২৮ বিচারকের ফেসবুক পোস্ট ও শোকজ
স্বাধীন মত প্রকাশ নাকি সীমা অতিক্রম?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে পোস্ট দেওয়ার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্তরের ২৮ জন বিচারককে শোকজ করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিচার অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া।
জানা গেছে, সম্প্রতি কয়েকজন বিচারক ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও বিচারকদের দায়িত্ব পালনে নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে মতামত প্রকাশ করেন। এসব পোস্ট দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ও বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করে এবং সংশ্লিষ্ট ২৮ বিচারককে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠায়। আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বিচারকদের এই ধরনের প্রকাশ্য মন্তব্য বিচার বিভাগীয় আচরণবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে, এমন অভিযোগের ভিত্তিতেই তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
শোকজ নোটিশে বিচারকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, কেন তাদের এই কর্মকাণ্ডকে বিচার বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার নির্দেশনাও উল্লেখ করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ২৮ বিচারকের ব্যাখ্যা জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তাদের জবাব পর্যালোচনার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিচারকদের আচরণবিধি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। তারা যে কোনো মতামত প্রকাশ করবেন, তা অবশ্যই বিচার বিভাগের মর্যাদা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত কিছু বক্তব্যে এই সীমা অতিক্রম হয়েছে বলে মনে হওয়ায় ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।’
তবে এই ঘটনা বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের সীমা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিচার অঙ্গনের নীতিমালা ও আচরণবিধিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিচারক বলেন, ‘আমরা বিচার বিভাগের অংশ হিসেবে দেশের সংবিধান ও আইনের প্রতি দায়বদ্ধ। তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে মতামত প্রকাশ করা কোনো অপরাধ হওয়া উচিত নয়। আমরা ব্যক্তিগতভাবে আমাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছি, কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিচারকদেরও নাগরিক হিসেবে মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে খর্ব করা উচিত নয়।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, বিচার বিভাগের ভেতরের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো সামনে আসা প্রয়োজন, যাতে সেগুলোর সমাধান করা যায়। একজন মানবাধিকার কর্মী বলেন, “যদি বিচারকরাই নিজেদের সমস্যার কথা বলতে না পারেন, তাহলে সেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত হবে কীভাবে? শোকজ করার পরিবর্তে এসব বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।’
সুপ্রিম কোর্টের আরেক সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিচার বিভাগের কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হলে ভেতরের বাস্তব সমস্যাগুলো সামনে আসা জরুরি। বিচারকরা যদি তাদের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন, সেটিকে নেতিবাচকভাবে না দেখে বরং একটি গঠনমূলক আলোচনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এতে বিচার ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথ তৈরি হবে।’
মানবাধিকার নেত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘বিচারকদের মত প্রকাশের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হলেও তা পুরোপুরি দমন করা সমাধান নয়। তিনি মনে করেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল নীতিগত বিষয় নয়, এটি বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করতে হয়। যদি বিচারকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরতে না পারেন তাহলে সেই সমস্যাগুলো অদৃশ্যই থেকে যাবে। তাই শাস্তিমূলক পদক্ষেপের বদলে এসব বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়াই অধিক কার্যকর হতে পারে।’
অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিচারকদের ক্ষেত্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও তা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকা প্রয়োজন। বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এখানে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের বক্তব্য জনমনে আস্থা সৃষ্টি কিংবা ক্ষুণ্ন-দুই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিচারকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে