Views Bangladesh Logo

কেপ ভার্দে: সাত সমুদ্রের ওপারে এক দ্বীপরাজ্যের রূপকথা

Shimul  Zabaly

শিমুল জাবালি

ঠাকুরমার ঝুলির গল্পগুলোয় প্রায়ই থাকে এমন এক রাজ্যের কথা, যেটা মানচিত্রে খুঁজে পাওয়াই কঠিন — চারদিকে অথই জল, মাঝখানে টুকরো টুকরো কয়েকটা দ্বীপ, আর সেখানে বাস করে এক মুঠো মানুষ, যাদের গল্প কেউ কোনোদিন শোনেনি। কেপ ভার্দের গল্পটাও অনেকটা তেমনই। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে ছয়শো কিলোমিটার দূরে আটলান্টিকের বুকে দশটা আগ্নেয়গিরি-জাত দ্বীপ নিয়ে গড়া এই রাজ্য, আয়তনে বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট দেশ, জনসংখ্যায় দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম — সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের বাস, অথচ তাদেরই দ্বিগুণেরও বেশি সন্তান ছড়িয়ে আছে দুনিয়ার আনাচেকানাচে, রাজ্য ছেড়ে ভিনদেশে বসত গড়েছে বহুকাল আগে থেকেই। রূপকথায় যেমন রাজপুত্র রাজ্য ছেড়ে সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দেয় ভাগ্যের সন্ধানে, কেপ ভার্দের মানুষও ঠিক তেমনই পাড়ি দিয়েছে দেশের পর দেশ — তবে রাজকুমারের মতো স্বেচ্ছায় নয়, বাঁচার তাগিদে।

কারণ এই দ্বীপরাজ্যের কপালে সুখ লেখা ছিল না বহুদিন। পনেরো শতকে পর্তুগিজ অভিযাত্রীরা এসে বসতি গড়ে এই জনমানবহীন দ্বীপে, আর তার পরপরই দ্বীপগুলো হয়ে ওঠে আটলান্টিক দাস বাণিজ্যের এক নিষ্ঠুর কেন্দ্র। রাক্ষস-খোক্কসের গল্পে যেমন রাজ্যের ওপর নেমে আসে অভিশাপ, এই দ্বীপরাজ্যের ওপরও নেমে এসেছিল প্রকৃতির অভিশাপ — খরা আর দুর্ভিক্ষ। বৃষ্টি না হওয়া আধা-শুষ্ক এই ভূমিতে ঔপনিবেশিক শাসকদের বন উজাড় আর অবিবেচক পশুচারণ যোগ করে আরও বিপর্যয়। সতেরোশো, আঠারোশো, উনিশশো শতকের একের পর এক দুর্ভিক্ষ কেড়ে নিয়েছে হাজারো প্রাণ, আর সবচেয়ে ভয়ংকর আঘাত এসেছিল ১৯৪১ থেকে ১৯৪৮ সালের মন্বন্তরে, যখন পর্তুগিজ শাসকদের নির্লিপ্ততায় না খেয়ে মরেছে অগণিত মানুষ। বেঁচে থাকার জন্য দরিদ্রতম মানুষগুলো পাড়ি জমিয়েছে সাও তোমে-প্রিন্সিপের বাগানে, কেউ বা তিমি শিকারী জাহাজে চড়ে আমেরিকার পথে — যেন রূপকথার সেই কাঠুরের সন্তান, যে ঘর ছাড়ে শুধু একমুঠো ভাতের আশায়।

কিন্তু প্রতিটা রূপকথাতেই একটা মোড় থাকে, যেখানে অভিশপ্ত রাজ্য জেগে ওঠে নিজের ভাগ্য বদলাতে। ১৯৫৬ সালে গিনি-বিসাউয়ে আমিলকার কাব্রাল নামের এক বিদ্বান জ্বালিয়ে তোলেন স্বাধীনতার মশাল, গড়ে তোলেন পিএআইজিসি আন্দোলন। শান্তির পথ ভেঙে যায় ১৯৫৯ সালের নির্মম হত্যাকাণ্ডে, আন্দোলন রূপ নেয় সংগ্রামের। কাব্রাল নিজে স্বাধীনতার সূর্যোদয় দেখে যেতে পারেননি, ১৯৭৩ সালে ঘাতকের হাতে প্রাণ হারান তিনি — অনেকটা সেই রূপকথার বৃদ্ধ ঋষির মতো, যিনি রাজকুমারকে পথ দেখিয়ে নিজে থেকে যান গল্পের আড়ালে। তবু তার স্বপ্ন থেমে থাকেনি। ১৯৭৫ সালে অবশেষে স্বাধীনতার আলো দেখে কেপ ভার্দে, যদিও তখন রাজকোষ শূন্য, কর্মক্ষম মানুষের ষাট শতাংশই বেকার। ধ্বংসস্তূপ থেকেই শুরু হয় নতুন করে গড়ে তোলার লড়াই — শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণতন্ত্র, ধৈর্য আর অধ্যবসায়ের সেই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ কেপ ভার্দে আফ্রিকার অন্যতম উন্নত রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই একই জেদ আর অধ্যবসায় বহন করে এসেছে তাদের ফুটবলও। ১৯৭৮ সালে গিনির কাছে হার দিয়ে শুরু, এরপর বহু বছর নীরবতা, নাম-না-জানা এক দলের মাঠের বাইরে থেকে যাওয়া। কিন্তু প্রবাসে বেড়ে ওঠা কেপ ভার্দিয়ান সন্তানদের হাত ধরে ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে চিত্র। ২০১৩ সালে প্রথমবার আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সে জায়গা করে নেয় 'ব্লু শার্কস'— আর সেই আসরেই কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে সবাইকে চমকে দেয়, যেন রূপকথার সেই দরিদ্র জেলের ছেলে, যে প্রথমবার রাজদরবারে পা রেখেই সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। এরপর ২০১৫, ২০২১, ২০২৩ সালেও ফিরে আসে আফকনে, ২০২৩-এ আবারও কোয়ার্টার ফাইনাল।

তারপর আসে সেই স্বপ্নের মুহূর্ত, যা রূপকথায় বলা হতো 'রাজ্যজয়ের দিন'। ২০২৫ সালের অক্টোবরে বাছাইপর্বের জি গ্রুপে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট হাতে পায় কেপ ভার্দে। খরা আর দুর্ভিক্ষের ইতিহাস বহনকারী এক জাতি, আজ পা রাখছে ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চে। আটলান্টায় প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন স্পেন, রূপকথার ভাষায় বলা যায় খোদ রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজার সঙ্গে দেখা। অথচ ছোট্ট এই দল গোলশূন্য ড্র করে ফিরে আসে, যেন কোনো জাদুমন্ত্রবলে ঠেকিয়ে দেয় দৈত্যের আক্রমণ। এরপর উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ ড্র, নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ গোলও পেয়ে যায় তারা। শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে আরেকটি গোলশূন্য ড্র নিশ্চিত করে দেয় সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত — গ্রুপ রানার্স-আপ হয়ে নকআউট পর্বে জায়গা, প্রথমবারের অভিযানেই।

আর তারপর আসে সেই রাত, যা এই রূপকথার ক্লাইম্যাক্স। রাউন্ড ৩২-এ প্রতিপক্ষ খোদ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা — মেসি, লাউতারো মার্তিনেজদের নিয়ে গড়া সেই অজেয় বাহিনী, যারা টানা দ্বিতীয় শিরোপার স্বপ্নে বিভোর। মিয়ামির মাঠে দৈত্যের সামনে দাঁড়িয়েও কাঁপেনি ছোট্ট এই দল। ২৯ মিনিটে পিছিয়ে পড়েও ৫৯ মিনিটে সমতা ফেরায় তারা, যেন রূপকথার সেই সাহসী কিশোর, যে প্রথম আঘাতেই ভয় পায় না, উল্টে তলোয়ার তুলে পাল্টা আঘাত হানে। নির্ধারিত সময় ১-১ থেকে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ৯২ মিনিটে আর্জেন্টিনা আবার এগিয়ে গেলেও কেপ ভার্দে হার মানেনি — ১০৩ মিনিটে আবারও সমতা ফিরিয়ে গোটা বিশ্বকে হতবাক করে দেয় তারা। শেষমেশ ১১১ মিনিটে আর্জেন্টিনার নির্ণায়ক গোলে ৩-২ ব্যবধানে থেমে যায় লড়াই। রূপকথায় যেমন হয়, ছোট্ট নায়ক সবসময় রাজ্য জিতে নেয় না — কিন্তু তার সাহস দিয়েই সে জিতে নেয় মানুষের হৃদয়। গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার অবিশ্বাস্য সেভ, দলের প্রতিটা খেলোয়াড়ের চোয়ালশক্ত লড়াই প্রমাণ করে দেয়, কেন এই ছোট্ট দ্বীপরাজ্য হয়ে উঠল এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভালোবাসা পাওয়া দল।

খরা আর দুর্ভিক্ষে বিধ্বস্ত এক জাতি, যাদের সন্তানরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ঘর ছেড়েছে শুধু বেঁচে থাকার আশায়, আজ তাদেরই উত্তরসূরিরা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করল বিশ্বকাপের মঞ্চে। রূপকথার শেষে যেমন লেখা থাকে 'রাজ্যপাট না পেলেও রাজপুত্র জিতে নিল মানুষের মন'— কেপ ভার্দের গল্পও ঠিক তেমনই এক অসমাপ্ত রূপকথা, যেখানে হার আছে, কিন্তু পরাজয় নেই। সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের এই দ্বীপরাজ্য চিরকালের জন্য প্রমাণ করে দিল, গল্পের আকার ছোট হলেও তার সাহস হতে পারে সাগরের চেয়েও বিশাল।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ