কৈলাস থেকে নেমে এলো মৃত্যুর স্রোত, উষ্ণ পৃথিবীতে বরফের অভিশাপ
কৈলাস—পুরাণের দেবভূমি। যেখানে তুষারের শুভ্রতার মধ্যে মহাদেবের আবাস, যেখানে পাহাড়ের নীরবতাকে মানুষ যুগ যুগ ধরে পবিত্রতার ভাষা বলে জেনে এসেছে। সেই কৈলাসের কাছেই এবার নেমে এলো অন্য এক স্রোত—পানি নয় শুধু, বরফ, পাথর, কাদা আর মৃত্যুর স্রোত। মুহূর্তে বদলে গেল হিমালয়ের চিরচেনা দৃশ্যপট। সবুজ পাহাড় চাপা পড়ল ধূসর ধ্বংসস্তূপে, নদী পরিণত হলো উন্মত্ত স্রোতে, আর তীর্থযাত্রার পথে থাকা মানুষ দেখলো যমদূতকে।
হিন্দু পুরাণে শরতের মর্ত্যে দেবী দুর্গার আগমন আনন্দের। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের উত্তপ্ত পৃথিবীতে হিমালয়ের এই বিপর্যয় যেন দেবীর অন্য এক রূপ কালীর কথা মনে করিয়ে দেয়— ক্রুদ্ধ, ভয়ংকর। মানুষ যে পৃথিবীকে ক্রমেই উষ্ণ করে তুলছে, সেই উষ্ণতার অভিঘাত এবার যেন বরফের বুক ফুঁড়ে নেমে এসেছে উপত্যকায়।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পেছনে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, একটি বড় হিমবাহ ধসই ছিল বিপর্যয়ের মূল সূত্রপাত। তবে এই ঘটনার গল্প শুধু একটি হিমবাহ ভেঙে পড়ার গল্প নয়। এর গভীরে রয়েছে পৃথিবীর ভূত্বকের কোটি বছরের নড়াচড়া, হিমালয়ের জন্ম, পাহাড়ের ভঙ্গুর ভূতত্ত্ব এবং বদলে যাওয়া জলবায়ুর এক ভয়ংকর সমীকরণ।
যে সংঘর্ষে জন্ম হিমালয়ের
হিমালয়কে বাইরে থেকে যতটা স্থির মনে হয়, ভূতাত্ত্বিকভাবে এটি ততটাই অস্থির। নেপাল রয়েছে ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে। ভারতীয় প্লেট উত্তর দিকে এগিয়ে গিয়ে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। এই সংঘর্ষের গতি বছরে প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিমিটার।
মানুষের চোখে এই গতি প্রায় অদৃশ্য। কিন্তু কোটি কোটি বছর ধরে চলতে থাকা এই ধাক্কাই পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিয়েছে। ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষের ফলেই গড়ে উঠেছে হিমালয়। সেই প্রক্রিয়া এখনো থামেনি। পাহাড়ের উচ্চতাও বছরে কয়েক মিলিমিটার করে বাড়ছে।
অর্থাৎ, যে পাহাড়কে আমরা চিরস্থায়ী বলে ভাবি, সেটি আসলে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে, বদলাচ্ছে এবং ভাঙছে।
প্লেট দুটির অবিরাম সংঘর্ষ ভূত্বকের ভেতরে বিপুল চাপ তৈরি করে। ফলে হিমালয়ের অনেক ঢাল ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় ও তুলনামূলকভাবে দুর্বল। কোথাও সামান্য কম্পন, কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও বরফ গলার চাপ—যেকোনো একটি ঘটনা সেই ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে। আর তখনই পাহাড় নামতে শুরু করে।
বরফের পতন, নদীর উন্মত্ততা
এবারের বিপর্যয়েও ঠিক এমন একটি ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে নিচের দিকে আছড়ে পড়ে। প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় পতনের সময় তার সঙ্গে মিশে যায় পাথর, মাটি ও বিপুল পরিমাণ পলি। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় অধ্যায়।
বরফ-পাথরের সেই বিশাল ধস নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। নদীর ওপর তৈরি হয় সাময়িক প্রাকৃতিক বাঁধ। উজানে পানি জমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সেই বাধা ভেঙে গেলে জমে থাকা পানি আর ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে ছুটে যায় ভাটির দিকে। তৈরি হয় ভয়ংকর হিমবাহ-মিশ্রিত বন্যা।
আইস রক অ্যাভালাঞ্চ—বরফ ও পাথরের এই সম্মিলিত ধস সাধারণ বন্যার মতো নয়। এটি শুধু পানি বহন করে না; সঙ্গে নিয়ে আসে পাহাড়ের শরীর থেকে ছিঁড়ে আসা পাথর, কাদা, গাছ ও ধ্বংসস্তূপ। ফলে এর স্রোত হয়ে ওঠে অত্যন্ত ঘন ও বিধ্বংসী।
আইসিআইএমওডির প্রাথমিক মূল্যায়নে, লেন্দে খোলা নদীতে এমনই একটি বরফ-পাথরের ধস নদীর পথ আটকে দিয়েছিল। পরে সেই বাধা ভেঙে নিচের দিকে নেমে আসে প্রবল স্রোত। গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটে নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যাওয়াই তার ভয়াবহতার একটি প্রমাণ।
ভূমিকম্প নয়, কম্পন এসেছিল ধস থেকেই
দুর্যোগের কয়েক মিনিট আগে কম্পন অনুভূত হওয়ায় শুরুতে ভূমিকম্পকেই সম্ভাব্য কারণ মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী বিশ্লেষণে সেই ধারণা পাল্টে যায়। ইউএসজিএস জানায়, প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্প বলে মনে হওয়া সিসমিক সংকেত আসলে হিমবাহ ধস ও পাথর-কাদার প্রবাহের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। অর্থাৎ, এবার পাহাড় কাঁপেনি বলেই বরফ নামেনি; বরং বরফ-পাথরের পতনই পাহাড়ের বুক কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, এমন বিপর্যয়ের জন্য বড় ভূমিকম্পের প্রয়োজন নাও হতে পারে। একটি অস্থিতিশীল হিমবাহ, দুর্বল পাহাড়ি ঢাল এবং জমে থাকা পানি—এই তিনের সমন্বয়ই কখনো কখনো যথেষ্ট।
উষ্ণ পৃথিবীর ছায়া
এখন প্রশ্ন, হিমবাহ এত অস্থির হচ্ছে কেন? জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই নির্দিষ্ট ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক এখনো বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেননি। কিন্তু বৃহত্তর চিত্রটি উদ্বেগজনক। নেপালের বরফাবৃত পর্বতগুলো গত তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলেও হিমবাহ গলার গতি দ্রুত বেড়েছে।
উষ্ণতা বাড়লে হিমবাহ দ্রুত গলে। বরফ সরে গেলে পাহাড়ের ঢালও বদলে যায়। পারমাফ্রস্ট—দীর্ঘদিন জমাট থাকা মাটি ও শিলার বরফ—গলে গেলে পাহাড়ের ভেতরের বন্ধন দুর্বল হতে পারে। নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি হয়, পুরোনো হ্রদ ফুলে ওঠে। কোথাও প্রাকৃতিক বাঁধ দুর্বল হয়। তখন একটি ছোট ঘটনা বড় বিপর্যয়ের দরজা খুলে দিতে পারে।
নেপালে দুই হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২১টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত। এসব হ্রদের কোনো একটি প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তেই নেমে আসতে পারে ভয়ংকর জলধারা।
আগাম সতর্কতারও সীমা আছে
এবারের ঘটনাকে আরও ভয়াবহ করেছে এর আকস্মিকতা। দুর্যোগের আগে বড় ধরনের বৃষ্টিপাত না থাকায় প্রচলিত বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থার কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
জলবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাদা, বরফ ও পাথরের প্রবাহ যখন চোখে পড়ে, তখন অনেক সময় পালানোর সুযোগই থাকে না। তাই ভবিষ্যতে শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস নয়, নদীর পানির উচ্চতা, হিমবাহের গতিবিধি এবং পাহাড়ি ঢালের পরিবর্তন—সবকিছুকে একসঙ্গে নজরদারির আওতায় আনতে হবে। কারণ হিমালয়ের বিপদ সব সময় মেঘ থেকে আসে না। কখনো বিপদ আসে বরফের ভেতর থেকে।
কৈলাসের পথে এবার যারা গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই গিয়েছিলেন বিশ্বাসের টানে। কেউ মহাদেবের দর্শনে, কেউ মানস সরোবরের পবিত্র জলের সন্ধানে। কিন্তু পাহাড় তাদের সামনে খুলে দিয়েছে প্রকৃতির আরেকটি মুখ—যেখানে ধর্মের পবিত্রতা আর বিজ্ঞানের সতর্কবার্তা যেন একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়।
হিমালয়কে আমরা দেবতার পাহাড় বলি। কিন্তু সেই পাহাড়ও পৃথিবীর উষ্ণতার বাইরে নয়। বরফ গলছে। পাহাড় নড়ছে। ঢাল দুর্বল হচ্ছে। হিমবাহ পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতি যেন বলে দিচ্ছে—তার ধৈর্যেরও একটি সীমা আছে। প্রশ্ন হলো— প্রকৃতির ধৈর্যের বাঁধ পুরোটা ভেঙে যাওয়ার আগেই আমরা কি আমাদের উষ্ণ পৃথিবীটাকে ঠান্ডা করার কথা ভাবব? আর যদি না ভাবি, তাহলে আবারো কোনো এক ভোরে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, কৈলাসের বুক থেকে নেমে আসতে পারে আরো ভয়ঙ্কর মৃত্যুর স্রোত।
মতামত দিন