Views Bangladesh Logo

গজল থেকে পপ, বহুমাত্রিক প্রতিভায় কিংবদন্তি আশা ভোঁসলে

বহুমুখী সংগীতের সম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলেকে বলা হয় কুইন অব প্লেব্যাক সিংগার। ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র সংগীত, শাস্ত্রীয় সংগীত, গজল, পপ ও আধুনিক ধারার গানে তার অসামান্য অবদান তাকে কিংবদন্তির আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রায় সাত দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য ভাষায় হাজার হাজার গান গেয়ে সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে তুলেছেন।


১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ভারতের মহারাষ্ট্রের সাংলিতে বিখ্যাত সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আশা ভোঁসলে। তার বাবা দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন একজন প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও নাট্যব্যক্তিত্ব। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের পরিবেশে বেড়ে ওঠায় গান তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। তার বড় বোন লতা মঙ্গেশকরও ছিলেন উপমহাদেশের আরেক কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী।


বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে বাধ্য হন আশা ভোসলে। খুব অল্প বয়সেই তিনি চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন। ১৯৪০-এর দশকে মারাঠি ও হিন্দি চলচ্চিত্রে তার যাত্রা শুরু হলেও শুরুটা সহজ ছিল না। বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের জনপ্রিয়তার ছায়ায় তাকে নিজের অবস্থান তৈরি করতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবে নিজের কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য ও বহুমুখী দক্ষতার মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলেন। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে এসে আশা ভোঁসলের ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসে। সংগীত পরিচালক ও. পি. নায়ার-এর সঙ্গে কাজ করে তিনি নতুন ধরণের গানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার কণ্ঠে চঞ্চলতা, রোমান্স ও আধুনিকতার এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। “আইয়ে মেহেরবান”, “উড়ে যখন যখন জুলফে তেরি” প্রভৃতি গান তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।


পরবর্তীতে আর. ডি. বর্মনের সঙ্গে তার যুগলবন্দি ভারতীয় সংগীত ইতিহাসে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করে। এই জুটি আধুনিক ও পরীক্ষাধর্মী সংগীতে নতুন মাত্রা যোগ করে। “পিয়া তু আব তো আযা”, “দম মারো দম” এর মতো গানগুলো আজও শ্রোতাদের কাছে সমান জনপ্রিয়। আর. ডি. বর্মনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কও পরবর্তীতে দাম্পত্য জীবনে রূপ নেয়।


আশা ভোসলে শুধু চলচ্চিত্র সংগীতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি গজল, ভজন, পপ, কাওয়ালি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংগীতেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন। গুলাম আলি-এর মতো শিল্পীদের সঙ্গে গজল পরিবেশন করে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেন। এছাড়া ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার গানেও তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন, যা তার বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ।


বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে তার গান সমানভাবে জনপ্রিয়। বাংলা ভাষাতেও তিনি বহু গান গেয়েছেন, যা শ্রোতাদের মাঝে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। তাঁর কণ্ঠে আবেগ, প্রাণচাঞ্চল্য ও বৈচিত্র্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ পাওয়া যায়, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করে রেখেছে।


দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার থেকে শুরু করে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, এমনকি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছেন। ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করেছে, যা তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত।


আশা ভোসলের সংগীত জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার অভিযোজন ক্ষমতা। সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার বিরল দক্ষতা তার মধ্যে ছিল। ৫০-এর দশকের সাদাকালো চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে আধুনিক পপ সংগীত- সব ক্ষেত্রেই তিনি সমানভাবে সফল। নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন এবং নিজেকে প্রাসঙ্গিক রেখেছেন।


ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছেন। অল্প বয়সে বিয়ে, সংসার জীবনের টানাপোড়েন, পরবর্তীতে নতুন করে জীবন শুরু, সবকিছুই তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে। জীবনের এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর গানে আবেগের গভীরতা এনে দিয়েছে, যা শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।


আশা ভোঁসলের বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে আছে, বাংলা গান- চিরদিনই তুমি যে আমার, আমার স্বপ্ন তুমি, একবার বলো তুমি আমার, আজি এ প্রভাতে রবির কর, তুমি যে আমার, কিনে দে রেশমি চুড়ি, কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে, এই পথ যদি না শেষ হয়, কে প্রথম কাছে এসেছি, মনে পড়ে রুবি রায়। হিন্দি গান- পিয়া তু আব তো আজা, দম মারো দম, ইন আঁখোঁ কি মস্তি, চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে, আয়িয়ে মেহেরবান, উড়ে যখন যখন জুলফে তেরি, ইয়ে মেরা দিল, দিল চীজ কেয়া হ্যায়, রাধা কাইসে না জলে, জরা সা ঝুম লুঁ ম্যায়। গজল সংগীত- দিল চীজ কেয়া হ্যায়, ইন আঁখোঁ কি মস্তি, মেরা কিছু সামান, ঝুঁকি ঝুঁকি সি নজর, আজ জানে কি জিদ না করো, রাত ইউঁ দিল মে তেরি, চুপকে চুপকে রাত দিন, দিখাই দি ইউঁ, ফাসলে অ্যায়সে ভি হোঁগে ও কভি নেহি।


আশা ভোঁসলের গান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার কণ্ঠে ধরা পড়ে সময়, সমাজ ও মানুষের অনুভূতির বহুমাত্রিক প্রকাশ। আশা ভোঁসলে শুধু একজন শিল্পী নন, একটি যুগের নাম। তার অবদান উপমহাদেশের সংগীতকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে গেছে এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। তার গান যতদিন বাজবে, ততদিন তিনি বেঁচে থাকবেন শত কোটি মানুষের হৃদয়ে। গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের লেখা আশা ভোঁসলের গাওয়া এই বিখ্যাত গানটি যেন কিংবদন্তি মহা গায়িকার কথাই বলে- ‘সবার মুখে হাসি হয়ে, মনের মতো ঝরো; অন্ধকারে আলো দিতে, পূজোর প্রদীপ হয়ে জ্বলো।’

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ