অফিস সময় কমানোর জটিল অঙ্ক ও অবুঝ মনের ত্রিভুজ ভাবনা
দেশের নীতিনির্ধারকদের অন্দরমহল থেকে যখন কোনো ‘যুগান্তকারী’ সিদ্ধান্তের খবর আসে, তখন আমরা সাধারণ মানুষ খুশিতে গদগদ হব নাকি কপালে হাত দিয়ে বসে থাকব, তা বুঝতে বুঝতেই অর্ধেক দিন পার হয়ে যায়। অতি সম্প্রতি কানে এল, জ্বালানি সাশ্রয় করার মহৎ উদ্দেশ্যে অফিস সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত করে দেওয়া হচ্ছে। আবার সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে মলত্যাগ করতে হবে, মানে শপিংমল বা ব্যবসা-বাণিজ্যও বন্ধ করে দিতে হবে। খবরটা শুনে আমার ওই ‘বোকামন’টা কেন জানি খচখচ করছে। সমস্যাটা নাকি জ্বালানি তেল নিয়ে। কিন্তু অফিস সময় কম হলে বা শপিংমল বন্ধ করে দিলে ইমপ্যাক্টটা কোথায় কীভাবে পড়বে—এই গাণিতিক রহস্যটাই মেলাতে পারছি না। আমি অবশ্য অঙ্কে বরাবরই কাঁচা, বয়স বাড়লেও মাথাটা আর পাকল না!
আমাদের বাঙালি জাতি এমনিতেই ফাঁকিবাজিতে বিশ্বসেরা হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তাদের সামনে যদি একবার ‘ভাঙা বেড়া’ দেখানো হয়, তবে তারা পুরো ঘরই উজাড় করে দিতে পারে। অফিস যদি ৮ ঘণ্টার জায়গায় ৭ ঘণ্টা করা হয়, তবে সেই সাশ্রয় হওয়া এক ঘণ্টায় মানুষ কি ডানা মেলে বাসায় পৌঁছাবে? অবশ্যই না! বরং ৪টা বাজার অন্তত ১৫ মিনিট আগে থেকেই সবাই ব্যাগ গুছিয়ে দরজায় স্টার্ট দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। এরপর যখন হাজার হাজার মানুষ আর গাড়ি একযোগে রাস্তায় নামবে, তখন যানজটের যে প্রলয়ংকরী রূপ হবে, তা কল্পনা করলেই গায়ে জ্বর আসে। শপিং করতে আসা মানুষরাও কাছাকাছি সময়ে রাস্তায় নেমে আসবে—তখনকার ‘রোড শো’ মঞ্চস্থ হতে কি আর বাকি থাকবে?
জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থাটাও মাথায় ঢোকে না। পাম্পে পাম্পে ঘোরো, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকো, এট্টুসখানি তেল আনো, ঠুস করে শেষ—আবার যাও! পাম্পে আসতে-যেতেই তো তেলের অর্ধেক শেষ। অথচ একবার ট্যাংক ভরে দিলে তো বারবার যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। যাই হোক, কম বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের এসব বুঝতে নেই। দুর্জনরা অবশ্য ভিন্ন কথা বলে, অনেকে নাকি তেল এনে ঘরে স্টক করে। বাঙালি তো, হলেও হতে পারে!
যুক্তি বলছে, যদি তেলই বাঁচাতে হয়, তবে অফিস দিন কমিয়ে দেওয়া হোক। ৫ দিন অফিস খোলা রাখা মানে ৫ দিনই রাস্তায় গাড়ি নামানো। তার চেয়ে যদি ৮ ঘণ্টার স্থলে ৯ ঘণ্টা অফিস করা হতো এবং সপ্তাহে ৩ দিন ছুটি থাকত, তবে অন্তত একদিনের পুরো যাতায়াতের তেলটা বেঁচে যেত। আমরা ৯টা থেকে ৬টা পর্যন্ত অফিস করতাম, সপ্তাহে ৪ দিন কাজ করতাম আর বাকি ৩ দিন আয়েশ করে বাড়িতে বসে ‘তেল’ বাঁচাতাম। এতে পাম্পের লাইন কমত, রাস্তার জ্যাম কমত আর কর্মঘণ্টাও ঠিক থাকত। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারকরা সম্ভবত ভাবছেন, এক ঘণ্টা আগে ছুটি দিলে মানুষ ডানা মেলে আকাশে উড়ে বাসায় পৌঁছে যাবে, রাস্তায় কোনো চাকা ঘুরবে না!
এবার আসা যাক বাচ্চাদের লেখাপড়ার বিষয়ে। স্কুল সময় কমানোর সিদ্ধান্তটি তো মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। গত কয়েক বছরে পড়াশোনার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা এক ঘণ্টা স্কুল কমিয়ে কি তেরোটা বাজানোর পরিকল্পনা? অথচ সমন্বয় করতে চাইলে স্কুলের কর্মদিবস কমিয়ে ক্লাস সময় বাড়ানো যেতে পারতো। সপ্তাহে ৩ দিন ছুটি থাকলে বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের পেছনে বেশি সময় দিতে পারতেন, যা স্কুলের ঘাটতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে দিত। কিন্তু এখন যা হবে—স্কুলেও পড়া হবে না, আবার জ্যামের কারণে বাসায় ফিরেও বাবা-মায়েরা ক্লান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে থাকবেন। লাভের গুড়টা শেষমেশ পিঁপড়াতেই খাবে।
বাণিজ্যিক ক্ষতির দিকটা চিন্তা করলে তো আরও পিলে চমকে ওঠে। অফিস সময় কমিয়ে আর সন্ধ্যা হতে না হতেই মার্কেট বন্ধ করে দেওয়ার যে সংস্কৃতি শুরু হচ্ছে, তাতে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে কীভাবে? উৎপাদনের চাকা থামিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হবে না। কেনাকাটা, লেনদেন বা জরুরি বাণিজ্যিক কাজগুলো করার সময়টুকু কেড়ে নিলে যে আর্থিক ঘাটতি তৈরি হবে, সেই গর্ত কি তেলের সামান্য সাশ্রয় দিয়ে ভরাট করা সম্ভব? মোটেও না। এটি আসলে এক ধরণের ‘বোকামি’, যা আমরা উন্নয়নের নাম দিয়ে গিলতে বাধ্য হচ্ছি।
সরকারের অন্দরে কারা বসে এসব ‘অদ্ভুত’ বুদ্ধি দেন, তা বোঝা আমাদের মতো আম জনতার পক্ষে সত্যিই দুষ্কর। তাদের কাছে হয়তো বড় বড় ক্যালকুলেটর আছে, যেখানে এক ঘণ্টা মানেই কয়েক কোটি লিটার তেলের সাশ্রয়। কিন্তু আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে জ্যামে পুড়তে থাকা তেলের হিসেবটা তারা কেন করেন না? কেন তারা বুঝছেন না যে কর্মঘণ্টা কমানো মানে উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেওয়া? দিনশেষে পরিবারের মানুষরা ঘরে বেশি সময় দিতে পারত যদি অফিস দিনের সংখ্যা কমানো হতো। এতে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হতো এবং সত্যিকার অর্থেই তেল সাশ্রয় হতো।
যারা ভাবছেন বিকেল ৪টায় অফিস ছুটি হলে রাজকীয় হালে বাসায় গিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে আড্ডা দেবেন, তারা দয়া করে সাথে একটি বড় পানির বোতল স্মার্টফোনে ফুল চার্জ দিয়ে, কিছু নাস্তা আর ল্যাপটপে অন্তত দুটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা সাথে নিয়ে বের হবেন। কারণ বিকেল ৪টার অফিস ছুটি আর সন্ধ্যা নামতেই মার্কেট বন্ধ হওয়া মানেই রাস্তায় শুরু হবে এক ‘মহা-উৎসব’, “অনেকটা কাহানী রোড রোড কি”! সেই উৎসবে আপনি এবং আপনার গাড়ি জ্যামের মিছিলে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে সরকারের সাশ্রয় করা তেলকে ধোঁয়ায় রূপান্তরিত করবেন। আর সেই ধোঁয়া যখন আপনার ফুসফুসে ঢুকবে, তখন আপনি পরম শান্তিতে চোখ বন্ধ করে ভাববেন—আহা! দেশ আজ কত চমৎকারভাবেই না জ্বালানি সাশ্রয় করছে! বোকামন হয়তো এটাই বুঝতে চায় না, যে সাশ্রয় আমাদের পকেট কাটে আর সময় নষ্ট করে, সেই সাশ্রয় আসলে কার জন্য? আদৌ কি সাশ্রয়? নাকি সুজাকে বুঝানোর শুভঙ্করের কাব্য?
একেএম জসীম উদ্দিন, উন্নয়ন কর্মী

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে