Views Bangladesh Logo

বাসের অনলাইন টিকেটিং ব্যবস্থা বানচালের ষড়যন্ত্র!

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী গত ১৫ মার্চ সহজ ডট কম থেকে হানিফ পরিবহনের একটি টিকেট কিনেছিলেন ১৯ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার ট্রিপে নওগাঁ ভ্রমণের জন্য। কিন্তু ১৯ মার্চ সকাল ৮টায় তিনি সহজ ডট কম থেকে রাত সাড়ে ৯টার হানিফ পরিবহনের ওই ট্রিপ বাতিলের নোটিশ পান।

আরাফাত ভিউজ বাংলাদেশকে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি কমপক্ষে ছয়বার কল করার চেষ্টা করে শেষবার প্রায় ১১ মিনিট অপেক্ষা করার পর ওই দিন সহজ ডট কমের কল সেন্টারে কাস্টমার কেয়ারের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম হই। তিনি ‘ঈদের পর ৫ থেকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে টাকা ফেরত পাবেন’ বলে জানান। পুরো টাকা ফেরত পাওয়া যাবে, না প্লাটফর্ম চার্জ কেটে রাখা হবে জানতে চাইলে ওই প্রতিনিধি জানান, অবশ্যই প্লাটফর্ম চার্জ কেটে রাখা হবে। এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। এই ছয়বারের প্রচেষ্টায় প্রতি মিনিট ৪টাকা ফ্ল্যাট রেটে ৪৪ টাকা মোবাইল অপারেটরের বিলও দিতে হয়েছে।’

আরাফাত আরও বলেন, ‘ঈদে বাড়ি যেতেই হবে। এ কারণে নিরূপায় হয়ে আবারও অনলাইন টিকেটিং প্লাটফরমেই টিকেট খুঁজতে থাকি। শেষ পর্যন্ত বিডিটিকেটস নামে একটি প্লাটফর্ম থেকে ওই দিনের (১৯ মার্চ) দুপুর ১টার শ্যামলী পরিবহনের (ঢাকা-নওগাঁ) টিকেট কাটতে সক্ষম হই। কিন্তু সকাল ১০টায় টিকেট কাটার এক ঘণ্টা পর ১১টায় এই অনলাইন টিকেটও বাতিলের এসএমএস আসে। এবার বিডিটিকেটস’র কল সেন্টারে কথা বলার চেষ্টা করে সেই সহজ ডট কমের বিড়ম্বনার একই অভিজ্ঞতাই পেতে হল। কিছুটা দিশাহারা হয়ে কল্যাণপুরে শ্যামলী কাউন্টারে চলে গেলাম। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য- কাউন্টার থেকে সেই একই সময়ে (দুপুর ১টা) শিডিউলের টিকেট পাওয়া গেল, তবে দাম অনেকটা বেশিই দিতে হলো, কিছুই করার নেই! কৌতূহলবশত হানিফ এন্টারপ্রাইজ কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল সেখানেও সেই বাতিল হওয়া রাত সাড়ে ৯টার ট্রিপের গাড়ির টিকেট আছে!’

আরাফাত সিদ্দিকীর এই অভিজ্ঞতা থেকে বেশ সহজেই বোঝা যায়, অনলাইন টিকেট বাতিল করে বেশ কিছু পরিবহনের কর্মচারীরা কাউন্টার থেকে ওই একই টিকেট অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে। গত ১৯ মার্চ ভিউজ বাংলাদেশ’এ এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট ছিল। আসলে অনলাইন টিকেটিং সিস্টেম চালু হওয়ার পর গাবতলি ও কল্যাণপুরের কাউন্টারগুলোতে ঈদের আগের টিকেটের জন্য সেই পুরনো লম্বা লাইন আর নেই, মানুষ বাসায় বসে স্বস্তির সঙ্গে টিকেট কাটতে পারছে। কিন্তু এই অনলাইন টিকেটিং ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হয় পরিবহনের এক শ্রেণির কর্মচারী- যারা বছরের পর বছর ঈদ কিংবা অন্য কোনো ঘটনা বা উপলক্ষকে কেন্দ্র করে যাত্রীর চাপ বাড়লেই গাবতলি-কল্যাণপুরের কাউন্টারে বসে জমিদারের মূর্তিতে আবির্ভূত হতেন এবং চোখ-মুখ শক্ত করে টিকেটরে জন্য অতিরিক্ত দাম চাইতেন। কোনো যাত্রী প্রতিবাদ করলে নিশ্চিত তাকে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। এই কর্মচারীরা বারবার অনলাইন টিকেটিং সিস্টেমকে ব্যর্থ করার চক্রান্ত করেছে। ঈদের ট্রিপের সময় আধঘণ্টা আগে ট্রিপ বাতিল করে একজন যাত্রীকে বিপদে ফেলা এবং তাকে আবারও কাউন্টারে গিয়ে টিকেট কাটতে বাধ্য করা পরিবহনের দীর্ঘ দিনের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের একটি গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা যেতেই পারে।

আমার ঈদযাত্রায় আমার ও পরিবারের সদস্যদের অভিজ্ঞতা মোটেও ভালো ছিল না। ঢাকা-বগুড়া রুটের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ভালো সার্ভিস হিসেবে পরিচিত এস আর ট্রাভেলস। প্রথমে এস আর ট্রাভেলস-এর টিকেট কাটতেই চেষ্টা করেছি। না পেয়ে সহজ ডট কম থেকে ব্লু-লাইন এক্সপ্রেস নামে নতুন একটি সার্ভিসের টিকেট কাটলাম। বাসের যে বর্ণনা আছে এবং ফেসবুক পেজে বাসের যে দারুণ ছবি দেখা গেল তাতে টিকেট কাটতে আত্মবিশ্বাস পেলাম। আর এটাই প্রতরণার ফাঁদ। আসলে কিছু এসি বাস ভাড়া করে একটা সাইনবোর্ড লাগিয়ে ঈদের আগে অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে ২০-২৫টি ট্রিপের টিকেট বিক্রি করাই এই চক্রের কাজ। বড়জোড় দুই তিনটি ট্রিপ ভাড়া করা বাসে দেয়। টিকেট বিক্রির বড় একটা টাকা আত্মসাৎ করে এরা পালিয়ে যায়।

১৯ মার্চ কল্যাণপুরে ব্লু-লাইন এক্সপ্রেসের কাউন্টারে কোনো কর্মচারী ছিলেন না। প্রায় দশটা ট্রিপে টিকেট কাটা শ’তিনেক যাত্রী হৈ-হল্লা করছেন। পরে পুলিশ এসে ব্লু লাইনের দুজন কর্মীকে আনলেন। তারা এসে সেই ভাড়া করা গাড় দিয়ে ৭০জন যাত্রীকে বাসে তুলে দিয়ে আবারও চম্পট। যারা অনলাইন থেকে টিকেট কেটেছেন তারা না হয় একমাস পরেও হলেও প্লাটফর্ম ফি বাদ দিয়ে কিছু টাকা ফেরত পেতে পারেন। কিন্তু যারা কাউন্টার থেকে টিকেট কেটে প্রতারিত হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই টাকা ফেরত পাবেন না, কিংবা ফেরত পাওয়ার জন্য যে চেষ্টা করা দরকার, কর্মব্যস্ত জীবনে সেই চেষ্টা করতে পারবেন না, এটাই স্বাভাবিক।

১৯ মার্চ সকাল ৯টায় আমার বাস যাত্রার নির্ধারিত শিডিউল ছিল। সকাল সাড়ে ৮টায় যখন আমার কাছে ট্রিপ বাতিলের নোটিশ আসল তখন আমি বাস বোর্ডিং পয়েন্ট থেকে মাত্র তিন মিনিট দূরে। এ সময় মনে অবস্থাটা কী হতে পারে! কল্যাণপুরে গিয়ে আগে কাউন্টার থেকে কাউন্টারে সেই পুরনো ছোটাছুটিই শুরু হল। শেষ পর্যন্ত শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের তিনটি টিকেট মিলল, একেবারে শেষ সারিতে। শেষ সারির সেই তিন আসনের একটি আসন ভাঙা। ওপরে এসির সুইচও ভাঙা। প্রবল ঠান্ডা হাওয়ার-ধাক্কায় বসে থাকা দায়। সুপারভাইজার এসে পলিথিন দিয়ে ভাঙা আটকানোর চেষ্টার সময় দেখা গেল বাসের সামনের আরও তিন সিটের ওপরে এসির সুইচ একইভাবে ভাঙা! এরা এভাবেই ‘বিলাসবহুল’ সার্ভিস দেয়!

শাহ ফতেহ আলীর কাউন্টারের একজন জানালেন, তিনি সকাল থেকে প্রায় ১০জন যাত্রীর কাছে এভাবে কয়েকটি ট্রিপের টিকেট বিক্রি করেছেন যারা অনলাইন থেকে টিকেট কেটে তার ভাষায় ‘ধরা’ খেয়েছেন। আসলে অসাধু পরিবহন কর্মচারীরা এভাবে পাবলিকেকে ‘ধরা খাওয়াতে’ চায়, যেন আবারও কাউন্টারের সামনে সেই লম্বা লাইন, ধাক্কাধাক্কির যুগটা ফিরিয়ে আনা যায়! কারণ এ বছর নতুন সরকার এসেছে। সরকার পরিবর্তনের প্রথম কয়েকটা মাস সবসময়ই একটা সন্ধিক্ষণ। সেই সন্ধিক্ষণ কাজে লাগিয়ে যদি অনলাইন টিকেটিং ব্যবস্থা সম্পর্কে জনমনে একটা আস্থার সংকট তৈরি করা যায় এবং অরাজকতা তৈরির সেই মহামন্ত্র ‘ফ্যাসিস্টের চালু করা নিয়ম’ ধুয়া তোলা যায়, তাহলে অনলাইন টিকেটিং সিস্টেম তো বাতিল করা যেতেও পারে! দেখুন, অনলাইন টিকেটিং ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে এবার যত বেশি হঠাৎ ট্রিপ বাতিলের ঘটনা ঘটেছে, বিগত বছরগুলোতে সেটা কিন্তু ঘটেনি। এবারের ঈদযাত্রায় যানজটও আগের তুলনায় কম ছিল এবং বাসের শিডিউল বিপর্যয়ও ঘটেনি। তাহলে কেন অনলাইন প্লাটফর্ম থেকে কেনা টিকেট একের পর এক বাতিল করা হয়েছে?

দায়িত্ব অনলাইন টিকেটিং প্লাটফর্মগুলোকেও নিতে হবে। ঈদযাত্রায় যাত্রা শুরুর আধঘণ্টা আগে ট্রিপ বাতিলের নোটিশ নিঃসন্দেহে যে কাউকে প্রবলভাবে বিচলিত করে তোলে। তিনি অসহায়বোধ করেন এবং ঈদ ঘিরে তার সব পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়ে যায়। ধরুন, যিনি ঈদে বগুড়া কিংবা রংপুর যাচ্ছেন, ঢাকা যাত্রা বাতিলের কারণে তিনি যদি ঢাকায় থেকেও যান তার ঢাকায় ফেরার ফিরতি অগ্রিম টিকেটের কী হবে? সেই টাকা তো ফেরত পাবেন না তিনি, কারণ টিকেট কাটার আগেই শর্ত মানতে হয়, ঈদের আগে পরে দশ দিনের টিকেটে কোনো রিফান্ড হবে না! অথচ বাস অপারেটর, অনলাইন টিকেটিং প্লাটফর্ম কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই যেকোনো মুহূর্তে ট্রিপ বাতিল করতে পারে?

একটা বিকল্প ব্যবস্থা হতে পারে পরবর্তী ট্রিপে টিকেটের ব্যবস্থা। স্বাভাবিক সময়ে এটা সম্ভব হলেও ঈদের আগে সেটা সম্ভব নাও হতে পারে, সেক্ষেত্রে কী হবে? সেক্ষেত্রে অবশ্যই বাস অপারেটরদের উপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিআরটিএ) পক্ষ থেকে একটা আইনগত বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে, ‘ঈদের আগে পরে দশদিন কোনো ট্রিপ শিডিউলের সময় বিশেষ ক্ষেত্রে পরিবর্তন করা যাবে, কোনোভাবেই বাতিল করা যাবে না। প্রয়োজনে বাস ভাড়া করা হলেও ট্রিপ দিতে হবে। এ দশদিন কোনো ট্রিপ পুরোপুরি বাতিল হলে ওই ট্রিপের আয়ের দশগুণ জরিমানা হবে।’ একই সঙ্গে এই বিধানও চালু করতে হবে, ‘যদি অনলাইন টিকেটিং প্লাটফর্ম নিজে থেকে কোনো ট্রিপ বাতিল করে সেক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে প্লাটফর্ম চার্জ কাটা যাবে না। এই চার্জ অপারেটরের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। শুধু গ্রাহক ট্রিপ বাতিল করলে প্লাটফর্ম চার্জ প্রযোজ্য হবে।’ বিআরটিএ’র বিধিতে গ্রাহক স্বার্থ একেবারেই উপেক্ষিত, এই উপেক্ষা বড় ধরনের দায়িত্বহীনতা- এর দ্রুত অবসান হওয়া উচিত।

অনলাইন টিকেটিং এখন সময়ের চাহিদা এবং বাস্তবতা। এ ব্যবস্থা এখন আর বিলোপ করা সম্ভব নয়। কিন্তু দুষ্টচক্র এ ব্যবস্থার মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি করে সাধারণ গ্রাহককে হয়রানি করতে পারে মাত্র। সেই হয়রানি থেকে গ্রাহককে বাঁচানোর দায়িত্ব সরকারের, নিয়ন্ত্রক সংস্থার।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ