খান জাহানের কুমির কাণ্ড-৪
মাজারে কুমির দিয়ে ‘মানত বাণিজ্য’, ভাগ-বাটোয়ারার নেতৃত্বে খাদেমরা
বাগেরহাটে হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজারে দীর্ঘদিন ধরে কুমির দিয়ে ‘মানত বাণিজ্য’ চলে আসছে। মাজারের দিঘিতে থাকা কুমিরকে হাঁস-মুরগি খাওয়ালে মনের আশা বা উদ্দেশ্য পূরণ হবে বলে ভক্তরা বিশ্বাস করেন। সে জন্য কেউ নিয়ে আসেন হাঁস, কেউ মুরগি, কেউ ছাগল। এসব মানতের হাঁস-মুরগি ও ছাগল যায় খাদেমদের পেটে। তারা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন মানতের টাকা ও প্রাণীগুলো। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলছে মাজারে কুমির দিয়ে মানত ব্যবসা!
সরেজমিনে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষেরা হাঁস-মুরগি নিয়ে আসছেন কুমিরকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে। সেই প্রাণীগুলো দীঘির পাড় থেকে নেওয়া হচ্ছে মাজারের খাদেমদের হেফাজতে।
দায়িত্বে থাকা মোশাররফ ফকির জানান, তিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানতের প্রাণী সংগ্রহ করেন। এই কাজের প্রতিদান তাকে দেবেন স্বয়ং পীর।
তবে তিনি মানতের প্রাণী ও দানের নগদ অর্থের ব্যয়ের হিসাব নিয়ে কথা বলতে চাননি।
গত ১৩, ১৪ এবং ১৫ এপ্রিল মাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মানত করা প্রাণীর খুব সামান্য অংশই কুমিরের পেটে যায়। তাও যদি কুমিরটি দিঘির কাছে থাকে। সব প্রাণী ও মাজারে দেওয়া নগদ টাকা চলে যায় খাদেমদের পেটে। তবে কুমিরটিকে মাঝেমধ্যে দুই-একটা হাঁস-মুরগি খেতে দেওয়া হয়। তাও সেগুলো জীবন্ত থাকতেই ছুঁড়ে ফেলা হয় দিঘিতে। কুমির এসে খেয়ে যায়। এছাড়াও মাঝে মাঝে এসব প্রাণী দিয়ে খাদেমদের ভোজের আয়োজনও করা হয়। ওই সময় লোক দেখানোর জন্য অসহায় মানুষদেরও কিছু খাবার দেওয়া হয়।
মাজারে সংঘবদ্ধ খাদেম চক্র
মাজারটিতে ৭০ থেকে ৮০ জন খাদেম রয়েছেন। তাদের নেতৃত্বে আছেন প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম। তিনি জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি। মাজারের পাওয়া সকল প্রাণী ও নগদ অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করতে একটি নিয়মও মানা হয় সেখানে।
প্রতিদিন একজন খাদেম মাজার দেখভালের দায়িত্ব পান। ওই দিনের সব মানতের প্রাণী ও নগদ দান চলে যায় তার জিম্মায়। দিনশেষে তিনি সেগুলো নিজ হেফাজতে নিয়ে বিক্রি করেন। কিছুটা পরিবারসহ ভোগ করেন। মাজারসংলগ্ন দিঘিরপাড় গ্রামে খাদেমদের বসবাস। সেখানকার প্রায় সব পরিবারেরই আয়ের প্রধান উৎস মাজারের কুমির ব্যবসা।
মাজারে আসা মানুষদের বিভিন্ন প্রলোভনে বেশি টাকা দান করতে বলা হয়। তাদের বোঝানো হয়, যত বেশি দান, তত বেশি সওয়াব বা কল্যাণ। বাস্তবে সেই টাকা বা মানতের প্রাণী খাদেমদের ব্যক্তিগত আয়ে পরিণত হয়।
জানা গেছে, পদাধিকার বলে মাজারের সভাপতি জেলা প্রশাসক হলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর তদারকি নেই। শুধু বছরে দুইবার মাজারের ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হয়।
মাজারটিতে অগ্রহায়ণ মাসের ২৪ ও ২৫ তারিখে ওরস অনুষ্ঠিত হয়। ওরসের সময় দানবাক্সে জমার টাকা চারদিন পরে বের করা হয়। সেই টাকার ৩০ শতাংশ মাজারের ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয়। চৈত্র মাসের পূর্ণিমায় সেখানে মেলা করা হয়। মেলা দুইদিনের হলেও উৎসবের আমেজ থাকে সাতদিন। এই সাতদিনেও একবার দানবাক্স খোলা হয়। এসময় দানের নগদ টাকার ৪০ শতাংশ মাজারের ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয়। আর বাকি টাকা মাজারের খাদেমরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিজেরা নিয়ে নেন।
এই দুই সময় ছাড়া মাজারটির দানবাক্স প্রতিদিনই খোলা হয়। আর দানের টাকাসহ যাবতীয় কিছু নিয়ে নেন ওইদিনের দায়িত্বপ্রাপ্ত খাদেম। এছাড়াও কোনো খাদেম ইচ্ছা করলে তার ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত দিন’ বিক্রি করতে পারেন। তার দিন কিনে নেওয়া ব্যক্তি ওই দিনের মাজারে আয়ের সমস্ত কিছুর মালিক হয়ে যান।
জানা যায়, মানত করা কোনো প্রাণী যদি কেউ নিজে জবাই করে কুমির বা অসহায়দের খাওয়াতে চান সেক্ষেত্রে বাধা দেন খাদেমরা। কারণ, এতে তাদের ক্ষতি। মানতের প্রাণী পাওয়া হয় না। ফলে মানত করা ব্যক্তিদের বিভিন্নভাবে নিরাশ করা হয়। এমনকি তাদের বলা হয়, এভাবে নিজেই সবকিছু করলে মানত পূরণ হবে না। কুমির এসে স্বপ্নে ভয় দেখাবে।
মাজারসংলগ্ন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ‘মাজারটির খাদেমরা ভণ্ড। যা স্থানীয় সবাই জানেন। এরপরও সাধারণ মানুষেরা এখানে এসে মানতের নামে বা যেকোনো উদ্দেশ্যে প্রাণী ও নগদ অর্থ দান করেন। এতে খাদেমরা বসে বসে আয় করছেন। তাদের ভণ্ডামি গোপন রাখতে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন।’
দিঘিতে নেই ‘পীরের কুমির’
হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার শরিফের দিঘিতে ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত ধলাপাহাড় ও কালাপাহাড় নামের সেই দুই কুমির আর নেই। তাদের বংশধরও নেই দিঘিতে। ২০০৫ সালে ভারত থেকে আনা কুমির দিয়ে ‘মানত ব্যবসা’ চালানো হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০০৫ সালে ভারতের মাদ্রাজ থেকে ছয়টি কুমির এনে দিঘিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেগুলোর মধ্যে একটি কুমির জীবিত আছে। হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর পালিত কুমিরের নামের সঙ্গে মিল রেখে বেঁচে থাকা কুমিরটির নাম রাখা হয়েছে ধলাপাহাড়। এই নামে সেখানে বছরের পর বছর ধরে কুমির দিয়ে চলছে ব্যবসা।
ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে মাজারটির খাদেমদের সংঘবদ্ধ চক্র সাধারণ মানুষদের প্রতারিত করে আসছেন-এমন চিত্র উঠে এসেছে ভিউজ বাংলাদেশের অনুসন্ধানে।
মানুষ বিশ্বাস করে দান করছেন, আর সেই দানই হয়ে উঠছে খাদেমদের আয়ের উৎস।
বিশ্বাসের আড়ালে খাদেমদের এমন প্রতারণা গোপন রাখতে মাজারটিতে এক ধরনের অদৃশ্য ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখা হয়।
মাজারসংলগ্ন দিঘিরপাড় গ্রামের লোকজন মাজারের চারপাশ ঘিরে বিভিন্ন ছোটোখাটো ব্যবসাও করছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ভণ্ডামি আড়াল করতে আধ্যাত্মিকতার বেশ ধারণ করে থাকেন। বছরের পর বছর ধরে তারা এভাবেই মানুষ ঠকিয়ে ব্যবসা করে আসছেন। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ‘কুকুর কাণ্ড’ যেন তাদের ব্যবসায় কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে, সে জন্য সেই ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার নানা চেষ্টাও করে যাচ্ছেন তারা।
প্রকাশ্যে কুমিরের সঙ্গে সখ্য, আড়ালে ব্যবসা
মাজারের কিছু খাদেম ও তাদের সহযোগী মাজারকে কেন্দ্র করে ব্যবসার স্বার্থে দিঘির কুমিরকে পোষ মানিয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদী হাসান। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক আইডিতে কুমিরের সঙ্গে সখ্য নিয়ে অনেক ভিডিও দেখা যায়। এসব ভিডিওর মাধ্যমে সাধারণ মানুষদের মানত করতে
উৎসাহিত করে যাচ্ছেন মেহেদী। এছাড়াও দর্শনার্থীদের সামনে কুমিরের সঙ্গে নিজের সখ্য দেখিয়ে তিনি ফায়দা লুটেন। মাঝেমধ্যে মানতের ছাগল জবাই করে সামান্য পরিমাণে মাংস কুমিরকে খাইয়ে তা ভিডিও করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন মেহেদী। আর বাকি মাংস চলে যায় খাদেমদের পেটে।
মাজারের দিঘির পাড়ে মেহেদী হাসানের সঙ্গে দেখা হলেও সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন তিনি।
কথা বলা শুরু করতেই মেহেদী বলেন, কুমির সম্পর্কে তার চাইতে বেশি খাদেমরা জানেন। বর্তমানে দিঘিতে একটি কুমিরই আছে। এটা ভারতীয় কুমির।
এ কথা বলার পরপরই দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন মেহেদী হাসান।
মেহেদী হাসান সম্পর্কে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মেহেদী ফেসবুকের ভিডিওর মাধ্যমে লোকজনদের মাজারে আসতে আকৃষ্ট করেন। তিনি সরাসরি খাদেম না হলেও তাদের সহযোগী।
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে মাজারটির প্রধান খাদেম ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ফকির তারিকুল ইসলাম ব্যস্ততার কথা জানিয়ে উত্তেজিত হয়ে মুঠোফোনের সংযোগ কেটে দেন।
তবে এর আগে তিনি বলেন, খাদেমদের সংখ্যা জেনে আপনি কী করবেন? বাগেরহাটে থাকাকালীন কেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন না?
সরেজমিনে আরও জানা গেছে, মাজারটির খাদেম চক্র নিয়ন্ত্রণ করেন সাবেক যুবদল নেতা ফকির তারিকুল ইসলাম। মাজারে দান করা প্রাণী ও অর্থ তার নির্দেশে লুটপাট করা হয়। এর একটি বড় অংশ চলে যায় প্রধান খাদেম তারিকুল ইসলামের পকেটে। কুমিরকে সামনে রেখে তাদের এ বাণিজ্য দীর্ঘ বছর ধরে হয়ে আসলেও তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার মতো কেউ নেই। মাজারের খাদেম চক্রটি খুবই প্রভাবশালী।
জানতে চাইলে হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার শরিফের (পদাধিকার বলে) সভাপতি বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, আমি সভাপতি হলেও মাজার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করা বা হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকি। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ সেখানে অন্ধবিশ্বাস থেকে দান করে আসছেন। যা তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস।
তিনি আরও জানান, মাজারের দানবাক্স থেকে বছরে দুইবার ৩০ শতাংশ ও ৪০ শতাংশ অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হয়, সেটা সঠিক। তবে প্রতিদিনের দানের অর্থ খাদেমরা যে গ্রহণ করছেন, এই বিষয়টি নিয়ে তিনি কথা বলবেন। যদিও মাজারটি খাদেমদের অভ্যন্তরীণ নিয়মে চলে।
মাজারের অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক বলেন, মাজারের খাদেমরা সংঘবদ্ধভাবে পরিচালিত হন। মাজারসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের মধ্যে শক্ত ঐক্য রয়েছে। সেইসাথে তাদের অন্ধভক্তও রয়েছে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে