আর্জেন্টিনা জিতল, হারল কি বিশ্বকাপের ন্যায়বিচার?
ফুটবলের সৌন্দর্য শুধু গোল, ড্রিবলিং কিংবা অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে নয়; এর সবচেয়ে বড় শক্তি ন্যায়সংগত প্রতিযোগিতা। কিন্তু সেই ন্যায্যতাই যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন জয়ও হারিয়ে ফেলে তার ঔজ্জ্বল্য। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের নাটকীয় জয় তাই যতটা না প্রত্যাবর্তনের গল্প, তার চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে বিতর্ক, ভিএআর এবং রেফারিংয়ের বিচারের গল্প।
আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে ৮০ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল মিশর। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তখন প্রায় বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু শেষ ১৩ মিনিটে তিনটি গোল করে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ঘটায় লিওনেল মেসির দল। স্কোরলাইন ইতিহাসে জায়গা করে নিলেও ম্যাচের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে রেফারির একের পর এক সিদ্ধান্ত।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দেয় ৬৮ মিনিটে মোস্তফা জিকোর করা গোলটি বাতিল হওয়ার ঘটনা। ভিএআরের পর্যালোচনায় আক্রমণের শুরুতে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের ওপর ফাউলের অভিযোগ তুলে গোলটি বাতিল করা হয়। অথচ যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলের আগে পেনাল্টি বক্সে মোহাম্মদ সালাহ ফাউলের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করে মিশর। সেই ঘটনায় ভিএআর বা রেফারি কেউই হস্তক্ষেপ করেননি।
এই দুই সিদ্ধান্তের মধ্যকার বৈপরীত্যই বিতর্কের মূল কেন্দ্র। প্রশ্ন উঠেছে—একই ধরনের ঘটনায় কেন দুই রকম বিচার?
ম্যাচ শেষে মিশরের মিডফিল্ডার আবেগাপ্লুত মোস্তফা জিকো রীতিমতো বিস্ফোরক অভিযোগ করেন। তার দাবি, ম্যাচের ফল যেন আগেই নির্ধারিত ছিল। রেফারি শুরু থেকেই মিশরের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং আর্জেন্টিনার পথ সহজ করে দিয়েছেন। এমন মন্তব্য নিঃসন্দেহে গুরুতর। যদিও কোনো প্রমাণ ছাড়া ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করা যায় না, তবে এমন অভিযোগ ওঠার মতো পরিবেশ যে তৈরি হয়েছে, সেটিই ফুটবলের জন্য অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
বিতর্ক আরও উসকে দিয়েছেন সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষকেরা। আর্সেনাল কিংবদন্তি ইয়ান রাইটের মতে, যদি মিশরের গোল বাতিল করতে ভিএআর অতীতের ঘটনাও খুঁজে দেখতে পারে, তাহলে সালাহর ওপর হওয়া সম্ভাব্য ফাউলও একইভাবে পর্যালোচনা করা উচিত ছিল। লিভারপুল কিংবদন্তি জেমি ক্যারাঘারও বলেছেন, এই ধরনের গোল ইউরোপের শীর্ষ লিগে সাধারণত বাতিল করা হতো না।
রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হোসে মরিনিয়োর মন্তব্য ছিল আরও কড়া। তিনি ম্যাচটিকে "দিনদুপুরে ডাকাতি" বলে আখ্যা দেন। যদিও এমন ভাষা আবেগপ্রসূত, তবু এটি প্রমাণ করে যে রেফারিংয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন শুধু পরাজিত দলের নয়, নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।
মিশর ফুটবল ফেডারেশনও বিষয়টি হালকাভাবে নেয়নি। তারা ফিফার কাছে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের পারফরম্যান্সের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দিয়েছে। অভিযোগে বাতিল হওয়া গোল, পেনাল্টির দাবি উপেক্ষা এবং ম্যাচ পরিচালনায় পক্ষপাতের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। এখন দৃষ্টি ফিফার প্রতিক্রিয়ার দিকে।
অন্যদিকে ম্যাচ-পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কিছু আর্জেন্টিনা সমর্থক মিশরীয় সমর্থকদের উদ্দেশে অ্যালকোহল ছিটিয়ে বিদ্রূপ করেছেন। যদিও এ ঘটনার আনুষ্ঠানিক সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি, তবুও এমন অভিযোগ বিশ্বকাপের মতো আসরের সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এই ঘটনার মধ্যেই আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে ফিফার স্বচ্ছতা। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধের পর যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সেই ঘটনায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ভূমিকা নিয়ে ইউরোপীয় আইনপ্রণেতাদের তদন্ত দাবিও বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফলে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের বিতর্ককে অনেকেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবেও দেখছেন।
আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে—ফলাফলের খাতায় সেটিই চূড়ান্ত সত্য। কিন্তু এই ম্যাচ আরও একটি সত্য সামনে এনে দিয়েছে—ভিএআর প্রযুক্তি থাকলেই বিতর্ক শেষ হয় না; বরং এর প্রয়োগে ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতা না থাকলে প্রযুক্তিও অবিশ্বাসের কারণ হয়ে ওঠে।
বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ মঞ্চে একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু একটি ম্যাচের ভাগ্য নয়, একটি দেশের স্বপ্নও ভেঙে দিতে পারে। তাই ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা এখন একটাই—ম্যাচের নায়ক হোক খেলোয়াড়েরা, বিতর্কিত রেফারিং নয়।
মতামত দিন