গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী-কন্যার শরীরে ধর্ষণের আলামত নিয়ে ডোম ও চিকিৎসকের ভিন্ন বক্তব্য
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ডের পর তার স্ত্রী ও মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে যে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন ডোম ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবলু কুমার বিশ্বাস জানান, নিহত মা ও মেয়ের মরদেহে ধর্ষণের কোনো আলামত নেই। অপরদিকে, মর্গকর্মী (ডোম) ভিউজ বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, হত্যার আগে মা ও মেয়েকে ধর্ষণ করা হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘পোস্টমর্টেমের সময় মা ও মেয়ের শরীরে বীর্য জাতীয় তরল দেখতে পান এবং উপস্থিত চিকিৎসককেও দেখান। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে সেসব তরল সরিয়ে রাখেন মর্গকর্মী।’
এদিকে চিকিৎসক বলেন, ‘নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০) ও মেয়ে আগমনী চক্রবর্তীর (২৫) ধর্ষণের আলামত পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে সংগ্রহ করা সোয়াবের নমুনা মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া গেছে, এমন কথা বলেনি।’ ধর্ষণচেষ্টা বা এ ধরনের কোনো আলামতও মেলেনি বলে জানান তিনি।
বাবলু কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা ও আগমনী চক্রবর্তীর ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। সুতরাং আমরা বলতে পারি তারা ধর্ষণের শিকার হননি। এই বিষয়টি আমরা বাদ দিতে পারি।’
হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটেছে, সে প্রসঙ্গে চিকিৎসক বলেন, ‘ভারি কোনো অস্ত্রের আঘাতে তাদের হত্যা করা হয়নি। আলামত সংগ্রহ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আমরা যেটি দেখেছি, তাদের শ্বাসরোধ করেই হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পূর্ব-মুহূর্তে কিছুটা ধাক্কাধাক্কি বা ধস্তাধস্তির আঘাতপ্রাপ্ত ফোলা চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে শরীরের কোনো কাটা-ছেঁড়ার চিহ্ন পাওয়া যায়নি।’
মরদেহের মুখে থাকা তরল পদার্থ ও মুখমণ্ডলের পরিবর্তন নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নিহতদের মুখের কাছে পাওয়া তরল পদার্থ কোনো রাসায়নিক বা কেমিক্যাল বার্নের কারণে নয়। মরদেহ পচনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মুখের রং ও চেহারায় এমন পরিবর্তন হয়েছে। তাদের চোয়াল ভাঙার কোনো প্রমাণও ময়নাতদন্তে মেলেনি।’
মরদেহের মুখ তরল পদার্থ বা অ্যাসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়া হয়েছে বলে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল, তারও কোনো সত্যতা ময়নাতদন্তে মেলেনি বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘কয়েকদিন মরদেহ পড়ে থাকার কারণে মুখমণ্ডল ঝলসে যাওয়ার মতো দেখিয়েছে।’ পরীক্ষা-নিরীক্ষার এসব ফল যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট আকারে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল মর্গের ইনচার্জ সাহেব আলী ভিউজ বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, মা-মেয়ের মরদেহ প্রায় ৮৪ ঘণ্টা পর মর্গে পাওয়া গেছে এবং এরপর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় ধর্ষণ হয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। স্যাম্পল পরীক্ষা করার পর বিস্তারিত জানা যাবে। মেয়েটির শরীর থেকে চর্বির মতো একটি তরল পদার্থ বের হতে দেখা গেছে। আমাদের প্রাথমিক ধারণা, এটি মেয়েটির শারীরিক তরল হতে পারে। তবে শুধু দেখে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। বিষয়টি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। আমরা যে পরীক্ষা করেছি, তাতে প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে তরল পদার্থটি কী এবং এটি কোনো কিছুর সঙ্গে মিশ্রিত কি না, তা পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। এখন এটিকে চর্বিজাতীয় পদার্থ বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরীক্ষার পর প্রকৃত বিষয়টি জানা যাবে। তবে মায়েরও ধর্ষণ হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে তার নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে।’
তিনি জানান, চারটি ‘সোয়াব’ সংরক্ষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে দুটি সিআইডিতে এবং দুটি প্যাথলজি বিভাগে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে এবং রিপোর্ট পাওয়ার পরই পুরো বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানা যাবে। তিনি আরও জানান, জীবিত অবস্থায় ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়, আর ১০-১২ ঘণ্টার মধ্যে মর্গে মরদেহ এলে ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া সম্ভব।
উল্লেখ্য, শনিবার (২২ আগস্ট) দিবাগত রাত ১১টার দিকে মাছুয়াপাড়ার বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে থানা পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআই ঘটনার তদন্তের জন্য আলামত সংগ্রহ করে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন, যে মামলায় সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রোববার (২৩ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, গভীর রাতে গণপতির বাসার ছাদে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ইয়াবা সেবন করছিলেন এবং বাধা দেওয়ায় গণপতিসহ তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েকে একে একে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
মতামত দিন