উৎপাদন খরচই উঠছে না, পুঁজি হারাচ্ছেন কৃষক
কৃষকরা জমিতে আবাদ করে উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না। ফলে ফসল উৎপাদন করেও পুঁজি হারাতে হচ্ছে তাদের। কিছু ক্ষেত্রে সব খরচ বাদ দিয়ে সামান্য লাভ থাকছে। তবে কৃষকের নিজের শ্রমের মূল্য এবং জমির ভাড়া হিসাব করলে সেই লাভ আর থাকে না। এতে দিন দিন কৃষিকাজে বিনিয়োগ করা পুঁজি হারাচ্ছেন চাষিরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে মাঠে আমন ধান রয়েছে। এক বিঘা জমিতে প্রায় ১৮ মণ (জাতভেদে হিসাবের কম-বেশি হয়) ধান উৎপাদন হয়। এ ধান বাজারজাত করা পর্যন্ত মোট খরচ পড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা। বাজারে প্রতি মণ ধান সাধারণত ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়। যদিও বাজারভেদে এ দাম ওঠানামা করে। সে হিসাবে প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৮৯০ টাকা। এতে মণপ্রতি কৃষকের লাভ থাকে ১১০ টাকা। তবে এ হিসাবের মধ্যে ধান চাষের চার মাসের কৃষকের শ্রমের মূল্য নেই। এছাড়াও অনেক কৃষক জমি পত্তন নিয়ে চাষাবাদ করেন। তাদের জমির ভাড়াও এ হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
ফলে কাগজে-কলমে ধান বিক্রিতে লাভ দেখা গেলেও বাস্তবে লোকসানের মুখে পড়ছেন কৃষকেরা। তবে ধানের খড় বিক্রি করে বা বাড়িতে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেন তারা।
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার কাজিপাড়া গ্রামের কৃষক আবু হাসান ও ফারুক হোসেন বলেন, ধান চাষের বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকের লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়েছে। চাষাবাদ করে উল্টো গচ্ছিত টাকা দিন দিন কমছে।
তারা জানান, আর ১৪ থেকে ১৫ দিন পর আমন ধান কাটা শুরু হবে। ভাগ্যে কী আছে, তা বলা যাচ্ছে না।
শুধু ধান নয়, সবজি চাষেও লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
বগুড়া সদর উপজেলার মজিবর রহমান, শিবগঞ্জ উপজেলার মিজানুর হোসেন ও শাজাহানপুর উপজেলার আব্দুল খালেকসহ অন্তত ১০ জন কৃষক জানান, জমি থেকে বাজার পর্যন্ত নিতে প্রতি মণ মূলা বিক্রি করতে গিয়ে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে।
কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, এক মণ মূলা জমি থেকে বাজারে নিতে খরচ হয় ৩৫০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা। পরিবহন খরচের ওপর ভিত্তি করে এ ব্যয় কমবেশি হয়। অথচ সেই মূলা পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা মণ দরে। মূলা চাষে সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক, পরিবহন এবং হাট-বাজারের খাজনা বাবদ খরচ রয়েছে। সব মিলিয়ে এবার মূলা চাষে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
কৃষকেরা উৎপাদন খরচ তুলতে না পারলেও লাভবান হচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগী ও খুচরা বিক্রেতারা।
কৃষক ও সবজি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে আগাম সবজির সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি পর্যায়ে দাম কমেছে। উৎপাদিত সবজি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকলে কৃষকেরা ভালো দাম পেতেন। কিন্তু বগুড়ায় সবজি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় বাধ্য হয়েই কম দামে ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের।
ফুলকপিতে উৎপাদন খরচ ও বাজারে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত ব্যয় বাদ দিয়ে মণপ্রতি লাভ থাকলেও নিজের শ্রম ও জমির ভাড়া হিসাব করলে লোকসানেই থাকতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে দুইমাসে ফুলকপির ফলন হয় প্রায় ৮০ মণ। এতে উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি মণ ফুলকপির উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় ৩৭৫ টাকা। আর বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতি মণে পরিবহনসহ আরও ১৫০ টাকা খরচ হয়। ফলে প্রতি মণ ফুলকপিতে কৃষকের মোট খরচ দাঁড়ায় ৫২৫ টাকা। পাইকারি বাজারে প্রতি মণ ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা দরে। এতে মণপ্রতি কৃষকের লাভ থাকে ৭৫ টাকা।
এই হিসাবে এক বিঘা জমিতে ৮০ মণ ফুলকপি বিক্রি করে কৃষকের মোট লাভ দাঁড়ায় ৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ দুই মাসের পরিশ্রম ও বিনিয়োগে কাগজে-কলমে এ লাভ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু কৃষকের নিজের ও পরিবারের সদস্যদের শ্রমের মূল্য এবং জমির ভাড়া হিসাব করলে সেই লাভও আর থাকে না।
কৃষকরা জানান, দুই মাস ধরে ফুলকপির জমিতে পরিচর্যা, সেচ, সার প্রয়োগ ও ফসল তোলার কাজে নিজেদের শ্রম দিতে হয়। পরিবারের সদস্যরাও শ্রম দেন। হিসাব করার সময় এসব শ্রমের কোনো মূল্য ধরা হয় না। জমির ভাড়াও বাদ থাকে। সব খরচ হিসাব করলে ফুলকপি চাষেও লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
পাইকারী বাজারে সবজির দাম কম থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়ার সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. মোরশেদ আল মাহমুদ জানান, এ বছর আগাম সবজি চাষ বেশি হয়েছে। একই সময়ে অনেক বেশি সবজি বাজারে ওঠেছে। একারণে পাইকারি বাজারে সবজির দাম কমেছে।
মতামত দিন