Views Bangladesh Logo

অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদন

‘বাংলাদেশি প্রবাসী’র নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন তৎপরতা!

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অ্যাকাউন্ট ছিল। নাম @BanglaExpatSharjah। দেখে মনে হতো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ শহরে থাকা কোনো বাংলাদেশি প্রবাসীর অ্যাকাউন্ট। কিন্তু এমন কোনো মানুষ নেই। পুরো পরিচয়টিই বানানো হয়েছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত খতিয়ে দেখে, তাদের এআই কেউ খারাপ কাজে ব্যবহার করছে কি না।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বহু বাংলাদেশি কাজ করেন। তাঁদের অনেকেই পরিবার ও সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন অনলাইন গ্রুপে। এ কারণেই প্রবাসী সেজে ভুয়া অ্যাকাউন্ট বানানোর ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

কারা করছিল
অ্যানথ্রোপিক বলছে, কাজটি করছিল এসটুটি আনলকিং সাইবার স্পেস (S2T Unlocking Cyberspace) নামের একটি প্রতিষ্ঠান, কিংবা তাদের হয়ে অন্য কেউ। এটি একটি বেসরকারি গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে ইসরায়েল ও সিঙ্গাপুরের যোগ আছে বলে জানানো হয়েছে। গত জুন মাসে এ কাজে ব্যবহৃত অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে অ্যানথ্রোপিককে কোনো বক্তব্য দেয়নি।

পুরো আয়োজনটির মূল লক্ষ্য ছিল ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের ওপর নজর রাখা।

কীভাবে করা হতো
দুই ধরনের কাজে এআই ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্রথমত, সাধারণ মানুষের পোস্ট বিশ্লেষণ। একসঙ্গে ২৫টি করে পোস্ট দিয়ে এআইকে জিজ্ঞেস করা হতো— যিনি লিখেছেন তিনি কেমন মানুষ, কোথায় থাকেন, রাজনীতিতে তাঁর ঝোঁক কোন দিকে। মানুষকে ভাগ করা হতো ছয় ভাগে: শহুরে, ধর্মীয়, সামরিক, তরুণ, প্রবাসী ও গ্রামীণ। আলাদা করা হতো, কে সরকারের পক্ষে আর কে বিপক্ষে।

এসব তথ্য দিয়ে আরবি ভাষায় প্রতিবেদন বানানো হতো, যা দেখতে অনেকটা সরকারি কাগজের মতো। তাতে লেখা থাকত মানুষ কী ভাবছে, আর সেই ভাবনা বদলাতে হলে কী বলা দরকার।

দ্বিতীয়ত, ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলোর জন্য পোস্ট লিখে দেওয়া। এমন আড়াইশর বেশি ভুয়া অ্যাকাউন্ট আগেভাগে তৈরি করে রাখা হয়েছিল।

বাংলাদেশি অ্যাকাউন্টটি নিয়ে যা জানা গেছে
ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলোকে কয়েকটি দলে ভাগ করে রাখা ছিল। ‘আমিরাত প্রবাসী’ দলে ছিল বাংলাদেশি অ্যাকাউন্টটি। একই দলে ছিল পাকিস্তানি শ্রমিক ও আমিরাতের কয়েকটি শ্রমিক ফোরামের ছদ্মবেশে বানানো অ্যাকাউন্ট।

অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অ্যাকাউন্টগুলো তখনো প্রস্তুতির পর্যায়ে ছিল এবং পরীক্ষার শুরুতেই ধরা পড়ে যায়। সত্যিকারের কাজে সেগুলো নামানো হয়েছিল বলে তারা মনে করে না।

অর্থাৎ এই ভুয়া প্রবাসী কোনো বাংলাদেশি গ্রুপে ঢুকেছিল, কিংবা কোনো শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেছিল— এমন কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়নি।

আগেও অভিযোগ ছিল
এসটুটি আনলকিং সাইবার স্পেসের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালেও অনুসন্ধান হয়েছিল। কলম্বিয়ার সেনাবাহিনীর ফাঁস হওয়া নথির ভেতর প্রতিষ্ঠানটির একটি গোপন প্রচারপত্র পাওয়া যায়। তাতে লেখা ছিল, তারা ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে, ফাঁদ পেতে পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নিতে পারে এবং দূর থেকে কারও ফোন বা কম্পিউটারে ক্ষতিকর সফটওয়্যার বসাতে পারে। পদ্ধতি ছিল— হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের ব্যক্তিগত গ্রুপে ঢুকে পড়া, সদস্যদের তালিকা সংগ্রহ করা, তারপর একে একে ফাঁদ পাতা।

অ্যানথ্রোপিক বলছে, এআই দিয়ে লেখা পোস্ট ভুয়া অ্যাকাউন্টকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। তবে প্রচারপত্রে যা লেখা ছিল আর তারা নিজেরা যা দেখেছে, দুটি এক নয়। অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার আগপর্যন্ত সত্যিকারের কারও ক্ষতি হয়েছে, এমন প্রমাণ তারা পায়নি।

এখন কী অবস্থা
অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, নজরদারি করা, মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় বিচার করা আর দল বেঁধে ভুয়া অ্যাকাউন্ট চালানো— তাদের নিয়মে এই তিনটিই নিষিদ্ধ। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর যারা নজর রাখে, তাদের সঙ্গে কারিগরি তথ্যও ভাগ করে নিয়েছে তারা।

তবে বন্ধ হয়েছে কেবল একটি অ্যাকাউন্ট। পুরো নজরদারির কাজটি থেমেছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ