বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াই শুরু আজ
এটলাস লায়ান্সদের সামনে কানাডা, ফ্রান্সের প্যারাগুয়ের পরীক্ষা
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ হলেই ফুটবলের গল্প বদলে যায়। তখন আর ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ থাকে না, থাকে শুধু বেঁচে থাকার লড়াই। একটি পাস, একটি ট্যাকল, একটি ভুল কিংবা একটি মুহূর্তের জাদুই লিখে দিতে পারে ইতিহাস। চার বছর ধরে জমে থাকা স্বপ্ন তখন নব্বই মিনিটের পরীক্ষায় ঝুলে থাকে। ফিফা বিশ্বকাপ-২০২৬-এর শেষ ষোলোর মঞ্চে আজ সেই পরীক্ষায় নামছে চারটি দল—স্বাগতিক কানাডা, আফ্রিকার বিস্ময় মরক্কো, ইউরোপের পরাশক্তি ফ্রান্স এবং লাতিন আমেরিকার লড়াকু প্যারাগুয়ে। দুই ম্যাচ, চারটি ভিন্ন দর্শন, কিন্তু লক্ষ্য একটাই—কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট।
বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় টেক্সাসের হিউস্টনে স্বাগতিক কানাডার মুখোমুখি হবে ‘এটলাস লায়ান্স’ খ্যাত মরক্কো। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া কানাডা আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। গতি, আগ্রাসন এবং দ্রুত কাউন্টার-অ্যাটাক তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। অন্যদিকে, ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলা মরক্কো আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, সংগঠিত ফুটবল আর শৃঙ্খলিত রক্ষণ দিয়েও বড় দলকে হারানো যায়।
কানাডার পজেশনভিত্তিক আক্রমণের প্রাণ হবেন আলফনসো ডেভিস। বাম প্রান্ত দিয়ে তার গতিময় দৌড় প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বারবার ছিন্নভিন্ন করতে পারে। মাঝমাঠে স্টিফেন ইউস্তাকিও বলের গতি নিয়ন্ত্রণ, পাসের ছন্দ এবং খেলার রিদম ঠিক রাখবেন। আক্রমণে জনাথন ডেভিড বক্সের ভেতরে ফিনিশিংয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা, আর তাজন বুকানন ডান প্রান্তে জায়গা তৈরি করে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখবেন।
অন্যদিকে মরক্কোর মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করবে সোফিয়ান আমরাবাতের ওপর। তিনি বল পুনরুদ্ধার এবং পজেশন ধরে রাখার মূল কারিগর। সৃজনশীলতার দায়িত্ব থাকবে ব্রাহিম দিয়াজের কাঁধে, যিনি ছোট ছোট পাসে আক্রমণের পথ খুলে দিতে পারেন। ডান প্রান্তে আশরাফ হাকিমির ওভারল্যাপিং দৌড় এবং আক্রমণ-রক্ষণে সমান অবদান মরক্কোকে বাড়তি শক্তি দেবে। গোলের সামনে ইউসুফ এন-নেসিরির উপস্থিতি কানাডার রক্ষণকে সারাক্ষণ সতর্ক রাখবে।
বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টায় ফিলাডেলফিয়ায় শুরু হবে দিনের দ্বিতীয় ম্যাচ। মুখোমুখি হবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার অন্যতম দাবিদার ফ্রান্স এবং জায়ান্ট কিলার প্যারাগুয়ে। শেষ ৩২-এ সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাসের চূড়ায় রয়েছে ফরাসিরা। তবে জার্মানিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে প্যারাগুয়ে ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে, তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি—ইতিহাস লিখতেও প্রস্তুত।
ফ্রান্সের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তার গতি ও অফ-দ্য-বল মুভমেন্ট প্রতিপক্ষের রক্ষণকে অস্থির করে তুলতে পারে। ডান উইংয়ে উসমান ডেম্বেলে এক-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। মাঝমাঠে অরেলিয়েন চুয়ামেনি বলের দখল ধরে রেখে আক্রমণ গড়ে তুলবেন, আর এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা দুই প্রান্তে সংযোগ তৈরি করে দলের পজেশনভিত্তিক ফুটবলকে আরও গতিশীল করবেন।
প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সংগঠিত ডিফেন্সিভ ব্লক। মাঝমাঠে আন্দ্রেস কুবাস বল পুনরুদ্ধার এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙার মূল দায়িত্ব পালন করবেন। অভিজ্ঞ মিগেল আলমিরন দ্রুত ট্রানজিশনে আক্রমণ শুরু করার অন্যতম ভরসা। আক্রমণে হুলিও এনসিসোর ড্রিবলিং ও সৃজনশীলতা ফরাসি রক্ষণকে ব্যস্ত রাখবে। আর ওমর আলদেরেতে রক্ষণভাগে নেতৃত্ব দিয়ে এমবাপ্পেদের থামানোর কঠিন দায়িত্ব পালন করবেন।
নকআউট পর্বের ফুটবলে পরিসংখ্যান কিংবা অতীতের অর্জন খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। এখানে সাহস, ধৈর্য, পজেশনের নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তাই হিউস্টন ও ফিলাডেলফিয়ার দুই লড়াইয়ে ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষা করবেন নতুন নায়ক, নতুন ইতিহাস এবং নতুন বিস্ময়ের জন্য।
বিশ্বকাপের এবারের আসরে ইতোমধ্যেই ইতিহাস গড়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে কানাডা, নরওয়ে, মিশর ও সুইজারল্যান্ড। চার দলই নিজেদের সীমানা ভেঙে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এখন শেষ আটে ওঠার লড়াই আরও উত্তপ্ত হতে যাচ্ছে। শেষ ষোলোর বাকি ম্যাচগুলোতে মুখোমুখি হবে পর্তুগাল-স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়াম, ব্রাজিল-নরওয়ে, মেক্সিকো-ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা-মিশর এবং সুইজারল্যান্ড-কলম্বিয়া। ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার শক্তিগুলোর এই মুখোমুখি লড়াই বিশ্বকাপকে নিয়ে যাবে আরও অনিশ্চয়তা, নাটকীয়তা ও রোমাঞ্চের নতুন উচ্চতায়। প্রতিটি ম্যাচই হতে পারে নতুন ইতিহাসের জন্মমুহূর্ত, আবার কোনো পরাশক্তির স্বপ্নভঙ্গের গল্পও।
মতামত দিন