Views Bangladesh Logo

কংক্রিটের জঞ্জালে ভূমিকম্প: জীবন ও ঝুঁকি

ঢাকা—যাকে একসময় মসজিদের শহর বলা হতো, আজ তা রূপ নিয়েছে এক বিশালাকার ‘কংক্রিটের জঞ্জালে’। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গগনচুম্বী অট্টালিকা আর জনঘনত্বের ভারে ন্যুব্জ এই শহরটি এখন ধ্বংসোন্মুখ এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর বিশেষজ্ঞরা ঢাকার এই ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা আমাদের অস্তিত্বের গোড়া নাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ অসহায়ের মত কি হবে এ দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত। বিশেষ করে ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগে ঢাকা শহর কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা এখন আর তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তব।


টেকটোনিক প্লেটের অস্থিরতা ও বাংলাদেশ
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে তিনটি টেকটোনিক প্লেটের (ইউরেশীয়, ইন্ডিয়ান এবং বার্মিজ প্লেট) সংযোগস্থলে অবস্থিত। উত্তরে হিমালয় এবং পূর্বে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন ফল্ট লাইনগুলো প্রচুর শক্তি সঞ্চয় করে আছে। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এই ফল্ট লাইনগুলো যেকোনো সময় ‘শক্তির মুক্তি’ ঘটাতে পারে, যার ফলাফল হবে ৭.৫ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প। এছাড়া আমাদের মাটির গঠন পলিমাটি সমৃদ্ধ হওয়ায় ভূ-কম্পনের তরঙ্গ এখানে বহুগুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ৮৫ শতাংশ ভবন বিল্ডিং কোড বা বিএনবিসি (BNBC) মেনে তৈরি করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ভবনগুলো তাদের নির্ধারিত ভিত্তি বা ফাউন্ডেশনের ধারণক্ষমতার বাইরে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। অনেক ভবনে নিম্নমানের রড বা সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞের মতে, ৭.৫ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরে প্রায় ১৭-১৮ লক্ষ ভবন ধ্বসে পড়তে পারে।


মৃত্যুফাঁদ ঢাকা- জীবন্ত টাইম-বোম্ব
শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি যে, নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা এবং মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের চাপ ও নাগরিকদের উদাসীনতায় এই শহরটি আজ একটি জীবন্ত টাইম-বোমায় পরিণত হয়েছে। কারো কারো মনে হতে পারে আমি এক ভয় জাগানিয়া সিনেমার গল্প বলছি, কিন্তু চোখ বুজে একটু চিন্তা করে দেখুন এটি ঘুমন্ত এক অপ্রিয় সত্য।


ভূ-গর্ভস্থ গ্যাস লাইনের নরককুণ্ড
ঢাকার মাটির নিচে জালের মতো ছড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ ও ছিদ্রযুক্ত তিতাস গ্যাসের পাইপলাইন। ঝুলন্ত অবস্থায় আছে অসংখ্য বৈদ্যুতিক ক্যাবলের এক মহাজঞ্জাল। ভূমিকম্পের প্রথম কয়েক সেকেন্ডেই ভূগর্ভস্থ এই পাইপগুলো ফেটে যাবে। মাটির নিচে জমা হওয়া গ্যাস আর বিদ্যুতের ছিঁড়ে পড়া তারের স্পার্ক মিলে পুরো ঢাকা শহরের মাটির নিচ থেকে আগুনের শিখা ডাইনামাইটের মতো বিস্ফোরিত হবে। অর্থাৎ, ভবন ধ্বসে পড়ার আগেই মানুষ মাটির নিচ থেকে আসা আগুনের লেলিহান শিখায় দগ্ধ হবে।


বাহারি কাঁচের কবরখানা
আধুনিকতার নামে ঢাকার ভবনগুলোতে যে সাধারণ কাঁচের ব্যবহার বেড়েছে, তা ভূমিকম্পের সময় মরণঘাতী তলোয়ারের মতো কাজ করবে। ভূ-কম্পন শুরু হওয়া মাত্রই শত-শত বহুতল ভবন থেকে কাঁচের বিশাল বিশাল খণ্ড বৃষ্টির মতো নিচের রাস্তায় পড়বে। যারা ভবন থেকে বের হতে চাইবেন, তারা এই ধারালো কাঁচের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবেন। একে বলা যেতে পারে ‘নন-স্ট্রাকচারাল ডেথ ট্র্যাপ'।


‘সফট স্টোরি’ ও ডোমিনো ইফেক্ট

ঢাকার অধিকাংশ ভবনের নিচতলা কেবল পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে (পার্কিংয়ের জন্য)। প্রকৌশলবিদ্যায় একে বলা হয় ‘সফট স্টোরি’। ভূমিকম্পের তীব্রতায় এই নিচতলা তাসের ঘরের মতো ধ্বসে পড়বে, আর ওপরের তলাগুলো আস্ত নিচে নেমে আসবে। এক সারিতে থাকা ভবনগুলোর একটি হেলে পাশেরটির ওপর পড়বে—এভাবে পুরো এলাকা ‘ডোমিনো’র মতো একটির পর একটি ধ্বসে পড়বে। তখন উদ্ধারকাজের জন্য কোনো জায়গাই অবশিষ্ট থাকবে না।


তরলীকরণ বা লিকুইফ্যাকশন
ঢাকার বড় একটি অংশ জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে। ভূমিকম্পের সময় এই ভরাট করা পলিমাটি, মাটির থলথলে অবস্থার মতো আচরণ করবে। হয়তো দেখা যাবে কোন কোন বহুতল ভবনটি ভাঙেনি, কিন্তু আস্ত ভবনটি মাটির ভেতর কয়েক তলা পর্যন্ত দেবে গেছে। বনশ্রী, আফতাবনগর, বাড্ডা বা বসুন্ধরার আবাসিক এলাকাগুলোতে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বালুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনগুলো তখন আক্ষরিক অর্থেই বালির বাঁধের মতো হারিয়ে যাবে।


স্তূপ ও উদ্ধারহীন মৃত্যু
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে ১৭-১৮ লাখ ভবন ধ্বসে পড়লে লাশের সংখ্যা হবে অগণিত। আমাদের উদ্ধারকারী বাহিনী বা ফায়ার সার্ভিসের যে জনবল ও যন্ত্রপাতি আছে, তা দিয়ে বড়জোর অল্পকিছু ভবনে উদ্ধারকাজ চালানো সম্ভব। বাকি লাখ লাখ মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে কয়েক দিন ধরে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাবে। সেখানে কোনো অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে পারবে না, কারণ রাস্তাগুলো থাকবে ধ্বংসাবশেষে অবরুদ্ধ। পানীয় জলের অভাবে এবং পচা লাশের দুর্গন্ধে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর জন্য ঢাকা হবে এক বিভীষিকা।


হাসপাতাল ও জরুরি সেবার পঙ্গুত্ব

সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, ঢাকার বড় বড় হাসপাতালগুলো (যেমন: ঢাকা মেডিকেল কলেজ) নিজেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যে হাসপাতালগুলো মানুষের প্রাণ বাঁচাবে, ভূমিকম্পে সেগুলোই আগে ধ্বসে পড়তে পারে। ডাক্তার, নার্স এবং জরুরি সেবা দানকারীরা নিজেরাই যদি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন, তবে আহত কয়েক লাখ মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।


রানা প্লাজার হাজার গুণ ভয়াবহতা

আমরা মাত্র একটি ‘রানা প্লাজা’ ধ্বসে পড়া সামলাতে হিমশিম খেয়েছিলাম। পুরো ঢাকা শহরে যখন হাজার হাজার রানা প্লাজা তৈরি হবে, তখন উদ্ধারকাজ করার মতো চলাচলের রাস্তা ফাঁকা জায়গা থাকবে না। ঢাকার আকাশ বাতাস তখন কেবল কান্নায় ভারি হবে, কিন্তু সাহায্য করার মতো কেউ থাকবে না। এটি কোনো কল্পনা নয়, বরং বিজ্ঞানসম্মত পূর্বাভাস।


ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতির দৈন্যদশা 

আমাদের দুর্যোগ মোকাবিলা প্রস্তুতি এখনো মূলত ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা কেন্দ্রিক। ভূমিকম্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত টিমের অভাব প্রকট। ফায়ার সার্ভিসের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বলা হয়েছে যে, যদি ১০ লাখ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে মাত্র কয়েকশ লোক দিয়ে উদ্ধারকাজ চালানো অসম্ভব। এছাড়া আমাদের দেশে নেই কোনো ‘ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার’ বা কার্যকর 'ডেড বডি ম্যানেজমেন্ট' ব্যবস্থা। জাপানের মতো দেশে যেখানে হাজার হাজার সিসমোমিটার (ভূমিকম্প মাপার যন্ত্র) আছে, বাংলাদেশে যদি কিছু থাকেও তা কার্যকর আছে কি না সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ।


রাষ্ট্রীয় ও নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ: সময় এখন ঘুরে দাঁড়ানোর 

ঢাকা শহরকে একটি অনিবার্য ধ্বংসস্তূপ হওয়া থেকে বাঁচাতে হলে কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়, বরং এখনই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, দুর্যোগের কোনো বাছবিচার নেই; যখন বিপর্যয় নেমে আসবে, তখন বিত্তবান বা নিম্নবিত্ত—কারো প্রাসাদই রেহাই পাবে না।


ড্যাপ (DAP) ও জনস্বার্থের অগ্রাধিকার

বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ (Detailed Area Plan)-কে কেবল কাগজের নকশা হিসেবে রাখলে চলবে না। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, অনেক সময় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা ডেভেলপারদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ড্যাপের মূল চেতনাকে ক্ষুণ্ণ করে অলিগলিতে বহুতল ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এই নীতি আত্মঘাতী। সরকারকে মনে রাখতে হবে, ড্যাপ কোনো ব্যবসায়িক দলিল নয়, এটি নাগরিকদের 'বাঁচার অধিকার'-এর গ্যারান্টি। জলাশয় ভরাট বন্ধ করা, জনসংখ্যার ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত খোলা জায়গা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক আপস হবে চরম অপরাধ।


আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা

রাজউক (RAJUK) এবং সিটি কর্পোরেশনকে কেবল ভবন অনুমোদনের সংস্থা হলে চলবে না, তাদের হতে হবে কঠোর তদারককারী। যারা বিল্ডিং কোড অমান্য করে ‘মৃত্যুফাঁদ’ তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বেশি উচ্চতার ভবনগুলোকে কেবল উচ্চতার মাপকাঠিতে নয়, বরং সেগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও মাটির গঠনভেদে কঠোর মানদণ্ডে যাচাই করতে হবে।


সম্মিলিত নিরাপত্তা

আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘যতক্ষণ সকল মানুষ নিরাপদ নয়, ততক্ষণ আপনিও নিরাপদ নন।’ আপনি হয়তো অনেক টাকা খরচ করে আপনার ভবনটি নিরাপদ করেছেন, কিন্তু আপনার সামনের সরু রাস্তাটি যদি পাশের কোনো দুর্বল ভবনের ধ্বংসস্তূপে বন্ধ হয়ে যায়, তবে ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স আপনার কাছেও পৌঁছাতে পারবে না। এই শহরটি একটি অবিচ্ছেদ্য একক। তাই নিরাপত্তার পরিকল্পনা হতে হবে সামষ্টিক—ওয়ার্ড ভিত্তিক এবং এলাকা ভিত্তিক।


শেষ সতর্কবার্তা

আমরা যদি আজ আমাদের অভ্যাসের পরিবর্তন না করি, যদি আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে মুনাফা খোঁজা বন্ধ না করি, তবে এই তথাকথিত আধুনিক 'কংক্রিটের জঞ্জালই একদিন আমাদের সবার গণকবরে পরিণত হবে। প্রকৃতির প্রতিশোধ বড় নির্মম। আমাদের কৃতকর্মের কারণেই যেন আগামী প্রজন্মের কাছে আমরা ‘এক ব্যর্থ প্রজন্ম’ হিসেবে চিহ্নিত না হই। এখনই সময় ড্যাপ সংশোধন করা, রাজউককে স্বচ্ছ করা এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের মূল্যকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি টেকসই ঢাকা গড়ে তোলা।


সমন্বিত উত্তরণ: শঙ্কার মেঘ বনাম বাঁচার লড়াই 

ঢাকার আকাশে আজ যে বিপদের ঘনঘটা, তাকে অস্বীকার করা হবে স্রেফ আত্মহত্যার শামিল। আমরা একটি বিশাল 'মৃত্যুকূপের' ওপর দাঁড়িয়ে অট্টালিকা গড়ার উৎসবে মেতেছি। যে শহর আমাদের আশ্রয় দেওয়ার কথা, সেই শহরই আজ আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের হাতে নেই, তবে দুর্যোগের প্রস্তুতি আমাদের হাতে।


এই শঙ্কাকে জয় করে একটি স্থিতিস্থাপক ঢাকা গড়তে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি পর্যায় থেকে এখনই নিচের সমন্বিত উদ্যোগগুলো নিতে হবে:


রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও রাষ্ট্রীয় নীতি

দুর্যোগ মোকাবিলায় সমাধান কেবল কারিগরি নয়, বরং রাজনৈতিক। আসন্ন দিনগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাকে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে রেখে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে হবে এমন নীতিমালা করতে, যেখানে মুনাফালোভী ডেভেলপারদের চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য হবে অনেক বেশী।


ভবনের নিরাপত্তা ও কারিগরি মান

বিল্ডিং কোড (BNBC) বাস্তবায়নে কোনো আপস চলবে না। ফ্ল্যাট কেনার সময় গ্রাহককে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে সেটি ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল কি না। পাশাপাশি, শহরের হাজার হাজার পুরাতন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে ‘রেট্রোফিটিং’ বা প্রকৌশলগত সংস্কারের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে।


কমিউনিটি ক্ষমতায়ন ও স্বেচ্ছাসেবী দল

দুর্যোগের প্রথম ৩০ সেকেন্ড এবং পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা প্রাণের সুরক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উদ্ধারকারী দলের অপেক্ষায় না থেকে প্রতিটি পাড়া ও মহল্লায় শক্তিশালী 'স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকারী দল' গঠন করতে হবে। স্থানীয় মানুষই যেন প্রথম সাড়াদানকারী হিসেবে কাজ করতে পারে, সেই প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে।


শিক্ষা, সচেতনতা ও পারিবারিক পরিকল্পনা

স্কুল পর্যায় থেকে নিয়মিত দুর্যোগ মোকাবিলা মহড়া বা ড্রিল বাধ্যতামূলক করতে হবে। হারিয়ে যাওয়া সিভিল ডিফেন্স চর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রতিটি পরিবারকে নিজস্ব 'ডিজাস্টার প্ল্যান' তৈরি করতে হবে—ভূমিকম্পের মুহূর্তে কে আগে গ্যাসের চুলা বন্ধ করবে, কে মেইন সুইচ অফ করবে, ঘরের কোন স্থানটিতে সবাই আশ্রয় নেবে এবং বিপদের পর পরিবারের সবাই ঠিক কোথায় গিয়ে জড়ো হবে, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জরুরি। আমাদের সুরক্ষা আমাদেরই হাতে ভয় নয়, প্রস্তুতিই হোক আমাদের প্রধান শক্তি।


আসুন আজ থেকেই আপনার আমার পরিবার ও কমিউনিটিতে নিচের পদক্ষেপগুলো নিশ্চিত করি:


১. আপনার ভবনটি কি নিরাপদ? (কারিগরি পরীক্ষা)
একজন দক্ষ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে যে ভবনে বাস করি তার সক্ষমতা পরীক্ষা (Visual Inspection/Testing) করি।
* ভবনে কোনো ফাটল বা দুর্বলতা থাকলে দ্রুত 'রেট্রোফিটিং' বা সংস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করি।
* সিঁড়ি বা করিডোরে গ্যাস সিলিন্ডার, আসবাব বা কোনো বাধা রাখবেন না। জরুরি মুহূর্তে দ্রুত বের হওয়ার পথটি সবসময় সচল রাখি।
* অনেক সময় নিরাপত্তার নামে ছাদের দরজা বা জরুরি সিঁড়ির গেট তালাবদ্ধ থাকে। দুর্যোগের সময় এটি মরণফাঁদ। এটি নিশ্চিত করুন যে সংকটের সময় গেটগুলো যেন সহজেই খোলা যায়।
* নতুন ফ্ল্যাট কেনার আগে সেটি বিএনবিসি (BNBC) কোড মেনে তৈরি করা বা করা হচ্ছে কি না, বিশেষ করে ভূমিকম্প সহায়ক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে কি না তা যাচাই করি।


২. ঘরের ভেতরে প্রস্তুতি (পারিবারিক পরিকল্পনা)
* ঘরের ভেতরে বিমের কোণা বা মজবুত টেবিলের নিচে 'সেফ জোন' চিহ্নিত করুন যেখানে কম্পন শুরু হলে আশ্রয় নিতে পারবো।
* আলমারি, ফ্রিজ বা ভারী আসবাবপত্র দেয়ালের সাথে ক্ল্যাম্প দিয়ে আটকে দিই যাতে এগুলো গায়ের ওপর না পড়ে বা পড়ে গিয়ে নষ্ট না হয়।
* ঘরের ভেতর এমন কোনো ভারী ডেকোরেশন বা ঝাড়বাতি রাখি যা কম্পনের সময় খসে পড়ে আঘাত করতে পারে।
* একটি ব্যাগে শুকনো খাবার, পানি, টর্চলাইট, বাঁশি, জরুরি ওষুধ এবং ফার্স্ট এইড বক্স বা ইমারজেন্সি কিট সব সময় প্রস্তুত রাখি।


৩. তাৎক্ষণিক সাড়াদান (গোল্ডেন সেকেন্ডস)
* কম্পন শুরু হলে অযথা দৌড়াদৌড়ি না করি যেখানে আছি সেখানেই নিজেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করি।
* আতঙ্কিত হয়ে জানালা বা বারান্দা দিয়ে লাফ না দিয়ে, 'ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড অন' পদ্ধতি অনুসরণ করি। বিম, শক্ত টেবিল ইত্যাদির নিচে আশ্রয় নিই, কাছে শক্ত যা আছে তা ধরে রাখি, বালিশ, সোফার কুশন ইত্যাদি দিয়ে মাথা ঢেকে রাখি।
* সম্ভব হলে দ্রুত গ্যাসের চুলা এবং মেইন সুইচ বন্ধ করার অভ্যাস গড়ে তুলি।
* লিফট বা সিড়ি ব্যবহারের চিন্তা না করি।


৪. সামাজিক ঐক্য (কমিউনিটি শক্তি)
* পাড়া বা অ্যাপার্টমেন্টে একটি 'রেসপন্স টিম' গঠন করি। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবহার সবাই মিলে শিখি এবং মাঝে মধ্যে চর্চা করি।
* ভবনের ইমারজেন্সি এক্সিট বা জরুরি বের হওয়ার পথটি কি খোলা আছে? আজই পরীক্ষা করার জন্য সবাইকে সচেতন করি এবং তালাবদ্ধ থাকলে তা খুলে রাখার ব্যবস্থা নিতে বলি।


শেষকথা

আমাদের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার নিয়তি বদলে দেওয়ার সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। জাপান বা চিলির মতো দেশগুলো প্রমাণ করেছে যে, চরম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় থেকেও সঠিক পরিকল্পনা আর সাহসিকতার মাধ্যমে মৃত্যুকে জয় করা সম্ভব। আজ যদি আমরা একে অন্যের হাত ধরি, 'নিজে বাঁচলে বাপের নাম' এই মানসিকতা বদলে 'সবাই মিলে বাঁচার' শপথ নেই, তবে কোনো ভূমিকম্পই আমাদের নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না। দুর্যোগের অন্ধকার যতই গভীর হোক, মানুষের সচেতনতা আর সম্মিলিত সদিচ্ছার শক্তি তার চেয়েও বেশি প্রখর। আসুন, আমরা আমাদের প্রিয় এই শহরকে কংক্রিটের কবরস্থান হতে না দিয়ে, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ আবাসভূমি হিসেবে গড়ে তুলি। কারণ, জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই নেই। আমরা যদি আজ সচেতন হই, তবে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে ঢাকাকে একটি দুর্যোগ-সহনশীল (Resilient) শহরে রূপান্তর করা সম্ভব। জাপান যদি বারবার কেঁপে উঠেও হাসিমুখে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তবে সঠিক পরিকল্পনা আর ঐক্য থাকলে আমরাও পারব। আমাদের ছোট ছোট সচেতনতাই পারে লাখ লাখ প্রাণ বাঁচাতে। ভয় সড়িয়ে আসুন আমরা এ বিশ্বাসে স্থিত হই ‘থাকলে প্রস্তুতি মনে, শক্তি বাড়বে প্রতিক্ষণে।’

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ