Views Bangladesh Logo

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, এ দেখাই কি হবে শেষ দেখা?

রাত নামবে ডালাসে। আলো জ্বলবে স্টেডিয়ামের প্রতিটি কোণে। গ্যালারির হাজারো কণ্ঠে উঠবে ফুটবলের এক কিংবদন্তির নাম—ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাসের ভেতরেও লুকিয়ে থাকবে এক অদৃশ্য প্রশ্ন, এক অস্বস্তিকর আশঙ্কা—এ দেখাই কি তবে শেষ দেখা?

আজ (৬ জুলাই) রাত ১টায় ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মহারণে ইউরোপের পরাশক্তি স্পেনের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল। এটি কেবল নকআউটের একটি ম্যাচ নয়; এটি হয়তো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত এক অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠা লেখার রাত। কারণ, ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন—এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ।

ফুটবলের ইতিহাসে অনেক সূর্য উঠেছে, আবার অস্তও গেছে। কিন্তু কিছু নক্ষত্র থাকে, যাদের বিদায় মানে শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়; একটি যুগের অবসান। রোনালদো সেই বিরল নক্ষত্রদের একজন। ছয়টি বিশ্বকাপে খেলে তিনি গড়েছেন এমন এক রেকর্ড, যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক। সময়ের সঙ্গে লড়াই করে, শরীরের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে নিজের নামকে তিনি রূপ দিয়েছেন এক অনন্ত কিংবদন্তিতে। কিন্তু কিংবদন্তিরাও একদিন শেষ বাঁশির মুখোমুখি হন।

এবারের বিশ্বকাপের গল্প অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। পর্তুগাল নকআউটে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের ফুটবলে দেখা যায়নি সেই পরিচিত আত্মবিশ্বাস। গ্রুপ পর্বে তারা নিজেদের সেরা ছন্দ খুঁজে পায়নি। মাঝমাঠে ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও ভিতিনহাদের সৃজনশীলতা ছিল অনিয়মিত, রক্ষণভাগ ছিল অস্থির, আর আক্রমণে রোনালদোকে বহু সময় লড়তে হয়েছে একা। গোলরক্ষক দিয়াগো কোস্তার অসাধারণ পারফরম্যান্স না থাকলে পর্তুগালের যাত্রা থেমে যেতে পারত আরও আগেই।

অন্যদিকে স্পেন যেন লিখছে উল্টো এক গল্প। প্রথম ম্যাচের হোঁচটের পর তারা হয়ে উঠেছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভয়ংকর দলগুলোর একটি। টানা জয়, নিখুঁত বল দখল, দুরন্ত আক্রমণ—সবচেয়ে বড় কথা, এখন পর্যন্ত একটি গোলও হজম করেনি লা রোজা। লামিন ইয়ামালের গতি, নিকো উইলিয়ামসের বিস্ফোরণ, পেদ্রির শিল্পীসুলভ মাঝমাঠ আর মিকেল ওইয়ারসাবালের ধারালো ফিনিশিং—সব মিলিয়ে স্পেন এখন যেন পূর্ণতার আরেক নাম।

এই বাস্তবতায় শুধু কাগজে-কলমে নয়, মাঠের হিসাবও কথা বলছে স্পেনের পক্ষেই। পর্তুগালের যে রক্ষণভাগ পুরো টুর্নামেন্টে বারবার ছন্দ হারিয়েছে, সেই দুর্বল দেয়াল ভেঙে ঝড় তুলতে পারে স্পেনের আক্রমণ। দুই প্রান্ত দিয়ে দ্রুত আক্রমণ, মাঝমাঠে পাসের জাল আর বক্সের ভেতরে নির্ভুল সমাপ্তি—সব মিলিয়ে ম্যাচটি একপেশে হয়ে গেলেও বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।

আর সেটাই যদি ঘটে? তাহলে আজ রাতেই বিশ্বকাপ মঞ্চে শেষবারের মতো হাঁটবেন আধুনিক ফুটবলের কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। হয়তো শেষবারের মতো জাতীয় দলের জার্সিতে শুনবেন বিশ্বকাপের সুর। শেষবারের মতো ক্যামেরা খুঁজে নেবে তার চোখ, তার মুখ, তার দীর্ঘশ্বাস।

কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই যাত্রায়! ২০০৬ সালে তরুণ এক স্বপ্নবাজ হিসেবে শুরু করেছিলেন বিশ্বকাপ অভিযান। এরপর একে একে ছয়টি বিশ্বকাপ। গোল, অশ্রু, হতাশা, রেকর্ড, করতালি—সবকিছুর সাক্ষী এই দীর্ঘ পথচলা। প্রতিটি বিশ্বকাপেই তিনি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কখনো নায়ক, কখনো ট্র্যাজিক চরিত্র, কিন্তু কখনোই উপেক্ষিত নন। আজও তিনি সেই একই মানুষ—অদম্য, লড়াকু, হার না মানা। কিন্তু ফুটবল বড় নির্মম। এখানে আবেগের চেয়ে ফলাফলই শেষ সত্য।

তবু রোনালদোকে যারা ভালোবাসেন, তারা জানেন—শেষ বাঁশি বাজার আগপর্যন্ত তিনি কখনো হার মানেন না। একটি ফ্রি-কিক, একটি হেড, একটি পেনাল্টি কিংবা একটি অসম্ভব মুহূর্ত—রোনালদো বহুবার প্রমাণ করেছেন, ইতিহাস কখনো কখনো একজন মানুষের পায়ের দিকেও তাকিয়ে থাকে।

তাই ডালাসের রাত শুধু স্পেনের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের গল্প নয়। এটি হয়তো এমন এক বিদায়ের প্রহর, যেখানে স্টেডিয়ামের আলো নিভে যাওয়ার পরও বহু বছর ফুটবলপ্রেমীদের মনে জ্বলতে থাকবে একটি নাম।

হয়তো আজই বিশ্বকাপের আকাশ থেকে অস্ত যাবে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আর সত্যি যদি সেটাই হয়, তবে ইতিহাস শুধু এটুকু লিখবে না যে পর্তুগাল হেরেছিল। ইতিহাস লিখবে—এই রাতেই বিশ্বকাপ শেষবারের মতো দেখেছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ