গোলের পর অতিরক্ষণাত্মক হয়েই কি কপাল পুড়ল ইংল্যান্ডের?
ফুটবলে কখনও কখনও একটি সিদ্ধান্তই বদলে দেয় পুরো ইতিহাস। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের গল্পটাও যেন তেমনই। ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর মনে হচ্ছিল, ১৯৬৬ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে ইংলিশদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হলো নিজেদেরই বেছে নেওয়া কৌশলের কাছে। আক্রমণের বদলে অতি রক্ষণকে আঁকড়ে ধরার সিদ্ধান্তই যেন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়াল।
গ্যারেথ সাউথগেটের বিদায়ের পর গত বছরের অক্টোবরে ইংল্যান্ডের দায়িত্ব নিয়েছিলেন জার্মান কোচ থমাস টুখেল। ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে নকআউট ম্যাচের সফল কৌশলী হিসেবে তার সুনাম ছিল। ধারণা করা হয়েছিল, পরিস্থিতি বুঝে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার দক্ষতাই ইংল্যান্ডকে দীর্ঘদিনের শিরোপাখরা কাটাতে সাহায্য করবে। কিন্তু বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে সেই টুখেলই এমন এক কৌশল বেছে নিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তার দলের জন্য আত্মঘাতী হয়ে উঠল।
ম্যাচের প্রথম এক ঘণ্টা ছিল ইংল্যান্ডের পরিকল্পনার প্রতিচ্ছবি। সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং মাঝমাঠে শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনাকে খুব বেশি সুযোগ দেয়নি তারা। সেই ধারাবাহিকতায় ৫৫ মিনিটে দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক থেকে গর্ডনের গোল আসে। তখনই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়, তবে গোলের কারণে নয়; গোলের পর ইংল্যান্ডের মানসিকতার পরিবর্তনের কারণেই।
এক গোলে এগিয়ে থাকার পর আক্রমণের ধার বজায় রাখার বদলে পুরো দল ধীরে ধীরে নিজেদের অর্ধে গুটিয়ে নেয়। বলের দখল ছেড়ে দিয়ে তারা যেন আমন্ত্রণ জানাতে থাকে আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ। অথচ বেঞ্চে তখনও ছিলেন বুকায়ো সাকা, ননি মাদুয়েকে ও মার্কাস রাশফোর্ডের মতো গতিময় ফুটবলাররা, যাদের ব্যবহার করে পাল্টা আক্রমণের ভয় দেখিয়ে প্রতিপক্ষকে সতর্ক রাখা যেত। টুখেল সেই পথ বেছে নিলেন না।
বরং দ্বিতীয়ার্ধের কুলিং ব্রেকের পর গর্ডনকে তুলে এজরি কনসাকে নামিয়ে তিন সেন্টার-ব্যাকের সঙ্গে পাঁচজনের রক্ষণভাগ গড়ে তোলেন। পরে ড্যান বার্নকে নামিয়ে দলকে আরও রক্ষণাত্মক ৫-৪-১ ছকে নিয়ে যান। ফলে আর্জেন্টিনা কার্যত পুরোপুরি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
সংখ্যাগুলোই ইংল্যান্ডের কৌশলের সবচেয়ে বড় সাক্ষী। গর্ডনের গোল থেকে লাউতারো মার্তিনেসের জয়সূচক গোল পর্যন্ত মাঝের ৩৭ মিনিটে ইংল্যান্ডের বল দখল ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি দল যদি কেবল নিজেদের বক্স রক্ষা করতেই ব্যস্ত থাকে, তাহলে প্রতিপক্ষের গোল আসাটা সময়ের অপেক্ষা হয়ে যায়।
আর সেই অপেক্ষার অবসান ঘটান এনজো ফার্নান্দেজ। ৮৫ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে তার দুর্দান্ত শটে সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা। অথচ প্রশ্ন উঠেছে, যখন বক্সে পাঁচ-পাঁচজন ডিফেন্ডার অবস্থান করছিলেন, তখন এনজোর মতো একজন মিডফিল্ডার কীভাবে এতটা জায়গা পেলেন? কয়েক মিনিট আগেই একই জায়গা থেকে তার একটি শট কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন জর্ডান পিকফোর্ড। দ্বিতীয়বার আর রক্ষা হয়নি।
সমতায় ফেরার পর ম্যাচের গতি পুরোপুরি বদলে যায়। আর্জেন্টিনা তখন আত্মবিশ্বাসে উজ্জ্বল, আর ইংল্যান্ড মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শট পোস্টে লাগার পরও সতর্ক হয়নি ইংলিশরা। যোগ করা সময়ে লিওনেল মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে লাউতারো মার্তিনেসের হেড জড়িয়ে যায় জালে। মুহূর্তেই ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এবং নিশ্চিত করে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল।
ম্যাচ শেষে স্বাভাবিকভাবেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় টুখেলকে। তবে সমালোচনার মুখেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে একচুল সরে আসেননি জার্মান কোচ। তার দাবি, পরিকল্পনা প্রায় সফল হয়েই গিয়েছিল। তিনি বলেন, মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব কোচেরই এবং তিনি নিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী খেলেছেন। দলের প্রচেষ্টায় তিনি সন্তুষ্ট, কারণ ইংল্যান্ড জয় থেকে খুব কাছাকাছি ছিল।
টুখেলের যুক্তি ছিল, গোলের পর আর্জেন্টিনা প্রচুর ক্রস তুলতে শুরু করেছিল। তাই বক্সের ভেতরের জায়গা বন্ধ করা এবং আকাশপথের আক্রমণ ঠেকাতেই পাঁচজনের রক্ষণ সাজানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, আর্জেন্টিনা শুধু উঁচু বলেই নয়, বক্সের বাইরের জায়গা ব্যবহার করেই ম্যাচে ফিরেছে। মেসির সৃজনশীলতা, এনজোর দূরপাল্লার শট এবং লাউতারোর নিখুঁত ফিনিশিং সেই পরিকল্পনার দুর্বলতাই সামনে এনে দিয়েছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইংল্যান্ডের সেমিফাইনাল ব্যর্থতার তালিকায় এবার যুক্ত হলো আরেকটি অধ্যায়। তবে এই হার প্রতিপক্ষের অসাধারণ ফুটবলের পাশাপাশি নিজেদের কৌশলগত ভুলের কারণেও দীর্ঘদিন আলোচিত হবে। কারণ ফুটবলে কখনও কখনও এক গোলে এগিয়ে থাকার সবচেয়ে নিরাপদ পথ রক্ষণে গুটিয়ে যাওয়া নয়; বরং প্রতিপক্ষকে আক্রমণের ভয় দেখিয়ে রাখাই। সেই সত্যটি ভুলে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। আর সেই ভুলের সুযোগ নিয়েই আর্জেন্টিনা লিখেছে আরেকটি মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের গল্প।
মতামত দিন