প্রভুর হাতে রাষ্ট্রের রাশ, মরুভূমিতে হায়াতুল্লাহর শেষ শ্বাস
মরুভূমির ওপর তখন সুর্যের গনগনে উত্তাপ। যেনো বিশাল এক আগুনের গোলা। পুড়ে ছারখার করে দেবে চারপাশ।
চারদিকে শুধু ফুটতে থাকা ধূসর বালি। কোথাও গাছ নেই, ছায়া নেই, ঘর নেই। দূরে পানি মনে করে যে চকচকে রেখাটির দিকে যতই এগুনো হয়, কাছে গেলে দেখা যায় সেগুলো বালি। বাতাস উঠলে সেই বালি চোখে-মুখে ঢুকে তীক্ষ্ণ গরম বর্শার ফলার মত। আর বাতাস থেমে গেলে নেমে আসে এমন এক নীরবতা, যেন পৃথিবীতে আর কোনো মানুষ বেঁচে নেই।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি আফগান ইরান সীমান্ত সংলগ্ন নিমরুজ মরুভূমিটিতে এরকম এক নীরবতার মধ্যে বসে ছিলেন আফগান এক যুবক।
শরীর আর তাঁর কথা শুনছিল না। জিহ্বা শুকিয়ে গিয়েছিল। কণ্ঠ বের হচ্ছিল ভাঙা ভাঙা। পা দুটি সামনে এগোতে চাইছিল না। তবু বুকের ভেতর তখনো হয়তো একটি ক্ষীণ আশা ছিল আরেকটু গেলে কোনো রাস্তা পাওয়া যাবে, কোনো গাড়ি দেখা যাবে, কোনো মানুষ পানি নিয়ে এগিয়ে আসবে।
কিন্তু মরুভূমি কোনো উত্তর দেয়নি। কারণ নামই তো এর ‘দাশত-ই-মারগো’। বাংলায় অর্থ ‘মৃত্যু’র পথ’। ইরান সীমান্তঘেষা দাশত-ই-মারগো ওই অঞ্চলের সবচেয়ে দূর্গম ও বৈরী। এ কারণে এই পথে কোন নিরাপত্তা চৌকি নেই দুই দেশেরই।
যুবকটি তখন বুঝেছিলেন, তাঁর সামনে মাত্র একটি ই পথ যেটি দ্রুত মৃত্যুর দিকে যাচ্ছিল
তিনি ফোনটি হাতে নিলেন।
হয়তো হাত কাঁপছিল। হয়তো চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছিল। হয়তো ফোনের পর্দায় নিজের মুখটিও ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিলেন না। তবু রেকর্ডের বোতামটি চাপলেন।
মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ পৃথিবীর কাছে শেষবার কী চায়?
পানি?
বিচার?
প্রতিশোধ?
যুবকটি কিছুই চাইলো না।
সে মায়ের কাছে ক্ষমা চাইল।
পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইলো।
স্ত্রীকে সন্তানদের দেখেশুনে রাখতে বলল। সামর্থ্য হলে তাঁর ঋণগুলো শোধ করে দিতে বললো স্ত্রীকে। পাশে থাকা সহযাত্রী কণ্ঠও ভিডিওতে রেকর্ড করা হলো। তিনিও তাঁর মায়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ার বার্তা পৌঁছে দিতে বলেন।
দুজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ।
দুজনেরই শেষ কথা ক্ষমা।
কেউ জানে না, ভিডিওটি ধারণের কতক্ষণ পর ওই যুবকের হাত থেকে ফোনটি পড়ে গিয়েছিল। কেউ জানে না, শেষ মুহূর্তে মরুর মরীচিকার মধ্যে মায়ের মুখ দেখেছিলেন কিনা। এরপর আর তাঁর কণ্ঠ শোনা যায়নি।
ভিডিওর ওই যুবকটির নাম হায়াতুল্লাহ। বয়স ছত্রিশ। আফগানিস্তানের বাদগিস প্রদেশের এক সাধারণ মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর সংসার ছিল, সন্তান ছিল, আর ৯৯ ভাগ আফগানদের মতোই বড় একটি ঋণের বোঝা ছিল তার কাধে। শুধু এমন একটি কাজ ছিল না যা দিয়ে পরিবারের সবার জন্য ক্ষুদার সঙ্গে লড়াই করা যায়। ভাতের ক্ষুদা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্ষুদা। আর এই ক্ষুদা মেটাতেই হায়াতুল্লাহ যেনো বেছে নিয়েছিলেন ‘দাশত-ই-মারগো’ যার বাংলা অর্থ মৃত্যুর পথ। যে কারণে এই পথে কোন নিরাপত্তা চৌকি নেই দুই দেশেরই। আফগানিস্তানের নিমরুজ প্রদেশের এই জনহীন মরুপথ দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিতভাবে ইরানে প্রবেশের চেষ্টা করা অভিবাসী ও মানব পাচারকারীদের ব্যবহৃত বিপজ্জনক পথ।
আর এই পথ ধরেই হায়াতুল্লাহসহ আরও ১৮ আফগান যুবক কাজের সন্ধানে রওনা দিয়েছিলেন ইরানের পথে। যাদের সবাই ই মৃত্যুবরণ করেন পানির অভাবে।
মানুষ শখ করে দেশ ছাড়ে না।
গাছের শিকড়ও মাটির ভেতরে থাকতে চায়। তাকে তুলে অন্য মাটিতে বসালে প্রথমে সে মরে যাওয়ার মতো চুপ করে থাকে। মানুষও তাই। পরিচিত উঠোন, মায়ের মুখ, সন্তানের হাত সব ফেলে কেউ অচেনা মরুভূমির দিকে রওনা হয় না, যতক্ষণ না পরিচিত জীবনটাই তার কাছে মরুভূমি হয়ে ওঠে।
আফগানিস্থানে এখন চরম দূর্দশা চলছে। ঋণের ভারে ক্লান্ত আফগানরা এখন দিশেহারা। ক্ষুদার জ্বালা সইতে না পেরে সন্তানদের বিক্রী করে দিচ্ছেন অনেকে।
ক্ষুধার কোনো পতাকা নেই। ক্ষুধা ধর্ম বোঝে না। রাজনীতি বোঝে না। সংবিধান, সীমান্ত কিংবা ভূরাজনীতি বোঝে না। ক্ষুধা শুধু পেটের ভেতর থেকে মানুষকে বলে কিছু একটা করো। কোথাও যাও। কোনোভাবে বাঁচো।
আফগানিস্তান ভিত্তিক ‘আমু টিভি’র তথ্য অনুযায়ী, হায়াতুল্লাহসহ উনিশজনের দলটি জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে কাজের সন্ধানে ইরানের দিকে রওয়ানা দেন। তাঁদের বহনকারী গাড়িটি আফগানিস্তানের নিমরুজ প্রদেশের দাশত-ই-মারগো মরুভূমিতে বিকল হয়ে যায়। তারপর পায়ে হেটে চলতে চলতে দলটি মুরুভূমির মধ্যে পথ হারায়। চারদিকে বালি, মাথার ওপরে আগুনের মতো রোদ, সামনে কোনো জনপদ নেই। একসময়ে সঙ্গে থাকা পানিও শেষ হয়ে যায়।
হায়াতুল্লাহ যখন বুঝে যান, ফিরে যাওয়ার পথটি আর তাঁর জন্য খোলা নেই, তখন মোবাইল ফোনটি হাতে নিয়ে মৃত্যুর আগের শেষ স্টেটমেন্ট রেকর্ড করান। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে মানুষ কী বলে?
সে কি রাষ্ট্রকে অভিশাপ দেয়?
শাসকদের বিচার চায়?
পৃথিবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে?
হায়াতুল্লাহ সেসব কিছুই করেন নি।
তিনি মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। স্ত্রীকে সন্তানদের দেখেশুনে রাখতে বলছেন । আর সামর্থ্য হলে তাঁর ঋণগুলো শোধ করে দিতে অনুরোধ করেছেন পরিবারকে। পাশে থাকা (ভিডিওর অডিওতে) মীর আদম নামে আরেকজনকে বলতে শোনা যায় নিজের মায়ের কাছে যেনো তার মৃত্যুর বার্তাটি পৌছে দিয়ে তাঁকে ক্ষমা করে দিতে অনুরোধ করেন।
কী আশ্চর্য বিনয়ী মানুষ হায়াতুল্লাহ!
রাষ্ট্র যাকে খাবার দিল না, কাজ দিল না, এক গ্লাস পানিও দিল না মৃত্যুর সময়ে। অথচ সে-ই কিনা ক্ষমা চাইলেন সবার কাছে। যেন ক্ষুধার্ত হওয়াটা তার অপরাধ। যেন কাজ খুঁজতে বের হওয়াটা অন্যায়।
যেন বাঁচতে চাওয়াটা রাষ্ট্রের প্রতি বেয়াদবি।
হায়াতুল্লাহর ভিডিও একজন যুবকের শেষ বার্তা নয়; একটি দেশের মৃত্যুসনদ।
‘তোলো নিউজে’র অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, হায়াতুল্লাহর ওই মৃত্যুযাত্রী সাবরই বয়স ২২ থেকে ৩৬ বছর। স্থানীয়রা নিখোঁজ হওয়ার ১৫ দিন পরে তাদের শুকিয়ে যাওয়া মরদেহ আফগানিস্তানের নিমরুজ মরুভূমিতে থেকে উদ্ধার করেন। প্রথমে উদ্ধার হয় পাঁচজনের, পরে বাকি চৌদ্দজনের। ওই মৃতদেহগুলোর সঙ্গে থাকা হয়াতুল্লাহর ফোনটি পাওয়া যায় যা থেকে এই ভিডিওটি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ছোট ভিডিও। কয়েক মুহূর্তের কথা। অথচ এই ভিডিওর মধ্যে আফগানিস্তানের বহু বছরের ইতিহাস গুটিয়ে আছে।
একটি দেশ একদিনে এমন হয় না।
বিদেশী প্রভুদের ইশারায় প্রথমে মানুষের হাত থেকে বই সরিয়ে নেওয়া হয়। তার জায়গায় তুলে দেওয়া হয় ভয়। প্রশ্নকে বলা হয় পাপ, ভিন্নমতকে বলা হয় বিশ্বাসঘাতকতা। ধর্মের শান্ত আলোটুকু নিভিয়ে তার নামে জ্বালানো হয় ক্রোধের আগুন।
মানুষকে ভাগ করা হয় ধর্মে, গোত্রে, ভাষায়, সম্প্রদায়ে এবং মতাদর্শে। প্রতিবেশীকে বোঝানো হয়, পাশের বাড়ির মানুষটিই তার সবচেয়ে বড় শত্রু।
আদালত দুর্বল হয়।
প্রশাসন দল বা গোষ্ঠী চাকর হয় বিদেশী প্রভুদের।
সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ ছোট হতে হতে একসময় ফিসফিসানিতে নেমে আসে।
যোগ্যতার বদলে আনুগত্যকে দেখা হয় রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রয়োজনিয় সূচক হিসেবে।
এরপর একটি রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে বিদেশি নির্ভরতার নেশায় অভ্যস্ত করা হয়।
অস্ত্র বিদেশ থেকে আসে।
বাজেট বিদেশি সাহায্যে বাঁচে।
নিরাপত্তা কৌশল তৈরি হয় বিদেশি পরামর্শকের টেবিলে।
ক্ষমতায় কে থাকবে, কে বাদ পড়বে, কার সঙ্গে শান্তিচুক্তি হবে, কাকে সন্ত্রাসী আর কাকে অংশীদার বলা হবে—এসব সিদ্ধান্তের অদৃশ্য খসড়া কখনো কখনো দেশের সংসদে নয়, বিদেশি রাজধানীর বন্ধ ঘরে লেখা হয়।
রাষ্ট্র তখন বাইরে থেকে স্বাধীন দেখায়।
তার পতাকা থাকে। জাতীয় সংগীত থাকে। সেনাবাহিনী থাকে। মন্ত্রী থাকে। রাষ্ট্রপতির প্রাসাদও থাকে।
শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়ার মেরুদণ্ডটি আর নিজের থাকে না।
দেশের শাসকেরা তখন জনগণের ভোটের চেয়ে বিদেশি দূতাবাসের নীরবতা বেশি ভয় পায়। কৃষকের কান্নার চেয়ে বিদেশি রাষ্ট্রদূতের ভ্রু-কুঁচকানি দ্রুত বুঝতে শেখে। নিজের নাগরিক অনাহারে আছে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন থাকে না; বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় বিদেশি প্রভু সন্তুষ্ট কি না।
সব সাড়া হলে পরে অবশেষে ছদ্মবেশ থেকে আলোতে আসে ‘বিদেশি শক্তি’।
কেউ গণতন্ত্রের বাক্স হাতে আসে। কেউ শান্তির পতাকা নিয়ে। কেউ সন্ত্রাস দমনের কথা বলে। প্রথমে তারা অস্ত্র দেয়, পরে শান্তি সম্মেলন ডাকে। প্রথমে নেতা তৈরি করে, প্রয়োজন শেষ হলে সেই নেতাকেই ব্যর্থ ও দুর্নীতিগ্রস্ত বলে ছুড়ে ফেলে দেয়।
দেশটি তখন দাবার ছক হয়ে যায়।
তবে দাবার ঘুঁটিরও একটি সৌভাগ্য আছে খেলা শেষে তাকে বাক্সে তুলে রাখা হয়। সাধারণ মানুষের সেই সৌভাগ্যটুকুও নেই।
খেলা শেষ হলে বিমান আসে ক্ষমতাবানদের জন্য। নেতা, উপদেষ্টা, ঠিকাদার ও তাঁদের পরিবারের জন্য দরজা খোলা থাকে।
সাধারণ মানুষের জন্য কোনো বিশেষ বিমান আসে না।
তাদের জন্য থাকে বৈরী সীমান্ত।
কাঁটাতার।
পাচারকারীর গাড়ি।
এবং দাশত-ই-মারগোর মতো একখানা মরুভূমি।
খেলোয়াড়েরা চলে যায়।
সহযোগীরা পুরস্কার পায়।
সেনাপতিরা পদক পায়।
শাসকেরা নতুন পতাকা তোলে।
আর সাধারণ মানুষ?
মৃত্যুর আগে মাকে বলে
“আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
হায়াতুল্লাহর অপরাধ কী ছিল?
তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন।
সন্তানদের জন্য রুটি কিনতে চেয়েছিলেন।
ঋণ শোধ করতে চেয়েছিলেন।
মায়ের কাছে আবার ফিরে আসতে চেয়েছিলেন।
পৃথিবীর কোনো আদালতে এগুলো অপরাধ নয়।
কিন্তু ব্যর্থ রাষ্ট্রের মরুভূমিতে কখনো কখনো বেঁচে থাকার ইচ্ছাটিই সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়।
আজ এই কাহিনী শুধু আফগানিস্তানের। কিন্তু মানচিত্রের পূর্ব থেকে পশ্চিমে এমন বহু আফগানিস্তান ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। কোথাও ধর্মের নামে, কোথাও জাতীয়তাবাদের নামে, কোথাও নিরাপত্তার নামে, আবার কোথাও বিদেশি স্বার্থ ও দেশীয় ক্ষমতালোভের যৌথ ব্যবস্থাপনায়।
আমরা সাধারণত একটি দেশ ধ্বংস হতে দেখি বোমার শব্দে।
আসলে দেশ ধ্বংসের শব্দ সবসময় এত জোরে হয় না।
কখনো সেটি শোনা যায় মরুভূমিতে আটকে পড়া এক মানুষের দুর্বল কণ্ঠে কখনও কখনও সেরকম শব্দ আসে নতুন কোন দ্রোহের উত্তাল স্লোগানে...
মতামত দিন