসেছে, শেষ হাসি বেশিরভাগ সময়ই হেসেছে আর্জেন্টিনা।

২০২৬ সালের সেমিফাইনালেও সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন থাকল। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা পরিণত ফুটবল, অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা এবং আক্রমণাত্মক ছন্দে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে আরেকবার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল। ম্যাচ শেষে উদযাপনের মধ্যেও মালভিনাস ইস্যু ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা ফিফার তদন্ত ও সম্ভাব্য শাস্তির আলোচনাও সামনে এনেছে। ফলে মাঠের লড়াই শেষ হলেও এই দুই দেশের ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

ফুটবলে প্রজন্ম বদলায়, কিংবদন্তিরা বিদায় নেন; নতুন নায়ক জন্ম নেন। কিন্তু কিছু গল্প কখনও পুরোনো হয় না। ম্যারাডোনার বাম পায়ের জাদু থেকে মেসির সোনালি অধ্যায়, আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি যেন বিশ্বকাপের নকআউট মঞ্চে ইংল্যান্ডের জন্য বারবার একই বার্তা বহন করেছে। সময় বদলেছে, ফুটবল বদলেছে, মুখ বদলেছে কিন্তু ফলাফলের গল্পটি যেন একই রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে বলাই যায়- ম্যারাডোনা থেকে মেসি, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ইংল্যান্ডের ধারাবাহিক দুঃস্বপ্নের নাম এখনও আর্জেন্টিনা।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ