এআইয়ের দৌড়ে এগোচ্ছে চীন, চাকরি হারানোর দৌড়ে তরুণরা
চীন এখন ভবিষ্যতের দিকে দৌড়াচ্ছে। হাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পাশে রোবট, সামনে প্রযুক্তির নতুন সাম্রাজ্য। কিন্তু সেই দৌড়ের ধুলোয় পিছনে পড়ে যাচ্ছে আরেকটি দৃশ্য—বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য বের হওয়া তরুণ, কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা মাঝারি দক্ষতার প্রোগ্রামার, অনুবাদক, গবেষক, অফিসকর্মী। যন্ত্র শিখছে দ্রুত; মানুষ কাজ হারাচ্ছে আরও দ্রুত—যেটা এখন দৃশ্যমান।
বেইজিংয়ের কম্পিউটার প্রোগ্রামার ফেই ঝাওজুনকে একদিন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষের মতো প্রোগ্রামিং কোড লিখতে পারবে? উত্তর দেওয়ার বেশি সময় পাননি তিনি। দুই সপ্তাহ পর চাকরি চলে যায় ফেইয়ের। তার সঙ্গে ছাঁটাই হন আরও ১৬০ সহকর্মী। পরে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে তিনি বলেন, মাঝারি দক্ষতার প্রোগ্রামারদের বহু কাজ এখন এআই দিয়েই করানো সম্ভব। যে কারণে বেশি লোকবলের কোম্পানিগুলো ছোট হয়ে আসছে।
ফেইয়ের গল্প ব্যক্তিগত হলেও সংকটটি আর ব্যক্তিগত নেই। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এখন পাশাপাশি দুটি বিপরীত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে গেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও রোবটিকসের বিস্তার ঘটাচ্ছে তুমুল গতিতে। অন্যদিকে সেই প্রযুক্তিই কিছু চাকরির দরজা সরু করে দিচ্ছে—বিশেষ করে তথ্য সংগ্রহ, অনুবাদ, কোডিং, প্রাথমিক গবেষণা, লেখালেখি ও নিয়মমাফিক দাপ্তরিক কাজে।
চীনের সরকারি পরিসংখ্যান এই উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করেছে। আগস্টে শহরাঞ্চলে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের—শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে—বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশে। জুলাইয়ে ছিল ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে প্রায় এক কোটি ২৭ লাখ নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষণ বলছে, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদার সঙ্গে এআইয়ের কারণে প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরি কমে যাওয়ার ভয় নতুন স্নাতকদের ওপর চাপ আরও বাড়াচ্ছে।
তবে এআইকে একমাত্র অপরাধী বানালে হিসাব ভুল হবে। চীনের আবাসন খাতের দীর্ঘ মন্দা, দুর্বল ভোক্তা ব্যয়, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, বিপুলসংখ্যক স্নাতকের বাজারে প্রবেশ এবং অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর—সব মিলিয়েই কর্মসংস্থানের ওপর চাপ বাড়ছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসও সম্পত্তিবাজারের পতন, দুর্বল ভোগ ও স্বয়ংক্রিয়করণকে একই সমীকরণের অংশ হিসেবে দেখিয়েছে।
কিন্তু নতুন ভয়টি অন্য জায়গায়। আগে ধরে নেওয়া হতো, যন্ত্র কারখানার শ্রমিকের কাজ নেবে; অফিসকক্ষ নিরাপদ থাকবে। এআই সেই ধারণাটিই ভেঙে দিয়েছে। বেইজিংয়ের ক্লেয়ার ঝাং চার বছর একটি করপোরেট পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে গবেষণা বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেছেন। বাজার, প্রতিযোগী কোম্পানি ও নানা নথি ঘেঁটে কখনো ৫০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন তৈরি করতেন। পরে তাকে জানানো হয়, এআই ব্যবহারের কারণে আগের মতো এত বিশ্লেষকের প্রয়োজন নেই। চাকরি হারান ঝাং। পরে আরও দুই সহকর্মীকেও ছাঁটাই করা হয়। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির কিছু গ্রাহকও বাইরের গবেষক নিয়োগ না করে এআই ব্যবহার করে নিজেরাই গবেষণার কাজ শুরু করেছে।
এখানেই এআইয়ের আসল ধাক্কা। এটি শুধু একজন কর্মীর কাজ কমাচ্ছে না; কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো ব্যবসার কাঠামোই ছেঁটে ছোট করে দিচ্ছে। আগে যেখানে পাঁচজন লাগত, সেখানে একজন মানুষ আর কয়েকটি এআই টুল দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে।
অনুবাদ, সৃজনশীল শিল্প ও ডিজিটাল কনটেন্টেও একই প্রবণতা চোখে পড়ছে। চেংদুর খণ্ডকালীন অনুবাদক দু চিনচুন জানিয়েছেন, এআই মডেলকে অনুবাদ শেখানোর কাজ পাওয়া গেলেও কয়েক বছর আগের তুলনায় পারিশ্রমিক অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। চীনের স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও ও নাটকের বাজারেও এআই দ্রুত জায়গা করে নিয়েছে। এপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বাস্তব অভিনেতা দিয়ে তৈরি স্বল্পদৈর্ঘ্য ও উল্লম্ব ভিডিও সিরিজের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। গল্প লেখা, ছবি তৈরি, ভয়েস, সম্পাদনা—সবখানেই জেনারেটিভ এআই ঢুকেছে।
শুধু সাদা-কলারের কাজ নয়, রোবট পৌঁছে যাচ্ছে ডাককেন্দ্র, কফিশপ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও খাবার সরবরাহেও। এখনো মানুষ পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়নি; কিন্তু পরীক্ষাগার থেকে প্রযুক্তি যখন বাজারে নামে, তার প্রথম প্রশ্ন থাকে—কত কম মানুষ দিয়ে কত বেশি কাজ করা যায়।
এআইয়ের বিস্তারও চীনে বিস্ময়কর গতির। আইডিসির তথ্য উদ্ধৃত করে এপি জানিয়েছে, ২০২৪ সালে চীনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্র ৯ দশমিক ৬ শতাংশ এআই মডেল বা এজেন্ট ব্যবহার করত। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশে। রাষ্ট্রীয় ‘এআই প্লাস’ কর্মসূচির লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মধ্যে নতুন প্রজন্মের বুদ্ধিমান যন্ত্র ও এআই এজেন্টের ব্যবহার ৭০ শতাংশের ওপরে নেওয়া; ২০৩০ সালে তা ৯০ শতাংশের বেশি।
এখানেই চীনের নতুন দ্বন্দ্ব সবচেয়ে তীব্র। দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমবে। সে হিসাবে রোবট ও এআই দীর্ঘমেয়াদে শ্রমিকসংকটের সমাধান হতে পারে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ আসার আগেই বর্তমানের তরুণদের প্রয়োজন লাখ লাখ চাকরি। যে প্রযুক্তি ২০ বছর পর শ্রমিকের ঘাটতি পূরণ করবে, সেটিই আজ একজন ২২ বছরের স্নাতকের প্রথম চাকরিটি কেড়ে নিতে পারে।
অন্যদিকে এআই নতুন চাকরিও তৈরি করছে। এআই পণ্য ব্যবস্থাপক, প্রকৌশলী, ডেটা প্রশিক্ষকসহ কিছু পেশায় নিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এখানেও ফাঁদ আছে। যে চাকরি যাচ্ছে এবং যে চাকরি আসছে—দুটির দক্ষতা এক নয়। একজন অনুবাদক রাতারাতি এআই প্রকৌশলী হতে পারেন না; একজন জুনিয়র গবেষককে সরিয়ে যে ব্যবস্থা বসছে, সেটি বানাতে হয়তো কয়েকজন উচ্চ দক্ষতার প্রকৌশলী লাগবে, কিন্তু হারানো চাকরির সংখ্যা সেখানে ফিরে আসে না।
চীনের সামনে তাই এখন প্রযুক্তির চেয়েও বড় পরীক্ষা মানুষের। উৎপাদনশীলতা বাড়বে, কারখানা হবে আরও স্মার্ট, অফিস হবে আরও ছোট। কিন্তু মানুষ যদি কাজ না পায়, আয় না বাড়ে, তবে সেই স্মার্ট কারখানার পণ্য কিনবে কে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো কোনো অ্যালগরিদম দেয়নি।
এআইয়ের দৌড়ে চীন থামছে না। কিন্তু যন্ত্র যত দ্রুত কাজ শিখছে, অর্থনীতি কি তত দ্রুত মানুষের জন্য নতুন কাজ তৈরি করতে পারছে—আগামী দিনের সবচেয়ে কঠিন হিসাব সম্ভবত সেখানেই।
মতামত দিন