Views Bangladesh Logo

গ্যাসে চুলা জ্বলে না, বিদ্যুৎ বিলও থামে না: সংকটের দুই আগুনে মানুষ

Shimul  Zabaly

শিমুল জাবালি

দিনাজপুরের হিলিতে পল্লী বিদ্যুতের অফিসের সামনে গত সপ্তাহে লম্বা একটা সারি দেখা গেছে। সবাই বিল জমা দিতে আসেননি। অনেকের হাতে ছিল বিলের কাগজ, আর মুখে একটাই কথা—এত টাকা কেন এল?

বরগুনার বেতাগীতেও একই ছবি। সেখানকার গ্রাহকরা বলছেন, বিল এসেছে স্বাভাবিকের দ্বিগুণ, কারও তিনগুণ। কেউ কেউ বলছেন, মিটার না দেখেই অনুমানে বিল বানানো হয়েছে।

এই ছবি এখন সারা দেশের। ফেসবুকে প্রতিদিন কেউ না কেউ নিজের বিলের ছবি তুলে দিচ্ছেন।

প্রিপেইড মিটারের গ্রাহকদের কষ্টটা আরও তাৎক্ষণিক। তাঁরা বলছেন, রিচার্জ করা টাকা যেন গলে যাচ্ছে। যে টাকায় আগে মাস চলত, এখন সপ্তাহ পার করাই কঠিন। মাঝপথে ব্যালান্স ফুরিয়ে গেলে ইমার্জেন্সি ব্যালান্স নিয়ে চালাতে হয়, আর সেটা কেটে নেওয়া হয় পরের রিচার্জ থেকে। ফলে পরের বার আরও কম ইউনিট মেলে। ঘাটতিটা গড়াতেই থাকে।

সরকারের ব্যাখ্যা আছে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিল বাড়ার কারণ মিটারের ত্রুটি নয়। জুন থেকে নতুন দর কার্যকর হয়েছে, লোডশেডিং কমায় মানুষ বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, আর ব্যবহার বাড়ায় বিল গোনা হচ্ছে ওপরের স্ল্যাবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, অভিযোগগুলো আলাদা করে দেখা হয়েছে, বেশির ভাগই আসলে ভুল বোঝাবুঝি।

কথাটা পুরোপুরি ভুল নয়। স্ল্যাবের হিসাবটা অনেকেই জানেন না। ধরুন, কেউ মাসে ২০০ ইউনিট ব্যবহার করতেন, এবার করলেন ২৫০। ব্যবহার বাড়ল এক-চতুর্থাংশ। কিন্তু বাড়তি ৫০ ইউনিট আগের দামে গোনা হয় না, ওগুলো ওপরের ধাপে চলে যায়, যেখানে প্রতি ইউনিটের দাম বেশি। ফলে বিল বাড়ে অনেক বেশি হারে।

কিন্তু ব্যাখ্যা দেওয়া আর সান্ত্বনা দেওয়া এক জিনিস নয়।

‘ভুল বোঝাবুঝি’ কথাটার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম ঝাঁকুনি আছে। এতে দায়টা চলে যায় গ্রাহকের ঘাড়ে—যেন তিনি বোঝেননি বলেই সমস্যা। অথচ প্রশ্নটা তো উল্টো। বোঝানোর দায়িত্ব কার ছিল?

নতুন দর কার্যকর হওয়ার আগে কজন গ্রাহক জানতেন তাঁর বিল কত বাড়তে পারে? বিলের কাগজে কি লেখা থাকে, কোন ধাপে কত ইউনিট গোনা হলো, কোন খাতে কত টাকা? প্রিপেইড গ্রাহককে কি কেউ আগে জানিয়েছিল, একই টাকায় এখন কত কম ইউনিট মিলবে?

জানানো হয়নি। দাম বাড়ার খবরটা এসেছে বিজ্ঞপ্তি হয়ে, আর ফলটা এসেছে বিলের কাগজ হয়ে। মাঝখানের কথাটুকু কেউ বলেনি।

তার চেয়ে বড় কথা, সব অভিযোগই যে ভুল বোঝাবুঝি, বিদ্যুৎ বিভাগ নিজেও তা বলতে পারেনি। পরে তারা স্বীকার করেছে, জুন মাসের বিলে কিছু ‘করণিক ভুল’ ছিল। ভুল তাহলে ছিল। কতগুলো, সেটা আমরা জানি না।

ভোক্তা সংগঠন ক্যাব আরও গুরুতর একটা কথা বলেছে। তাদের সন্দেহ, অর্থবছর শেষে সিস্টেম লস কম দেখানোর জন্য বাড়তি বিল করার প্রবণতা থাকতে পারে। তাই তারা নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছে।

অভিযোগটা প্রমাণিত নয়। কিন্তু তদন্ত না করে উড়িয়ে দেওয়ার মতোও নয়। কারণ কথাটা যদি সত্যি হয়, তার মানে দাঁড়ায়—বিতরণ ব্যবস্থার নিজের ঘাটতির হিসাব মেলানো হচ্ছে গ্রাহকের পকেট থেকে।

এই বিলের ধাক্কাটা এমন এক সময়ে এল, যখন ঘরে ঘরে আরেক বিপদ চলছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের সংকট তীব্র। রাজধানীর অনেক এলাকায় দিনের বড় সময় চুলা জ্বলে না। মিরপুরের এক বাসিন্দা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, তাঁদের ওখানে আগে ভোর চারটা থেকে ঘণ্টা দুয়েক গ্যাস পাওয়া যেত, এখন দিনে থাকেই না। অনেক পরিবার রাত জেগে রান্না সারছে। চট্টগ্রামে দৈনিক ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমেছে ২২৫ মিলিয়নে।

কারণটা কারও হাতে নেই। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। মেরামত শেষ না হলে কার্গো খালাস করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা—তিনটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি থাকলেও একটি মাত্র এলএনজি দিচ্ছে, তা-ও পুরোটা নয়। বাকিটা কিনতে হচ্ছে খোলাবাজার থেকে, চড়া দামে।

কিন্তু এই ব্যাখ্যাগুলো রান্নাঘরে কাজে লাগে না। ভাত তো রাঁধতেই হবে।

তাই যাঁরা পারছেন, বৈদ্যুতিক চুলা বা ইন্ডাকশন কুকার কিনছেন। কেউ কিনছেন এলপিজি সিলিন্ডার। আর যাঁরা পারছেন না, তাঁরা ফিরে যাচ্ছেন কাঠের চুলায়।

‘যাঁরা পারছেন’—এই কথাটার মধ্যেই আসল কথাটা লুকিয়ে আছে।

একটা ইন্ডাকশন কুকার বা বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে যে টাকা লাগে, তার সঙ্গে লাগে উপযুক্ত বাসনও—সব হাঁড়ি-কড়াই এতে চলে না। এরপর আছে প্রতি মাসের খরচ, কারণ রান্নার যন্ত্র ঘরের সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ টানা যন্ত্রগুলোর একটি। যে পরিবার এমনিতেই বিলের ধাক্কা সামলাতে পারছে না, তার পক্ষে এই দুটো খরচ একসঙ্গে বহন করা সম্ভব নয়।

তাই সংকটটা সবাইকে একভাবে ছোঁয় না।

যাঁর সামর্থ্য আছে, তিনি একটা যন্ত্র কিনে ফেলেন। ভোগান্তি হয়, কিন্তু রান্না চলে। যাঁর সামর্থ্য নেই, তাঁর সামনে থাকে কাঠ, খড়কুটো, কেরোসিন—কিংবা রাত জেগে গ্যাসের অপেক্ষা। শহরের ফ্ল্যাটে কাঠের চুলা জ্বালানো কী জিনিস, যিনি জ্বালাননি তিনি বুঝবেন না। ধোঁয়ায় ঘর ভরে যায়, বাচ্চাদের কাশি লেগে থাকে, প্রতিবেশী বিরক্ত হন।

অর্থাৎ একই সংকটে সচ্ছল পরিবারের ক্ষতি টাকায় মাপা যায়, আর গরিব পরিবারের ক্ষতি মাপতে হয় স্বাস্থ্য আর মর্যাদা দিয়ে।

এবার আসল প্রশ্নটায় আসি।

জুন থেকে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে গ্রাহক পর্যায়ে ১৫ থেকে প্রায় ২০ শতাংশ, পাইকারিতে প্রায় ২০, আর সঞ্চালনে প্রায় ২৪ শতাংশ। কিন্তু একই ঘোষণায় বিইআরসি আরেকটা কথা বলেছে, যা নিয়ে আলোচনা প্রায় হয়নি—এত বাড়ানোর পরও পিডিবির ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

সংখ্যাটার দিকে একটু থেমে তাকানো দরকার।

দাম বাড়ল, তবু ৪১ হাজার কোটি টাকার ফাঁক থেকেই গেল। তাহলে ফাঁকটা তৈরি হচ্ছে কোথায়? গ্রাহক কম দিচ্ছেন বলে? নাকি বিদ্যুৎ আর জ্বালানি কেনার খরচটাই এমনভাবে বাঁধা যে যত দামই বাড়ানো হোক, ফাঁক ভরে না?

এই প্রশ্নের উত্তর কেউ খোঁজে না। বদলে প্রতিবার একই ওষুধ আসে—দাম বাড়াও। ফলে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে চুক্তিতে, পরিকল্পনায়, ব্যবস্থাপনায়, তার দাম দিতে হয় সেই মানুষটিকে, যিনি ওসব আলোচনার ধারেকাছেও ছিলেন না।

আর দামটা সবাই সমানভাবে দেন না।

যাঁর আয় মাসে লাখ টাকা, তাঁর বিল দুই হাজার বাড়লে তিনি বিরক্ত হন। যাঁর আয় পনেরো হাজার, তাঁর বিল পাঁচশ টাকা বাড়লে সংসারের হিসাব বদলাতে হয়। এই মাসে মাছটা বাদ, ওষুধটা আগামী সপ্তাহে, ছেলের প্রাইভেট টিউটরকে বলা—একটু দেরি হবে।

বিদ্যুতের খরচ কমানো যায় না বললেই চলে। বাতি নেভানো যায়, ফ্যান বন্ধ করা যায় না। গরমে বাচ্চা আর বুড়ো মানুষের জন্য একটা ফ্যান বিলাসিতা নয়। রান্নাও বন্ধ রাখা যায় না। তাই বিল বাড়লে যা কমে, তা হলো খাবার, চিকিৎসা আর পড়ার খরচ। এই বদলটা কোনো পরিসংখ্যানে ওঠে না, কিন্তু ঘরে ঘরে ঘটে।

আরেকটা কথা না বললেই নয়।

কর্তৃপক্ষ বলছে, লোডশেডিং কমেছে বলেই ব্যবহার বেড়েছে, তাই বিল বেশি। কথাটা সত্যি। কিন্তু এর মানে দাঁড়ায়, বিদ্যুৎ পাওয়ার সুখটাই বোঝা হয়ে ফিরে এসেছে। যে পরিবার এতগুলো বছর অন্ধকারে কাটিয়েছে, আলো পাওয়ার পর তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো এমন একটা বিল, যা সে দিতে পারছে না।

উন্নয়নের মানে যদি এই হয়, তাহলে মানেটা নিয়েই ভাবা দরকার।

করণীয় খুব কঠিন কিছু নয়।

ক্যাব যে তদন্ত চেয়েছে, সেটা হওয়া দরকার। জুন মাসের বিলে কতগুলো ভুল ছিল, কোথায় কত অভিযোগ এসেছে, কতগুলো ঠিক করা হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে এলে অর্ধেক সন্দেহ এমনিতেই মিটে যায়।

বিলের কাগজটা বোধগম্য করা দরকার। কোন ধাপে কত ইউনিট, কোন খাতে কত টাকা—সহজ ভাষায় লেখা থাকলে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ কথাটা আর বলতে হবে না। প্রিপেইড গ্রাহককেও রিচার্জের সময় দেখানো দরকার, কত টাকায় কত ইউনিট মিলছে, কোন খাতে কত কাটা গেল।

যেসব এলাকায় গ্যাস কার্যত আসছেই না, সেখানে ন্যূনতম বিল আদায় করা কতটা যৌক্তিক—এই প্রশ্নটাও করা দরকার। মানুষ টাকা দিচ্ছে, সেবা পাচ্ছে না।

আর অভিযোগ জানানোর একটা কাজের ব্যবস্থা থাকা দরকার। হটলাইনে ফোন করে যিনি সাড়া পান না, তাঁর যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই।

হিলির অফিসের সামনে সেদিন যাঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁরা কেউ ভর্তুকির অঙ্ক জানেন না। এফএসআরইউ কী, তা-ও জানেন না। হরমুজ প্রণালি কোথায়, সে খবরও রাখেন না।

তাঁরা শুধু জানতে চেয়েছিলেন, এই মাসে এত টাকা কেন।

প্রশ্নটা ছোট। কিন্তু উত্তরটা না পাওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের বোঝাপড়াটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

উত্তরটা দেওয়া দরকার। সংখ্যায় নয়, ভাষায়।


শিমুল জাবালি। কবি ও সাংবাদিক
shimulzabaly@gmail.com


মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ