Views Bangladesh Logo

জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক রদবদল: প্রশাসনে কঠোর বার্তা

চুক্তির কয়েক দিনের মধ্যেই এহছানুল হক পরিকল্পনা কমিশনে

পদায়ন-পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষের মধ্যেই শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন

নতুন সচিবের সামনে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটানোর চ্যালেঞ্জ



জনপ্রশাসনের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তিভিত্তিক সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হককে সরিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য করা হয়েছে। তাঁর জায়গায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চুক্তিভিত্তিক সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে বদলি করে পদায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের তিন কর্মকর্তাকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সরকারের এই রদবদলকে নিছক নিয়মিত প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, নতুন সরকারের সময়ে প্রশাসনে যে গতি, শৃঙ্খলা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি পূরণ হয়নি—এমন অভিযোগ ও অসন্তোষের মধ্যেই জনপ্রশাসনের শীর্ষ পদে এই পরিবর্তন আনা হলো। বিশেষত জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে নানা আলোচনা হয়েছে। কারও কারও অভিযোগ, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পেশাগত বিবেচনার পাশাপাশি বিশেষ পক্ষের প্রভাব কাজ করছে। যদিও এসব অভিযোগ সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এখন নতুন সচিব কামরুজ্জামানের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তিনি কি প্রশাসনের ভেতরের এই আস্থার সংকট কাটাতে পারবেন?

এহছানুল হকের বিদায়, বার্তা গেল প্রশাসনে

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয় থেকে এহছানুল হককে সরিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে সদস্য করার সিদ্ধান্তকে প্রশাসনের ভেতরে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একটি বড় প্রত্যাশা ছিল—দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অসন্তোষের অবসান হবে, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা হবে এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কর্মকর্তাদের একটি অংশের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। বিশেষত পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মাঠ প্রশাসনে ডিসি নিয়োগ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।

প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জনপ্রশাসনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় ছিল না, বিভিন্ন প্রস্তাব নিষ্পত্তিতে সময় লাগছিল এবং কর্মকর্তাদের একটি অংশ নিজেদের মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ পদায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন। তাঁকে জনপ্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন জনপ্রশাসন সচিবের সামনে কঠিন পরীক্ষা
নতুন সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী প্রশাসনের জন্য নতুন মুখ নন। চলতি বছরের মার্চে তিনি চুক্তিভিত্তিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। পরে তাঁকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল। স্বাস্থ্য খাতের মতো জটিল ও বহুস্তরীয় প্রশাসনিক কাঠামো সামলানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার তিনি এমন একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন, যার সিদ্ধান্তের প্রভাব প্রায় পুরো সরকারি প্রশাসনে পড়ে। তাই তাঁর সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে শুধু ফাইল নিষ্পত্তির গতি বাড়ানো নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই পদায়ন ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার সমন্বিত মূল্যায়ন চান। বিশেষত বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন নিয়ে প্রত্যাশা রয়েছে। আবার বিপরীত দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ—এক পক্ষের বঞ্চনা দূর করতে গিয়ে অন্য পক্ষকে নতুন করে বঞ্চিত করা হলে আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে। অর্থাৎ নতুন সচিবের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে ভারসাম্য রক্ষা করা: বঞ্চনা নিরসন করতে হবে, কিন্তু প্রতিশোধমূলক প্রশাসন তৈরি করা যাবে না; যোগ্যতা বিবেচনা করতে হবে, কিন্তু তার সংজ্ঞা যেন ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দে নির্ধারিত না হয়; দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে নেওয়া যাবে না। এখানেই কামরুজ্জামানের পরীক্ষা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব বদল হলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নতুন সচিবকে প্রশাসনের ভেতরে আস্থার জায়গাটি পুনর্গঠন করতে হবে, বিশেষত জনপ্রশাসনে কর্মরতদের মধ্যে রদবদল এনে দক্ষদের বিভিন্ন উইংয়ে পদায়ন করতে হবে।

পদায়নে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ডিসি নিয়োগ
জনপ্রশাসনের আস্থার প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় মাঠ প্রশাসনে। কারণ সচিবালয়ের সিদ্ধান্ত সাধারণ নাগরিকের কাছে অনেক সময় দূরের বিষয় মনে হলেও জেলা প্রশাসক, উপজেলা প্রশাসন, ভূমি প্রশাসন কিংবা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার আচরণ ও দক্ষতা নাগরিক সরাসরি অনুভব করেন। তাই নতুন জনপ্রশাসন সচিবের জন্য জেলা প্রশাসক নিয়োগ ও মাঠ প্রশাসনের নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে। যোগ্যতা, মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা, সততা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ও সংকট মোকাবিলার দক্ষতা—এসবকে নিয়োগের মূল মানদণ্ড করা গেলে সরকারের প্রশাসনিক সংস্কারের বার্তা বিশ্বাসযোগ্য হবে। অন্যদিকে দলীয়, ব্যক্তিগত বা বিশেষ গোষ্ঠীর প্রভাবের অভিযোগ আবার সামনে এলে নতুন নেতৃত্ব নিয়েও দ্রুত প্রশ্ন উঠবে।

এখানে সরকারের একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—একজন সচিব একা প্রশাসনকে বদলাতে পারেন না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, নিয়োগ ও পদোন্নতি-সংশ্লিষ্ট কমিটি এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো—সব মিলিয়েই সিদ্ধান্ত তৈরি হয়। ফলে ব্যর্থতার দায় যেমন শুধু সচিবের নয়, সাফল্যের কৃতিত্বও এককভাবে তাঁর হতে পারে না।

তিন নতুন সচিব, গুরুত্বপূর্ণ তিন জায়গায় পরিবর্তন
জনপ্রশাসনের শীর্ষ পরিবর্তনের পাশাপাশি তিন কর্মকর্তাকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়েছে।


জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ এন এম বজলুর রশীদকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে পাঠানো হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেঞ্জামিন রিয়াজীকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। আর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ইয়াসমিন বেগমকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলাকে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

একই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে সচিব পদে উন্নীত করে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে প্রশাসনের একটি অংশ ইতিবাচকভাবে দেখছে। তাঁদের মতে, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বিবেচনায় কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার এই ধারা অব্যাহত থাকলে প্রশাসনে পেশাদারিত্ব বাড়বে।

এহছানুল হকের বদলিতে প্রশাসনে বিশেষ বার্তা
বিসিএস প্রশাসন ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা মো. এহছানুল হক ২০২৫ সালের অক্টোবরে, অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এর আগে তিনি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে চুক্তিভিত্তিক সিনিয়র সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। বুধবার তাঁকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে পাঠানোর মধ্য দিয়ে জনপ্রশাসনের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রশাসনিক পদ থেকে তাঁর দায়িত্বের পরিবর্তন হলো। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশিত সরকারি আদেশে নেই।

উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেই বর্তমান সরকার তাঁকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছিল, আর তার কিছুদিন পরই তাঁকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা) হিসেবে রাখা হলো। ফলে অনেকে এই বদলিকে অবনমন হিসেবেই দেখছেন। বিশেষত জনপ্রশাসন সচিবের মতো প্রভাবশালী পদে পরিবর্তন হলে কর্মকর্তারা স্বাভাবিকভাবেই এর পেছনের প্রশাসনিক বার্তা খোঁজেন। তবে প্রশাসনের ভেতরে একটি বদলি কখনোই শুধু বদলি নয়।

তাঁর সময়ে সমালোচনা রয়েছে
এহছানুল হকের দায়িত্বকালে পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। বিশেষত মাঠ প্রশাসনে জেলা প্রশাসক নিয়োগ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মকর্তা পদায়ন এবং কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষের কথা বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমেও এসেছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই এহছানুল হকের বিরুদ্ধে সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জনপ্রশাসনের শীর্ষ পদে এই পরিবর্তন প্রশাসনের কাছে একটি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা বহন করছে।

পরিবর্তনের পরও প্রশ্ন থাকছে
জনপ্রশাসনে এই রদবদলের মাধ্যমে সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হলো। কারণ প্রশাসনের কর্মকর্তারা শুধু নতুন মুখ দেখতে চান না; তাঁরা চান সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে তা প্রশাসনে ইতিবাচক বার্তা দেবে। বিপরীতে পদায়ন ও পদোন্নতিতে আবারও পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলে নতুন নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, মাঠ প্রশাসনের কার্যকর সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের দক্ষতা—সবকিছুর সঙ্গেই জনপ্রশাসন সরাসরি যুক্ত। তাই কামরুজ্জামানের নিয়োগকে শুধু একজন সচিবের বদলি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। প্রশ্ন হলো, এটি প্রশাসনের ভেতরে সরকারের আস্থা পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা কি না।

আগামী কয়েক সপ্তাহে পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতির সিদ্ধান্তেই হয়তো এর উত্তর মিলবে। জনপ্রশাসনে এবার পরিবর্তনের পালা নয়, পরিবর্তনের ফল দেখার পালা।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ