Views Bangladesh Logo

সারাদেশে চালু হচ্ছে ডিজিটাল ‘ই-বেইলবন্ড’

বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমানো, জামিননামা জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং আদালত থেকে কারাগার পর্যন্ত জামিন প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে দেশে প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে ডিজিটাল জামিননামা বা ‘ই-বেইলবন্ড’ ব্যবস্থা। প্রচলিত পদ্ধতিতে আদালত থেকে জেলখানায় জামিননামা পৌঁছাতে কয়েক দিন সময় লাগলেও নতুন এই অনলাইন ব্যবস্থায় বিচারকের অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে তা সরাসরি সংশ্লিষ্ট কারাগারে পৌঁছে যাবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং জামিন পাওয়ার পর দ্রুত মুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থা সফলভাবে চালু হয়েছে।
সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চলতি মার্চ মাস থেকেই পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ‘ই-বেইলবন্ড’ সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়।

‘ই-বেইলবন্ড’ বা ডিজিটাল জামিননামা হলো আদালতের জামিন প্রক্রিয়াকে অনলাইনে সম্পন্ন করার একটি আধুনিক পদ্ধতি। আগে আদালত থেকে জামিন মঞ্জুর হওয়ার পর কাগজপত্র হাতে হাতে বিভিন্ন দপ্তর ঘুরে কারাগারে পৌঁছাতে কয়েক দিন সময় লাগত। এতে দেরি হতো এবং মাঝেমধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের সুযোগ তৈরি হতো। ই-বেইলবন্ড ব্যবস্থায় আইনজীবী অনলাইনে জামিননামা দাখিল করেন। বিচারক সেটি যাচাই করে ডিজিটালভাবে অনুমোদন দিলে তা সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারাগারে পৌঁছে যায়। এরপর জেল কর্তৃপক্ষ অনলাইনে নথি যাচাই করে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আসামির মুক্তির ব্যবস্থা করে। এই পদ্ধতির ফলে জামিন প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়। কাগজপত্র জালিয়াতির সুযোগ কমে, মধ্যস্বত্বভোগীদের হয়রানি হ্রাস পায় এবং জামিন পাওয়ার পর অযথা কারাগারে অপেক্ষা করতে হয় না। ফলে বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত ও সহজে আইনি সেবা পেতে পারেন।

মন্ত্রণালয়ের এক নথিতে বলা হয়েছে, ‘দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৪৯৯(৩) ধারায় অনলাইনে বেইলবন্ড দাখিলের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এই আইনি কাঠামোর ভিত্তিতেই একটি আধুনিক ‘ই-বেইলবন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ তৈরি করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি জেলায় চালুর পর এবার তৃতীয় ধাপে চলতি মাসেই সারা দেশে এই সেবা চালু হচ্ছে। প্রথমেই বগুড়া, ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর, মংয়মনসিংহ, সিলেট, নাটোর ও কুষ্টিয়ায় ‘ই-বেইলবন্ড’ চালু হবে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আশা করছেন, চলতি মার্চ মাসের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে ডিজিটাল জামিননামা বা ‘ই-বেইলবন্ড’ ব্যবস্থা ৬৪ জেলায় চালু করা সম্ভব হবে।

আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদেম উল কায়েস বলেন, ‘অনলাইনে জামিননামা দাখিলের এই পদ্ধতি চালু হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও বিচার প্রার্থীদের হয়রানি বন্ধ হতে বাধ্য। আদালত থেকে জামিন মঞ্জুর হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই আসামির মুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জামিন প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে, যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনবে।’

তিনি জানান, বর্তমান সরকারের জনবান্ধব বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই ‘ই-বেইলবন্ড’ সেবার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনমন্ত্রীর নির্দেশনায় ইতোমধ্যে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লার সভাপতিত্বে গত ৩ মার্চ সংশ্লিষ্ট সাত জেলার জেলা ও দায়রা জজ বা মহানগর দায়রা জজ এবং চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ৪ মার্চ সংশ্লিষ্ট জেলার জিপি, পিপি ও আইনজীবী সমিতির নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভা করে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। এসব সভায় বিচার বিভাগ ও আইনজীবীদের মতামত নেওয়ার পাশাপাশি নতুন ব্যবস্থাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রথমবারের মতো পাইলট প্রকল্প হিসেবে ‘ই-বেইলবন্ড’ চালু করা হয়। সেখানে আশানুরূপ সাফল্য পাওয়ার পর গত ২১ জানুয়ারি আরও আটটি জেলায় এ সেবা সম্প্রসারণ করা হয়েছিলো। এবার সারা দেশে এটি চালু হচ্ছে।

সরকারি তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত নয়টি জেলায় মোট ১৯ হাজার ১৮৫ জন বিচারপ্রার্থী পরীক্ষামূলক ‘ই-বেইলবন্ড’ সেবায় সরাসরি উপকৃত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু নারায়ণগঞ্জেই প্রায় ১২ হাজার ডিজিটাল জামিননামা সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া মানিকগঞ্জ, বান্দরবান, মৌলভীবাজার, শেরপুর, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, মেহেরপুর ও ঝালকাঠিতে সাত হাজারের বেশি ‘ই-বেইলবন্ড’ সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে এবং বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল এই সেবার প্রতি আগ্রহও বাড়ছে। তাই এটি সারা দেশের সব আদালতে চালু হলে বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত ও সহজে আইনি সেবা পাবেন।

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান এ ব্যপারে ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশে প্রথমবারের মতো চালু হতে যাওয়া ‘ই-বেইলবন্ড’ ব্যবস্থা বিচার ব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা করবে।’ তিনি বলেন, বর্তমানে যেসব জেলায় এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু আছে, সেখানে কার্যক্রম অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সরকার এর পরিসর আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। চলতি মার্চেই দেশের ৬৪ জেলায় এই সেবা চালু হবে।’

আইন ও বিচার বিভাগের যুগ্মসচিব (প্রশাসন-১) মো. আজিজুল হক বলেন, ‘আগে আদালত থেকে জামিন মঞ্জুর হওয়ার পর জামিননামার কাগজ কারাগারে পৌঁছাতে কয়েক দিন সময় লাগত। ফাইল হাতে হাতে আদালতের বিভিন্ন কর্মকর্তা হয়ে জেলখানায় পৌঁছানোর কারণে প্রায়ই বিলম্ব হতো। ফলে জামিন পাওয়ার পরও অনেক আসামিকে অতিরিক্ত সময় কারাগারে থাকতে হতো এবং এ সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বাড়ত।’ তিনি বলেন, ‘ই-বেইলবন্ড’ পদ্ধতিতে বিচারকের স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে জামিননামা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কারাগারে পৌঁছে যাবে। জেল কর্তৃপক্ষ অনলাইনে নথি যাচাই করে আসামির স্বাক্ষর নেওয়ার পর দ্রুত মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারবে। এতে জামিননামা জালিয়াতির সুযোগও পুরোপুরি বন্ধ হবে এবং বিচারপ্রার্থীরা অযথা হয়রানির শিকার হবেন না।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদিন (এমপি) এ ব্যাপারে বলেন , আগে একটি জামিননামা সম্পন্ন করতে আদালত থেকে কারাগার পর্যন্ত পৌঁছাতে ১৩টি ধাপ পার হতে হতো। ‘ই-বেইলবন্ড’ চালুর ফলে মাত্র তিনটি প্রধান ধাপেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এর ফলে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ডিজিটাল রূপান্তরের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। এ উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে এবং সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত, সহজ ও হয়রানিমুক্ত সেবা পেতে পারবেন।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ