Views Bangladesh Logo

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ঐতিহাসিক দ্বৈরথ

‘অ্যানিম্যাল’ থেকে ‘হ্যান্ড অব গড’: যে লড়াইয়ের আগুন জ্বলছে আজও

আটলান্টার আকাশে যখন রাত নামবে, মাঠের ঘাসে জমা হবে উত্তাপ। যে উত্তাপের আঁচ মাঠে সীমাবদ্ধ থাকবে না, ইতিহাসে কখনো থাকেওনি! ফুটবল ইতিহাসের যে দ্বৈরথের শুরু বহুবছর আগে, তার সর্বশেষ পর্ব মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড ম্যাচে।

এবারের আসরে সেমিফাইনালে এক দিকে থাকবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, আরেক দিকে ৬০ বছরের খরা কাটাতে মরিয়া ইংল্যান্ড। এটি শুধু একটি সেমিফাইনাল নয়; এটি দুই দেশের মানুষের আবেগ, ইতিহাস আর রাজনীতির এক উত্তাল লড়াই। প্রতিবার ফুটবল মাঠে যখন আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ড মুখোমুখি হয়, তখন সেই খেলা কেবল দুই দলের নয়, বরং দুটি জাতির অহংকারের লড়াইয়ে পরিণত হয়। আর সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রেড অ্যালার্ট— কেননা এই ম্যাচের উত্তাপ, এর বিতর্ক, এর ইতিহাস ফুটবলের চেয়েও বেশি কিছু।

যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার ঐতিহ্যবাহী মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটিকে ঘিরে গোটা ফুটবলবিশ্বে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। মাঠের লড়াই ছাড়িয়ে দুই দেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও ফুটবল বৈরিতার কারণে পুরো আটলান্টা শহরজুড়ে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে স্থানীয় পুলিশ বিভাগ। একটা ম্যাচ ঘিরে এতকিছু! শুনতে অবাক লাগলেও, ইতিহাসে চোখ ফেরালে বোঝা যায় এই দ্বৈরথের উত্তেজনা কত।


১৯৬২ বিশ্বকাপে প্রথমবার মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। সেদিন কে জানত, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিষাক্ত, আবেগঘন এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার শুর হতে যাচ্ছে। এরপর বিশ্বকাপের মঞ্চে পাঁচবার লড়াই হয়েছে এই দুই দলের। ইংল্যান্ড জিতেছে তিনবার, আর্জেন্টিনা দুবার। কিন্তু এক্ষেত্রে জয়-পরাজয়ের এই সংখ্যাতত্ত্ব আসলে গৌণ। আসল গল্প লুকিয়ে আছে প্রতিটি ম্যাচের ভাঁজে ভাঁজে—রেফারির বাঁশিতে, পতাকার আন্দোলনে, মাঠ ছেড়ে যাওয়া খেলোয়ারের রাগে কিংবা প্রতিশোধের বাসনায়। এই দুই দলের প্রতিটি সাক্ষাৎ যেন এক একটি অধ্যায়, যেখানে ফুটবল আর রাজনীতি, গৌরব আর অপমান মিলেমিশে তৈরি করেছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় উপাখ্যান।

১৯৬২: র‍্যাংকাগুয়ার মাঠে প্রথম লড়াই
চিলির ছোট্ট শহর র‍্যাংকাগুয়া। এল তেনিয়েন্তে স্টেডিয়ামে ১৯৬২ সালের ২ জুন প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনা, বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে। ম্যাচের ফলাফল ছিল ইংল্যান্ডের পক্ষে সহজ, ৩-১ ব্যবধানে জয়। রন ফ্লাওয়ার্স পেনাল্টি থেকে এগিয়ে দেন ইংল্যান্ডকে, এরপর বিরতির ঠিক আগে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ববি চার্লটন, আর দ্বিতীয়ার্ধে জিমি গ্রিভসের গোলে তিন গোলের লিড পায় ইংল্যান্ড। আর্জেন্টিনার হয়ে একমাত্র গোলটি করেন হোসে সানফিলিপ্পো, তবে তা ব্যবধান কমানোর বেশি কিছু করতে পারেনি।

এই জয় ইংল্যান্ডের জন্য ছিল টুর্নামেন্টে টিকে থাকার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ। গ্রুপ পর্ব শেষে ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনা দুই দলেরই পয়েন্ট সমান হয়ে যায়, কিন্তু গোল গড়ে এগিয়ে থাকায় কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে ইংল্যান্ড, আর বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথমবার, যখন গোল গড়ের হিসাবে কোনো দলকে বিদায় নিতে হয়েছিল। এরকমভাবে দলের বিদায় স্বাভাবিকভাবেই আর্জেন্টিনা সমর্থকরা মেনে নিতে পারেননি। সেদিনের এই নিরুত্তাপ, প্রায় সাদামাটা ম্যাচটিই ছিল দীর্ঘ, নাটকীয় এই উপাখ্যানের প্রথম পাতা।

১৯৬৬: ‘অ্যানিম্যাল’ বিতর্ক ও রাত্তিনের লাল কার্ড
লন্ডনের আকাশ সেদিন ছিল ধূসর, তবে ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে জমেছিলো উত্তেজনার বাষ্প। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল—স্বাগতিক ইংল্যান্ডের মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। আগের আসরের হারের বদলা চায় আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। ম্যাচের তখনও ৩৫ মিনিট পার হয়নি, মাঠে চলছে দুই দলের রক্ষণাত্মক কৌশলের নীরব যুদ্ধ। ঠিক তখনই বদলে যায় ম্যাচের চরিত্র। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনের করা ট্যাকলের পর জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রিটলিন বাঁশি বাজিয়ে খেলা থামিয়ে দেন। উত্তেজিত হয়ে তাকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করেন রাত্তিন। তবে ভাষার দেয়াল সেদিন হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ— স্প্যানিশ ভাষায় প্রতিবাদ জানানো রাত্তিনের কথা বুঝতেই পারেননি জার্মান রেফারি, কিন্তু তার অঙ্গভঙ্গি আর তীব্র প্রতিক্রিয়াকে অসদাচরণ ধরে নিয়েই সঙ্গে সঙ্গে তাকে মাঠ ছাড়ার সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন তিনি।


তারপর যা ঘটে, তা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিচিত্র দৃশ্য। রাত্তিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকার করেন। প্রায় মিনিট দশেক তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন সেন্টার সার্কেলের কাছে, তর্ক করেন, রাগে ফেটে পড়েন, সেসময় ইংলিশ পতাকার দিকে ইঙ্গিত করে রাত্তিন ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বলেও অনেকে দাবি করেন। প্রায় দশ মিনিট ধরে চলে এই অচলাবস্থা। শেষমেশ পুলিশ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে, প্রায় জোর করেই তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছিল গোটা বিশ্ব, আর সেই মুহূর্তই ফুটবলের নিয়মকানুনে চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যায়—রেফারিদের হাতে স্পষ্ট, দৃশ্যমান শাস্তির প্রতীক হিসেবে পরবর্তীতে চালু হয় হলুদ ও লাল কার্ড।


দশজনের আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ইংল্যান্ড জেতে ১-০ গোলে, জিওফ হার্স্টের হেডে করা গোলে। কিন্তু মাঠের লড়াই শেষ হলেও বিতর্ক থেমে থাকেনি। ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের সামনে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ র‍্যামসি বিস্ফোরক এক মন্তব্য করে বসেন—আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের তিনি আখ্যা দেন 'অ্যানিম্যাল' বলে। এমনকি নিজের খেলোয়াড়দের তিনি নির্দেশ দেন, ম্যাচ শেষে প্রথাগত রীতি অনুযায়ী প্রতিপক্ষের সঙ্গে জার্সি বদল যেন তারা না করে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা শিবিরে ক্ষোভের আগুন তখনও নেভেনি—আজও বুয়েনস আইরেসের পুরনো প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীরা দাবি করেন, হার্স্টের সেই নির্ণায়ক গোলটি আসলে অফসাইড ছিল। এই একটি বিকেলেই জন্ম নেয় দুই মহাদেশের দুই দেশের মধ্যে এক তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যা ফুটবলের সীমানা পেরিয়ে পরবর্তীতে মিশে যায় রাজনীতি আর যুদ্ধের ছায়ায়।

১৯৮৬: ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি'
চার বছর আগে দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুদ্ধ হয়েছিল ব্রিটেন আর আর্জেন্টিনার মধ্যে। সেই যুদ্ধে হেরেছিল আর্জেন্টিনা, তাদের হাজারো সেনার প্রাণ ঝরেছিল, আর জাতীয় গর্বে লেগেছিল গভীর ক্ষত। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে যখন আবার মুখোমুখি হলো দুই দল, তখন মেক্সিকো সিটির উচ্চতায় অবস্থিত ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামের সেই ম্যাচ আর্জেন্টিনার কাছে ছিল সম্মান পুনরুদ্ধারের এক অলিখিত যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন নাটকীয়, প্রতিভাবান, প্রায় অতিমানবিক এক ফুটবলার—দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা।


ম্যাচের ৫১তম মিনিট। বল উঠেছে ইংলিশ বক্সের সামনে, শূন্যে লাফিয়ে ওঠেন ম্যারাডোনা আর ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটন। ম্যারাডোনার উচ্চতা শিলটনের ধারেকাছেও নয়, কিন্তু তবুও তার হেডে বল গিয়ে জড়ায় জালে। ধীরগতির রিপ্লেতে পরে স্পষ্ট হয়, ম্যারাডোনা বলটি ঠেলে দিয়েছিলেন নিজের বাঁ হাত দিয়ে, মাথা দিয়ে নয়। রেফারি সেই মুহূর্তে খালি চোখে বিষয়টি ধরতে পারেননি, গোলের সংকেত দিয়ে দেন তিনি। ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের সামনে ম্যারাডোনা নিজেই স্বীকার করেন কী ঘটেছিল, তবে অদ্ভুত কাব্যিক ভঙ্গিতে বলেন যে গোলটি হয়েছিল খানিকটা তার নিজের মাথা দিয়ে, খানিকটা ঈশ্বরের হাতের সাহায্যে। সেই থেকেই ফুটবল ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে যায় বিখ্যাত সেই বাক্যাংশ—'হ্যান্ড অব গড'।


কিন্তু ম্যারাডোনা থামেননি সেখানে। মাত্র চার মিনিট পরে, ৫৫তম মিনিটে, তিনি রচনা করেন এমন এক গোল, যাকে পরবর্তীতে ফিফা নিজেই আখ্যা দেয় শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে। নিজেদের অর্ধ থেকে বল পায়ে জড়িয়ে দৌড় শুরু করেন তিনি, একের পর এক ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে এগিয়ে যান—পিটার রিড, টেরি বুচার, টেরি ফেনউইক—পাঁচজন ইংলিশ ডিফেন্ডার তাকে থামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন, শেষে গোলরক্ষক শিলটনকেও কাটিয়ে বল জড়িয়ে দেন জালে। পুরো স্টেডিয়াম যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়, তারপর ফেটে পড়ে বিস্ময়ের চিৎকারে। ধারাভাষ্যকারদের কণ্ঠে সেদিন যে আবেগ ধরা পড়েছিল, তা আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে।
আর্জেন্টিনা সেই ম্যাচ জেতে ২-১ ব্যবধানে। আর্জেন্টাইনদের কাছে এই জয় ছিল ফকল্যান্ডসের যুদ্ধক্ষেত্রে হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের প্রতীক, রাজনৈতিক লজ্জাকে ফুটবলের মাঠে মুছে ফেলার এক আত্মিক প্রতিশোধ। সেই বিশ্বকাপের ফাইনালেও আর্জেন্টিনা পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে শিরোপা জেতে, আর ম্যারাডোনা হয়ে ওঠেন জাতীয় বীর, প্রায় দেবতাতুল্য এক চরিত্র।

১৯৯৮: বেকহ্যামের লাল কার্ড আর ইংলিশদের টাইব্রেকার বেদনা
ফ্রান্সে আয়োজিত বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে সেন্ট-এতিয়েনের স্তাদ জোফ্রোয়া-গুইশারে আবার মুখোমুখি ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনা। ম্যাচের শুরু থেকেই উত্তেজনা তুঙ্গে, দুই মিনিটেই পেনাল্টি থেকে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা, ছয় মিনিটের মধ্যেই পেনাল্টি থেকে সমতা ফেরান অ্যালান শিয়েরার। এরপর ১৬তম মিনিটে ঘটে সেই বিখ্যাত মুহূর্ত— মাত্র আঠারো বছর বয়সী মাইকেল ওয়েন বল নিয়ে আর্জেন্টাইন রক্ষণ চিরে দৌড়ে গিয়ে করেন এমন এক গোল, যা রাতারাতি তাকে পরিণত করে ইংলিশ ফুটবলের নতুন তারকায়। কিন্তু আর্জেন্টিনাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়— বিরতির ঠিক আগে এক অসাধারণ পরিকল্পিত ফ্রি-কিক রুটিনে সমতায় ফেরে তারা, স্কোরলাইন দাঁড়ায় ২-২।

তারপর আসে ম্যাচের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্ত। ৪৭তম মিনিটে আর্জেন্টিনার দিয়েগো সিমিওনি আর ইংল্যান্ডের তরুণ মিডফিল্ডার ডেভিড বেকহ্যামের মধ্যে বল নিয়ে সংঘর্ষ বাধে। সিমিওনি বেকহ্যামকে ফাউল করার পর মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় বেকহ্যাম পা লাগে সিমিওনির গায়ে—সামান্য, প্রায় অনিচ্ছাকৃত এক স্পর্শ। কিন্তু সিমিওনি নাটকীয়ভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, যেন গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। রেফারি কিম মিলটন নিয়েলসেন সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে দেন বেকহ্যামকে। যার ফলে বছরের পর বছর ধরে ইংলিশ মিডিয়া আর সমর্থকদের তোপের মুখে পড়তে হয় সিমিওনিকে, তার কুশপুত্তলিকাও পর্যন্ত পোড়ানো হয় ইংল্যান্ডের রাস্তায়। বহু বছর পরে সিমিওনি নিজেই স্বীকার করেন যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন, যাতে রেফারির সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়।


দশজনের ইংল্যান্ড অসাধারণ মনোবল দেখিয়ে বাকি ম্যাচ আটকে রাখে, অতিরিক্ত সময়েও কোনো দল গোল করতে পারেনি। ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শ্যুটআউটে। ডেভিড ব্যাটি আর পল ইন্স তাদের পেনাল্টি মিস করেন, আর আর্জেন্টিনা ৪-৩ ব্যবধানে জিতে নেয় শ্যুটআউট। বেকহ্যাম নিজে পরবর্তীতে এই রাতকে বর্ণনা করেছিলেন তার ফুটবল জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার, সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায় হিসেবে। কিন্তু ইতিহাস তার জন্য অপেক্ষা করছিল আরেকটি অধ্যায় নিয়ে!

২০০২: প্রতিশোধের পেনাল্টি আর বেকহ্যামের মুক্তি
চার বছর পর, ২০০২ সালের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে জাপানের সাপ্পোরোতে আবার মুখোমুখি এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। এবার ডেভিড বেকহ্যাম ইংল্যান্ডের অধিনায়ক, আর তার মনে তখনও দগদগে ঘা হয়ে আছে ১৯৯৮ সালের সেই লাল কার্ডের স্মৃতি। পুরো ইংল্যান্ড জানত, এই ম্যাচ শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়, এটা ছিল বেকহ্যামের জন্য দায়মুক্তির এক সুযোগ।

ম্যাচের প্রথমার্ধে সেই সুযোগ এসেও যায়। মাইকেল ওয়েনকে বক্সের ভেতরে ফাউল করে বসেন আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার মাউরিসিও পচেত্তিনো, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের কোচের দায়িত্বে আছেন। রেফারি পেনাল্টির নির্দেশ দেন। স্পট-কিক নিতে এগিয়ে আসেন বেকহ্যাম নিজেই। পুরো স্টেডিয়াম আর টিভি পর্দার সামনে বসে থাকা কোটি ইংলিশ সমর্থকের নিঃশ্বাস যেন থমকে যায় সেই মুহূর্তে। ঠান্ডা মাথায়, কোনো দ্বিধা ছাড়াই বল জালে জড়িয়ে দেন বেকহ্যাম। গোলরক্ষক পাবলো কাভায়েরো ভুল দিকে ঝাঁপ দেন, বল আশ্রয় নেয় জালের কোণায়।


সেই একটিমাত্র গোলেই ম্যাচ জিতে নেয় ইংল্যান্ড, ১-০ ব্যবধানে। চার বছর ধরে বয়ে বেড়ানো অপমান আর সমালোচনার বোঝা যেন এক লহমায় নেমে যায় বেকহ্যামের কাঁধ থেকে। মাঠেই আবেগে ভেঙে পড়েন তিনি, সতীর্থরা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেন তাকে। আর্জেন্টিনার জন্য এই হার ছিল আরও বড় ধাক্কা, কারণ সেই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় তাদের, যে দলটিকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার ধরা হয়েছিল টুর্নামেন্ট শুরুর আগে।

এভাবেই, এক দশকের বেশি সময় ধরে, লাল কার্ড থেকে হ্যান্ড অব গড, টাইব্রেকারের কান্না থেকে প্রতিশোধের পেনাল্টি— প্রতিটি সাক্ষাতে ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনা একে অপরকে উপহার দিয়েছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয়, সবচেয়ে আবেগময় কিছু মুহূর্ত। মাঠের বাইরের রাজনীতি, জাতীয় গর্ব আর ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বাসনা মিলেমিশে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে করে তুলেছে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা এক মহাকাব্য।


আটলান্টায় নতুন অধ্যায়
এবারের সেমিফাইনালে দুই দলের সামনে নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগ। আর্জেন্টিনা ফিরে পেতে চায় ১৯৮৬ সালের জাদু, আর ইংল্যান্ড চায় ২০০২ সালের প্রতিশোধের পুনরাবৃত্তি। বর্তমান সময়ের দুই দলের তারকারা মুখোমুখি হবেন— লিওনেল মেসি বনাম হ্যারি কেইন, ম্যাক আলিস্টার বনাম জুড বেলিংহাম কিংবা জন স্টোন্‌স বনাম ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। এই দ্বৈরথের নতুন অধ্যায়কে কোন খেলোয়াড় নিজের করে নিবেন তা সময়ই বলে দিবে। মজার ব্যাপার হলো, ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনার এমনকি বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা মেসি এখন পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কখনো খেলেননি। আর ইংল্যান্ডের হয়ে ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ম্যাচ খেলতে নামবেন হ্যারি কেইন।

আটলান্টা স্টেডিয়ামে যখন রেফারি খেলা শুরুর বাঁশি বাজাবেন, তখন শুধু ৯০ মিনিটের ফুটবল শুরু হবে না। শুরু হবে এক বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়। যেখানে নিশ্চিতভাবে আবারও লেখা হবে নাটক, বিতর্ক, অশ্রু।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ