মেসির ইতিহাস ও এমবাপ্পের দাপটের দিনে পারবেন কি রোনালদো ?
বিশ্বকাপের প্রতিটি সূর্যোদয় নতুন গল্প নিয়ে আসে। কোথাও জন্ম নেয় নতুন নায়ক, কোথাও কিংবদন্তি আরও উঁচুতে তুলে ধরেন নিজের উত্তরাধিকার। আবার কোথাও একজন মহাতারকা দাঁড়িয়ে যান অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন মোড়ে। ফিফা বিশ্বকাপ-২০২৬-এর দ্বিতীয় ম্যাচগুলোর দিনটি ঠিক তেমনই এক নাটকীয় ক্যানভাস, যেখানে একই সঙ্গে লেখা হয়েছে ইতিহাস, আধিপত্য আর টিকে থাকার সংগ্রামের গল্প।
দিনের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো ছড়িয়েছেন লিওনেল মেসি। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ে গোল করে তিনি ভেঙে দিয়েছেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা এখন ১৭, যা তাঁকে এককভাবে পুরুষ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসিয়েছে। কয়েক দিন আগেই আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছিলেন তিনি। আর এবার ইতিহাসের শিখরে উঠলেন একক রাজা হয়ে।
শুধু রেকর্ড নয়, মেসির ফুটবল যেন বয়সকে অস্বীকার করার এক জীবন্ত শিল্পকর্ম। ৩৯ ছুঁইছুঁই বয়সেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, পাস, বল নিয়ন্ত্রণ আর গোল করার সহজাত ক্ষমতা প্রমাণ করে—মহান খেলোয়াড়েরা সময়ের কাছে হার মানেন না, বরং সময়কেই নিজেদের গল্পের অংশ বানিয়ে নেন।
আর্জেন্টিনাও খেলেছে ঠিক চ্যাম্পিয়নসুলভ ফুটবল। বলের দখল, আক্রমণের বৈচিত্র্য এবং রক্ষণে শৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা বুঝিয়ে দিয়েছে, শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে তারাই অন্যতম প্রধান দাবিদার। দুই ম্যাচে পূর্ণ ছয় পয়েন্ট নিয়ে তারা এখন নকআউট পর্বের একেবারে দ্বারপ্রান্তে।
অন্যদিকে ফ্রান্সের জয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে কিলিয়ান এমবাপ্পে। ইরাকের বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোলসংখ্যা বাড়িয়ে ১৫-এ নিয়েছেন তিনি। মাত্র তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলেই এই কীর্তি গড়েছেন ফরাসি অধিনায়ক। তাঁর সামনে এখন শুধু মেসি, রোনালদো নাজারিও ও ক্লোসার মতো কিংবদন্তিদের নাম। বয়স মাত্র ২৭, তাই বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট একদিন তাঁর মাথায় উঠবে—এমন বিশ্বাসও জোরালো হচ্ছে।
এম্বাপ্পের গতি, নিখুঁত ফিনিশিং এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার দক্ষতা ফ্রান্সকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। তাঁর উপস্থিতি শুধু গোল এনে দেয় না, পুরো দলের আক্রমণকে অন্য মাত্রা দেয়। টানা দুই জয়ে ফরাসিরাও শেষ ষোলোর পথে শক্ত অবস্থানে।
বিশ্বকাপের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে দুই প্রজন্মের দুই মহাতারকা—মেসি ও এমবাপ্পে। একজন ইতিহাসের শিখরে পৌঁছে গেছেন, অন্যজন সেই ইতিহাসকে তাড়া করছেন দুরন্ত গতিতে। একদিকে উত্তরাধিকারের পূর্ণতা, অন্যদিকে নতুন যুগের সূচনা—দুই ছবিই যেন একই ফ্রেমে ধরা পড়ছে।
তবে আজকের দিনটি অন্য এক কিংবদন্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল আজ মুখোমুখি হবে উজবেকিস্তানের। প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে ড্র করায় তাদের সংগ্রহ মাত্র এক পয়েন্ট। ফলে এই ম্যাচে জয় ছাড়া বাস্তবিক অর্থেই আর কোনো পথ নেই। ড্র কিংবা হার পর্তুগালের নকআউটের স্বপ্নকে কঠিন সমীকরণে ফেলে দেবে।
তাই আজকের ম্যাচটি শুধু তিন পয়েন্টের নয়, এটি রোনালদোর নেতৃত্ব, সাহস আর শেষবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার পরীক্ষা। সমর্থকদের বিশ্বাস, সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেই রোনালদো নিজের সেরাটা বের করে আনতে পারেন। সেই পরিচিত দৃশ্যটি আবারও দেখা যাবে কি না, তার উত্তর লুকিয়ে আছে আজকের ৯০ মিনিটে। অঅর এখন পর্যন্ত সবার চিন্তা এই কঠিন মূহুর্তে বিশ্বকাপে নিজের দেশ পর্তুগালকে বাঁচাতে পারবে কি রোনালদো? বিশ্বমঞ্চে দেখা যাবে কি পর্তুগীজ ঝড়?
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচগুলো তাই শুধু ফলাফলের হিসাব নয়; এটি ইতিহাস ছোঁয়ার, উত্তরাধিকার গড়ার এবং স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। এক প্রান্তে মেসির অমরত্ব, অন্য প্রান্তে এমবাপ্পের দুর্বার উত্থান, আর মাঝখানে রোনালদোর বাঁচা-মরার যুদ্ধ। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এর চেয়ে নাটকীয় কাহিনি আর কী-ই বা হতে পারে!
মতামত দিন