Views Bangladesh Logo

নতুন আইনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে: আইনমন্ত্রী

ক্ষতিপূরণের মামলা হয় আদালতে, ফিরতে হয় খালি হাতে

রাজধানীর মৌচাক এলাকার ফখরুদ্দিন রেস্টুরেন্টের পাশে গত ১০ জানুয়ারি রাতে ওপর থেকে শক্ত একটি বস্তু পরে ব্যাংক কর্মকর্তা দিপু সানার মাথার ওপর। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। এর আগে খতনা করানোর জন্য শিশু আয়ানকে গত ৩১ ডিসেম্বর ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর ভুল চিকিৎসায় গত ৭ জানুয়ারি মধ্যরাতে মারা যায় শিশুটি। এমন মৃত্যুর ঘটনা আমাদের দেশে প্রতিনিয়তই ঘটছে। রানা প্লাজার কথা অথবা তাজরীনের কথা কিংবা তেজগাঁওয়ে ভবন ধসের কথা দেশবাসীর মনে এখনো জ্বলজ্বল করছে। এইসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ পায়নি। এর পেছনে কারণ কী? আইনেই বা কী বলে?

আইনজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে কোনো ঘটনায় সিভিল (দেওয়ানি) আইনে ক্ষতিপূরণ মামলা করা যায়। এসব মামলায় ব্রিটিশ টর্ট আইনের কনসেপ্ট নিয়ে ক্ষতিপূরণ চাওয়া যায়। তবে মাত্রাতিরিক্ত কোর্ট ফি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে কোনো ভুক্তোভোগী কিংবা আইনজীবী এই আইনে মামলায় করতে চায় না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত একমাত্র তারেক মাসুদ ও মিশুক মনির মৃত্যুর ঘটনায় টর্ট আইনের কনসেপ্ট করা সিভিল আইনে ক্ষতিপূরণের মামলায় ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। এ ছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো মামলায় এখন পর্যন্ত কেউ এই মামলায় ক্ষতিপূরণ পাননি। ১৯৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর পেপসি কোলার একটি ট্রাক কাকরাইলের আনন্দ ভবনের সামনে মোজাম্মেল হোসেন মন্টুকে চাপা দেয়। পরে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারি মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর স্ত্রী রওশন আখতার ক্ষতিপূরণ চেয়ে ঢাকা তৃতীয় সাব জজ আদালতে মামলা করেন। এ মামলায় ২০১৬ সালের ১৫ এপ্রিল সর্বোচ্চ আদালত মন্টুর পরিবারকে এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ ওই রায় এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

আমাদের দেশে ক্ষতিপূরণ মামলা করার প্রচলন তেমন নেই। কারণ ক্ষতিপূরণ মামলা মূলত ব্রিটিশ টর্ট আইনের কনসেপ্টের টর্ট আইনেই করতে হয়। এই আইনের মাধ্যমে মামলা দায়ের করে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব, তবে আইনজীবীদের অনীহার কারণে তা ফলপ্রসূ হয় না। সাধারণ অর্থে টর্ট বলতে বোঝায় কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ প্রদান। তাই টর্ট আইনেই দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের মামলা করা আইনের সবচেয়ে ভালো দিক। টর্ট আইনে ক্ষতিপূরণ মামলা করার নিয়ম হচ্ছে ‘যদি কোনো ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন, তার পরিবার বা স্বজনরা এক্ষেত্রে দুটি মামলা করতে পারে না, একটি নিহতের ঘটনায় বিচারের আর্জি। অন্যটি ক্ষতিপূরণ মামলা।’ মামলা করার ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির পেশা, আয় ও আয়ু বিবেচনা করা হয়। তবে টাকার অঙ্ক বেশি হলে কোর্ট ফি বেশি হয়। টাকার অঙ্কের ওপর এই ফি নির্ধারণ করা হয়। এর ক্যাটাগরি করা আছে। এই ফি এতই বেশি যে অসচ্ছলদের পক্ষে ক্ষতিপূরণ মামলা করা অসম্ভব। এ কারণেই অনেকে ক্ষতিপূরণ মামলা করতে যায় না। তাছাড়া সময়ক্ষেপণও হয়। ’মামলার পর কবে নাগাদ ক্ষতিপূরণ পাবেন, তা আসলে নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারবে না। এ কারণেই মানুষের মধ্যে এই মামলা করার ব্যাপারে তেমন একটা আগ্রহ দেখা যায় না।’ দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির ক্ষেত্রে অপরাধীর শাস্তি হওয়ার নজির কম।

দেশের মানুষের জান ও মালের রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। প্রতিটি মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর প্রত্যাশা করলেও আমরা প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যর সম্পর্কে অবগত হই। এ অস্বাভাবিক মৃত্যুর মধ্যে অবহেলাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সাধারণত এ ধরনের মৃত্যুর কারণে টর্ট আইনে কনসেপ্টে সিভিল মামলায় ক্ষতিপূরণ প্রার্থনার সুযোগ থাকলেও আমাদের দেশে এখনো এ আইন সম্পর্কে অনেকেরই অজানা। তাই এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। তবে শাস্তির জন্য দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারামতে ফৌজদারি আদালতে এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য দেওয়ানি আদালতে প্রতিকার প্রার্থনা করা যায়। অন্যদিকে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মানুষের জীবনের অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। সুতরাং উক্ত ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ায় হাইকোর্ট বিভাগে রিট করে টর্টের আওতায় ক্ষতিপূরণ প্রার্থনা করা যায়।তবে এ ক্ষেত্রেও সমস্য রয়েছে কারণ আমাদের দেশে ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায় ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দেয়। এসব প্রতিকার প্রার্থনার ক্ষেত্র সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ছাড়াও সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের যে কোনো নাগরিক সৎ উদ্দেশ্যে দেশের জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার্থে ও জনগণের পক্ষে মামলা দায়ের করতে পারে।

অন্যদিকে, সংবিধানের ১০২ ধারায় বলা হয়েছে- ‘আইনে না থাকলেও কিংবা আইনের বাইরে গিয়েও উচ্চ আদালত চাইলে যে কোনো বিষয়ে নির্দেশনা দিতে পারেন।’ এই ধারা বলে ও সিভিল আইনে ক্ষতিপূরণের মামলায় জটিলতা এড়াতে বেশিরভাগ ভুক্তোভোগী ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে রিট মামলা করেন। এতে অনেকটা কম খরচে ও দ্রুত ক্ষতিপূরণ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। শিশু আয়ান, সিয়াম, ব্যাংক কর্মকর্তা দিপু সানা, রানা প্লাজা, তাজরীন, গ্রিনলাইন গাড়ির চাপায় পা হারানো রাজীব প্রত্যেকটি ঘটনায় হাইকোর্টে ক্ষতিপূরণের মামলা হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। তিন মাসের মধ্যে বাস মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্ট বীমা প্রতিষ্ঠানকে এই টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে বাসচালক ৩০ লাখ, বাস মালিক ৪ কোটি ৩০ লাখ ৯৫ হাজার ৪৫২ ও রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্সকে ৮০ হাজার টাকা দিতে হবে। এই রায়ের পর মূলত সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ মামলায় প্রতিকার পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

গত ১০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অফিস শেষে বাসায় ফিরছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা দিপু সানা। রাজধানীর মগবাজারে ফুটপাত ধরে হেঁটে যাবার সময় আকস্মিক তার মাথায় ওপর থেকে একটা ইট পড়ে এবং তাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান ৩৭ বছর বয়সী ওই নারী। ‘এটা খুন নয়, কারণ আইনজীবী মিতি সানজানা এ ব্যাপারে বলেন, ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা না কিন্তু এটা এতটাই বেপরোয়া যে, প্রায় খুনের কাছাকাছি’– এরকম ঘটনায় কোম্পানির বিরুদ্ধে হলে টর্ট আইনে সাজা বা ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান আছে। তবে অবহেলাজনিত মৃত্যুর জন্য ব্যক্তির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া যায়; কিন্তু এক্ষেত্রে জরিমানা ও সাজার পরিমাণ খুব কম হয়। দণ্ডবিধির ৩০৪ এর (ক) ধারা হচ্ছে অবহেলাজনিত মৃত্যু, অর্থাৎ যদি কোনো ব্যক্তি নরহত্যা বলে গণ্য নয়, এমন কোনো বেপরোয়া বা তাচ্ছিল্যপূর্ণ কাজ করে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়, সে ব্যক্তি পাঁচ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে বা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে‘; কিন্তু এই ঘটনা অনেকটা খুনের মতোই। আমি যখন কোনো কিছু নিচে ফেলব, সেটা যদি পাবলিক প্লেস হয়, যেখানে মানুষ হাঁটাচলা করে, সেটা কারও মাথায় লেগে সে মারা যেতে পারে, কাজেই এটা অবহেলার। শতভাগ তাকে এ দায়িত্ব নিতে হবে। এটা হবে অপরাধজনক নরহত্যার ৩০৪ ধারার মামলা। যেখানে বলা আছে, যে ব্যক্তি খুন নয়, এমন শাস্তিযোগ্য নরহত্যা করে, সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা ১০ বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং পাশাপাশি অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারে।

এদিকে, রাজধানীর সাঁতারকুলে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সুন্নতে খতনার সময় মারা যাওয়া শিশু আয়ান আহমেদের পরিবারকে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, খতনা করানোর জন্য গত ৩১ ডিসেম্বর আয়ানকে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর সকালে শিশুটিকে অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া হয়। তবে অনুমতি ছাড়াই ‘ফুল অ্যানেস্থেশিয়া’ (জেনারেল) দিয়ে চিকিৎসক আয়ানের খতনা করান বলে অভিযোগে জানা যায়। পরে জ্ঞান না ফেরায় আয়ানকে গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানকার শিশু নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। পরে ৭ জানুয়ারি মধ্যরাতে চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় গত ৯ জানুয়ারি রাজধানীর বাড্ডা থানায় আয়ানের বাবা শামীম আহমেদ বাদী হয়ে ইউনাইটেড হাসপাতাল ও ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুই চিকিৎসক, অজ্ঞাতপরিচয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও একজন পরিচালককে আসামি করে মামলা করেন।

এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনায় সিভিল আইনে ক্ষতিপূরণ মামলা করা যায়। তবে দীর্ঘসূত্রতা ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার কারণ এই আইনে বেশিরভাগ মানুষই মামলা করতে আগ্রহী হন না। এর বিকল্প সংবিধানের ১০২ ধারা বলে ক্ষতিপূরণের জন্য হাইকোর্টে রিট করেন, যা অনেক বেশি কার্যকর হয় ভুক্তোভোগীর জন্য।’

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশে প্রচলিত আইনে মামলা করে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা এখনো কেউ ক্ষতিপূরণ পাননি। এই আইনে ব্রিটিশ টর্ট আইনের নিয়ম অনুসরণ করে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়। তবে দেশে ক্ষতিপূরণের জন্য একটি জনবান্ধব আইন দরকার। যেখানে দ্রুত ও অল্প টাকায় মামলা শেষ করা যায়। ব্রিটিশ টর্ট আইনটিও আমাদের আইনে পুরোপুরি সংযোজন করা যায়। তবে এক্ষেত্রে কোর্ট ফি কমাতে হবে।’

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, ‘এটা সত্যি যে ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা মামলায় তারেক মাসুদেরটা ছাড়া কোনোটিতেই ক্ষতিপূরণ পাননি কেউ। এসব মামলার দীর্ঘসূত্রতা আছে। কোর্ট ফিও অনেক বেশি। আমাদের এ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। প্রচলিত সিভিল ক্ষতিপূরণ আইনটি সংশোধন করে আরও যুগোপযোগী কীভাবে করা যায়। নতুন করে এর জন্য কোনো আইন করতে হবে কি না, সেটাও দেখা যেতে পারে।’

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ