কাকের ডাক কমছে, সতর্ক বার্তা দিচ্ছে প্রকৃতি
কয়েক বছর আগেও শহর ও গ্রামে ভোর শুরু হতো কাকের ডাক দিয়ে। গ্রামের বাঁশবাগান, শহরের ছাদ, রাস্তার ধারের গাছ ও হাট-বাজারের আশপাশে ছিল কাকের দাপট। কিন্তু দিন দিন সেই পরিচিত দৃশ্য বদলে যাচ্ছে। এখন আগের মতো কাকের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না, অনেক এলাকায় কাকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, কাকের সংখ্যা কমে যাওয়া শুধু একটি পাখির সংকট নয়, এটি প্রকৃতির ভারসাম্যে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যা চারপাশের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কাক প্রকৃতির স্বাস্থ্যকর্মী। মৃত প্রাণী, উচ্ছিষ্ট খাবার ও আবর্জনা খেয়ে তারা পরিবেশ পরিষ্কার রাখে। কাক কমে গেলে শহরের বর্জ্য দ্রুত পচে রোগজীবাণু ছড়াবে। যা পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বগুড়া শহরের জামিলনগর এলাকার বাসিন্দা মোখলেছুর রহমান বলেন, এক সময় ভোর ও দুপুরে কাকের ডাক খুব শোনা যেত। বছর পাঁচেক হয়েই গেল, কাকের সেই ডাক শোনা যায় না। এমনকি কাকের ঝাঁক আর চোখে পড়ে না। তবে মাঝে মধ্যে দুই-একটা কাকের দেখা পাওয়া যায়।
কাকের কথা উঠাতেই অবাক হয়ে যান বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকার বাসিন্দা সাগর হোসেন।
তিনি বলেন, কাকের ডাক তো প্রায় ভুলেই গিয়েছি। দীর্ঘ বছর কাক দেখিনি।
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বগিলাগাড়ি গ্রামের বাসিন্দা তৌকির আহম্মেদ বলেন, গ্রামাঞ্চলের দিকে কাকের সংখ্যা কমে গেছে। আগের মত আর কাক চোখে পড়ে না। এক সময় তো বাড়ির উঠানে এসে খাবার খুঁজতো কাকের দল।
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রভাষক আবু সাঈদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, বড় বড় শহরে গাছের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলেও নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। ফলে কাকের বাসা বানানোর স্থান কমে যাচ্ছে। এছাড়াও শহরের আবর্জনায় প্লাস্টিক, শিল্পবর্জ্য, রাসায়নিক পদার্থ ও ফরমালিনযুক্ত খাদ্য মিশে থাকে। এসব খেয়ে কাক অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে। ফলে তাদের সংখ্যা ক্রমেই কমছে।
তিনি আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড় কাকের ডিম ও ছানার মৃত্যুহার বাড়াচ্ছে। উচ্চ তাপমাত্রায় পাখির প্রজনন ব্যাহত হয়। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামো যেমন মোবাইল টাওয়ার, উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইন ও ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণ পাখির নেভিগেশন (পথ খুঁজে চলা) ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কাকের সংখ্যা কমে যাওয়া মানে নগর বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ার পূর্বাভাস। এটি প্রকৃতির জন্য বড় সতর্ক সংকেত। যা অবহেলা করলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবেশগত সংকট দেখা দিতে পারে বলে জানান আবু সাঈদ।
বগুড়া কাহালু উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এসএম আল আমিন ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, কাক জমির ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষিতে প্রাকৃতিক কীটনাশকের ভূমিকা পালন করে। ফলে কাকের সংখ্যা কমে গেলে কৃষি পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রভাষক আবু সাঈদ বলেন, কাকসহ সকল পাখি রক্ষা করতে চাইলে বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। সেইসাথে পুরনো গাছ সংরক্ষণ করতে হবে। উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পাখিবান্ধব নগর পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি পাখি ও বন্যপ্রাণী গবেষণা জোরদার করে সমস্যার কারণ নির্ধারণ ও সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে