Views Bangladesh Logo

বগুড়ায় খাল খননে অ্যাসকেভেটর ব্যবহারের জেরে ভাঙছে কৃষিজমি

Masum   Hossain

মাসুম হোসেন

‘অনেক আপত্তি করেছিলাম। কেউ কথা শোনেননি। অ্যাসকেভেটর দিয়ে খাল গভীর করে খনন করায় এখন জমি ভেঙে খালের মধ্যে চলে যাচ্ছে। আমার জমির মাঝখান দিয়ে খাল কেটে দেওয়ায় দুই পাশেই ভাঙন শুরু হয়েছে।’

কথাগুলো বলছিলেন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের সোনাইদিঘী গ্রামের কৃষক লয়া মিয়া (৫৫)। সম্প্রতি সোনাইদিঘী-বারআঞ্জুল গ্রামের ডাঙ্গুরী খাল খননের পর নিজের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এমন অভিযোগ করেন তিনি।

শুধু লয়া মিয়াই নন, খালের দুই পাড়ের আরও অনেক কৃষক একই অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, অপরিকল্পিতভাবে খাল খনন এবং অ্যাসকেভেটর ব্যবহারের কারণে আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খননকাজের সময় ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি এখন শুরু হয়েছে জমি ভাঙন।



সোনাইদিঘী গ্রামের কৃষক ইদ্রিস আলী (৪৫) জানান, খালের পাশে তার ৩৩ শতক কৃষিজমি রয়েছে। খননকাজের সময় প্রায় ১৫ শতক জমি খালের মধ্যে চলে গেছে। এরপর থেকে ভাঙন আরও বাড়ছে।

তিনি বলেন, ‘সরকারি লোকজনকে অনেকবার বলেছি জমি নষ্ট হচ্ছে, আরও ক্ষতি হবে। কিন্তু তারা কোনো কথাই শোনেননি।’

কৃষক লয়া মিয়া জানান, সরকারি নকশার তুলনায় বেশি জায়গাজুড়ে খাল খনন করা হয়েছে। খালের দুই পাশে তার প্রায় দেড় বিঘা জমি রয়েছে। সেই জমির মাঝখান দিয়েই খাল কেটে দেওয়া হয়েছে। কাজ শুরুর সময় আপত্তি জানালেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, খননকাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে উল্টো ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। তাদের বলা হয়েছে, সরকারি কাজে বাধা দিলে মামলার মুখে পড়তে হবে। জমিতে ফসল থাকা অবস্থাতেই খননকাজ শুরু হওয়ায় ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অথচ ক্ষতিপূরণ নিয়ে কোনো সরকারি কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। স্থানীয় চেয়ারম্যানের কাছেও গিয়েছিলেন তারা, কিন্তু সেখান থেকেও আশানুরূপ সাড়া পাননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মনিরুজ্জামান মনির বলেন, খননের সময় স্থানীয়দের অনাপত্তি ছিল। এখন এসে বিভিন্ন অভিযোগ করা হচ্ছে। সরকারি নকশা অনুযায়ী খালের প্রস্থ ১৮ ফুটের কিছু বেশি হলেও বাস্তবে প্রায় ২০ ফুট করা হয়েছে। এতে কিছু ব্যক্তিগত জমি খালের মধ্যে পড়েছে, এটি সত্য। তবে জমির মালিকদের অনুমতি নিয়েই কাজ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, খাল খননের পর দুই পাড়ে কিছুটা ভাঙন হওয়া স্বাভাবিক। আবাদি জমিরও কিছু ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে স্থানীয় চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে।

তবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। তবে এ জন্য সরকারি কোনো বরাদ্দ নেই। স্থানীয়ভাবে অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে।

অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, ক্ষতিপূরণের কথা বলতে গেলে চেয়ারম্যান তাদের জানিয়েছেন, এটি সরকারি কাজ এবং এ খাতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই।



উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে ডাঙ্গুরী খাল খননের কাজ করা হয়। গত ৪ মে কাজ শুরু হয়ে ৩০ জুন শেষ হয়। ১ হাজার ৬৬২ মিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পে ১০১ জন শ্রমিক কাজ করেন। তাদের দৈনিক মজুরি ছিল ৫০০ টাকা। প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ছিল ৩৯ লাখ ৮৫ হাজার ৭৯৩ টাকা। এর মধ্যে শ্রমিকদের মজুরিতে ব্যয় হয়েছে ১৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা এবং গাছ রোপণে ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ টাকার বেশি। কাজ শেষে ৫ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৯ টাকা অব্যয়িত থাকায় তা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করা বোরহান আলী জানান, খননকাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অ্যাসকেভেটর দিয়ে করা হয়েছে। শুরুতে শুধু অ্যাসকেভেটর ব্যবহার করা হলেও পরে শ্রমিক ও অ্যাসকেভেটর একসঙ্গে কাজ করেছে।

অ্যাসকেভেটর ব্যবহারে কত টাকা ব্যয় হয়েছে—এ প্রশ্নের জবাবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বলেন, এ মুহূর্তে তার কাছে সেই হিসাব নেই।

এদিকে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের বক্তব্যের সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তাইফুর রহমানের বক্তব্যে অমিল দেখা গেছে।

ইউএনও বলেন, খাল খনন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। তবে অন্য কোনো প্রকল্প থেকে তাদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা হবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ