Views Bangladesh Logo

অবৈধ অভিবাসী: ভারত সীমান্তের কাঁটাতারে যেভাবে আটকে যায় জীবন

Masum   Hossain

মাসুম হোসেন

কেউ সাত বছর, কেউ পাঁচ আর কেউবা দুই বছর আগে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে অবৈধভাবে ভারতে গিয়েছিলেন। সেখানে চেন্নাইয়ের পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তারা। অবশেষে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগের পর দেশে ফিরেছেন ২৮ জন বাংলাদেশি শ্রমিক। তাদের অধিকাংশই বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার বাসিন্দা।

ঈদুল আজহার পরদিন ২৯ মে (শুক্রবার) ২৫ জন বগুড়ায় ফেরেন। তাদের সঙ্গে নওগাঁ, নাটোর ও মুন্সিগঞ্জ জেলার আরও তিনজন ছিলেন। তারা নিজ নিজ বাড়ি চলে যান।

রোববার (৭ জুন) দুপুরে নন্দীগ্রাম উপজেলার কোহলী গ্রামে আব্দুল মমিনের (২২) বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে মাটির চুলায় রান্না করছেন তার মা জাকিয়া বেগম।

জাকিয়ার ছেলে মমিন সাত বছর ধরে ভারতের চেন্নাইয়ে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। এরমধ্যে বছর তিনেক আগে মমিন বাড়িতেও এসেছিলেন। কয়েকদিন থেকে আবার ভারতে চলে যান।

মমিনের বাবা শহিদুল ইসলাম জানান, তার ছেলে সাত বছর আগে অবৈধভাবে ভারতে যান। কোনো পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়াই সেখানে কাজ করতেন। দুই বছর পর থেকে বাড়িতে টাকা পাঠাতেন নিয়মিত। পরে অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগের পর দেশে ফেরেন। ঈদের পরদিন বিকেলে তিনি বাড়ি পৌঁছান।

মমিনের মা বলেন, ছেলের কারাগারে থাকার খবর শুনে অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। দেশে ফিরে আসায় এখন পরিবারে স্বস্তি ফিরেছে।

তিনি আরও জানান, ২০১৮ সালে শহিদুল ইসলাম নিজেও ছেলের কাছে যেতে অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। তাকে দেশে ফিরিরে আনতে দুই লাখ টাকা খরচ হয়। অবশেষে দুই বছর কারাভোগ করে দেশে ফেরেন শহিদুল।

মমিনের বাড়ির পাশেই আতিকুল ইসলাম ও রানার বাড়ি। তাদের মধ্যে রানা ২০২২ সালে ভারতে গিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি তিনিও সেখানে গ্রেপ্তার হন। আতিকুল ২০২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অবৈধভাবে ভারতে পাড়ি জমান। তিনিও একই সময় গ্রেপ্তার হয়ে সাজা ভোগ করেন।

তারা জানান, অবৈধভাবে ভারতে যেতে দালালের মাধ্যমে ১০-১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। কাঁটাতারের বেড়ার সঙ্গে বাঁশ লাগিয়ে মাঝে মই বসিয়ে দিয়ে তাদেরকে ভারত সীমানায় নেওয়া হয়েছিল। দুই দেশেই দালাল রয়েছেন। বাংলাদেশের দালালরা সীমানা পার করে দিলেই তাদের কাজ শেষ। বাকিটা করেন ভারতীয় দালালরা। সীমানা পার হওয়ার পর তাদেরকে বাসে করে হাওড়ায় নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে ট্রেনযোগে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় চেন্নাইয়ে। সেখানে অসংখ্য বাংলাদেশি অবৈধভাবে রয়েছেন।

তারা আরও জানান, তারা সবাই পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিলেন। মাসে ১৫-২০ হাজার রুপি বেতন পাচ্ছিলেন। ভালোই কাটছিল দিন। ঢাকায় জীবন-যাপনের খরচ অনেক বেশি, ভারতে অনেক কম। সেকারণে তারা অবৈধভাবে ভারতে গিয়েছিলেন।

ভারত ফেরত আতিকুল ইসলাম দাবি করেন, ভারতের চেন্নাইয়ের জেলে প্রায় ৮০০ বাংলাদেশি নারী-পুরুষ ও শিশু রয়েছেন। অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করায় তারা সাজা ভোগ করছেন।

বাংলাদেশ সরকারের কাছে তার দাবি, তাদেরকে (বন্দিদের) যেন দেশে ফিরিরে নিয়ে আসা হয়।

তারা জানান, তাদের কেউ বেনারপোল ও ময়মনসিংহ হালুয়াঘাট সীমানার কাঁটাতার ডিঙিয়ে দিয়ে পার হয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গভীর রাতে তাদেরকে ওপারে পার করা হয়।

জানতে চাইলে নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আরা বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি। তাদের বিষয়ে বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য তদারকি করেছেন। এর বেশি কিছু আমার জানা নেই।

বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন বলেন, ভারতের আমাদের কিছু লোকজনের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষে কারাভোগ করেছেন এবং পরবর্তী আশ্রয়ণ কেন্দ্রে রয়েছেন- এমন খবর জানতে পেরে আমি বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানাই। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তী আমি সব জায়গায় যোগাযোগ করে তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসি। তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে ভারতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তারা নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য ভারতে গিয়েছিলেন।

তিনি আরও জানান, গত ২৭ মে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে তাদেরকে বাংলাদেশে ফেরত নেওয়া হয়।

সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন ভারত ফেরত শ্রমিকদের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষের কথা বললেও শ্রমিকরা জানান, তারা অবৈধভাবে ভারতে গিয়েছিলেন। কোনো ধরনের কাগজপত্র তাদের ছিল না। সেখানে সাজাভোগও করেন তারা। সাজার মেয়াদ শেষে তিন মাস করে তাদের একটি আশ্রয়ণ কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল। সেখানে ভারতের সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে প্রতিমাসে ৫-৬ হাজার রুপি দেওয়া হতো। সেই টাকা দিয়ে সেখানে তারা খরচ চালাতেন। তারা প্রত্যেকে প্রায় ১৪ মাস করে জেলে ছিলেন, পরে তিন মাস করে ছিলেন আশ্রয়ণ কেন্দ্রে। মোট ১৭ মাস করে তারা সাজাভোগ করেছেন।

তারা আরও জানান, জেলে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে অনেকেই তাদের সঙ্গে দেখা করেন। ওই সময় তাদের বলা হয়েছিল সাজার মেয়াদ শেষে তাদেরকে দেশে পাঠানো হবে।

গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তারা পোশাক কারখানার আবাসিক ভবনেই থাকতেন। মালিক পক্ষ জানত তারা অবৈধ অভিবাসী। তবুও কোনো সমস্যা হত না বলেও তারা জানান।

ভারত ফেরত শ্রমিকরা জানান, আর কেউ যেন অবৈধভাবে দেশের বাইরে না যায়। কারণ সেখানে ধরা পড়লে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ