Views Bangladesh Logo

বসিলা পাসপোর্ট অফিসে পদে পদে হয়রানি, দালালেই মুক্তি

‘তো আপনি এক কাজ করেন। লঞ্চের একটা টিকিট কাটেন। ওইডায় চইড়া চাঁদপুর যান। আর গিয়া কাগজপত্তর নিয়া আসেন। এখন যান এখান থেকে!’ বাঁকা হাসিটি হেসে খানিকটা বসিলা পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত একজন সরকারি কর্মচারী জনৈক সেবাপ্রার্থীকে উদ্দেশ্য করে তাচ্ছিল্যের স্বরে কথাটা বললেন এবং কাচের দেয়ালের অন্য পাশ থেকে হাত নেড়ে ‘দুর দুর’ করে চলে যাওয়ার জন্য ইশারা করলেন। কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিটি চলে গেলেন, হয়তোবা চাঁদপুরের লঞ্চ ধরার জন্যই; কিন্তু হতাশা আর হয়রানির ছাপ কেবল তার চেহারার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছিল কাগজপত্র হাতে নিয়ে গাদাগাদি করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আরও গোটা পঞ্চাশেক নাগরিকের ঘর্মাক্ত মুখমণ্ডলে। বসিলা পাসপোর্ট অফিসের এই চিত্রটি যদি পাঠকের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে, সমস্যা আরও গভীরে।

গত কুড়ি বছরে অবকাঠামোর দিক দিয়ে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে। পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এবং সামনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া বাংলাদেশের উন্নতির একটি বড় মাইল ফলক হচ্ছে নাগরিক জীবনে তথ্য-প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার। অনেক দাপ্তরিক কাজ সহজলভ্য করে তুলেছে টিন নম্বর এবং জাতীয় পরিচয়পত্র। ই-পাসপোর্ট নবায়ন করতে চাইলে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য ছাড়া লাগবে শুধু আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরটি। এটা দিয়েই আপনি সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে পারবেন আজকাল। ওয়েবসাইটও খুবই ব্যবহার-বান্ধব, ইংরেজিতে যাকে বলে User Friendly। সিস্টেম আপনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ই-মেইলে পাঠিয়ে দিচ্ছে পরবর্তী পদক্ষেপের যাবতীয় দলিল ও নির্দেশগুলো পিডিএফ ফাইলে (যদিওবা ফর্মের মধ্যে ইউনিকোডের বাংলা যুক্তাক্ষরের স্ক্রিপ্ট ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। আশা করছি, প্রশাসন এই সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেবেন)।

সেবার মূল্য অনলাইনেও দেয়া যায়, কিংবা ব্যাংকের চালানপত্রের মাধ্যমেও দেয়া যায়। এসব কিছু স্বয়ংক্রিয় করাতে প্রশাসনিক ত্রুটির সম্ভাবনা কমেছে এবং জনগণের জীবন আরও সহজ হয়ে উঠেছে; কিন্তু অনলাইনের গণ্ডি পেরিয়ে যখনই অফলাইন অফিসে এসে সেবা নিতে হয়, তখনই শুরু হয় যাবতীয় যত হয়রানির।

আমার ঠিকানার ভিত্তিতে ওয়েবসাইটের স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম নির্ধারিত করে দিল যে আমাকে মোহাম্মদপুরের বসিলায় যেতে হবে। সচরাচর পাসপোর্ট সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য আমি আগারগাঁওয়ে গিয়ে অভ্যস্ত; কিন্তু সিস্টেমে নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের জায়গায় না গিয়ে তো উপায় নেই। তাছাড়া নতুন একটি অফিসে গিয়ে অভিজ্ঞতা নেবার কৌতূহলও আমার ছিল। বসিলায় যাওয়া মাত্রই লোকজনের চোখেমুখে অস্বস্তির ছাপ দেখলাম। আঁচ করে নিলাম যে, কাজ হাসিল হতে সময় লাগবে। অফিসের দালানটাও পরিকল্পিত মনে হলো না। মনে হচ্ছিল, কারো কোনোমতে তোলা একটি বাসা বাড়ির ইজারা নিয়ে কোনোমতে একটি অফিস বানিয়ে কাজ চলছে। লাইন ধরার কাউন্টার আর তথ্য কিয়স্ক এমনভাবে বসানো যে, সুষ্ঠুভাবে লাইন ধরাই মুশকিল। কিয়স্কের কর্মচারীর আচরণে অপেশাদারিত্বের ছাপ। ওনার ব্যবহার দেখে মনে হচ্ছিল, লোকজন তার কাছে আসাতে তিনি মহা বিরক্ত (যদিওবা অন্যান্য কাউন্টার থেকে বিভিন্ন জনকে তারই কাছে পাঠানো হচ্ছে)। তিনি তার কাজ সঠিকভাবে যদি করেও থাকেন, তার আচরণ এবং মনোভাব সেবাদানের যোগ্য নয়।

সেবাপ্রার্থীরাও যে খুব একটা মোলায়েম তাও নয়। ‘আপু, এত ঘেঁষে দাঁড়ানোর কোনো মানে আছে?’ অনেকক্ষণ ধরে সহ্য করার পর একজন মহিলা তার পেছনে গা ঘেঁষে দাঁড়ানো আরেকজন মহিলাকে জিজ্ঞেস করছিলেন। কেবল মহিলাদের লাইন নয়, পুরুষদের লাইনেও লোকজন সগন্ধ ঘর্মাক্তবদনে একে অপরের ওপর উপচে পড়ছে। পাশ্চাত্যের সরকারি অফিসগুলোতে লিঙ্গের ভিত্তিতে লাইন ধরা হয় না; কিন্তু লোকজনের প্রবৃত্তি দেখে বুঝলাম কেন লিঙ্গভেদে আলাদা লাইনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফ্যান কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের অতটা ব্যবস্থা নেই। দুটি ফ্যান থাকলে একটি কাজ করবে না, এমন অবস্থা। তাও শীতকাল হওয়াতে কিছুটা বেঁচে গেছি। ভিড় আর ধাক্কাধাক্কির ওপর গ্রীষ্মের ভ্যাপসা গরম যোগ হলে কী যে হতো, তা চিন্তার বাইরে।

এর মধ্যে মহিলা লাইনের কাউন্টারের কর্মচারীকে ঘনঘন বিরতি নিতে হচ্ছিল। ফ্যান কাজ না করাতে তিনি তার নেকাবের নিচে গরমের মধ্যে খুবই কষ্ট পাচ্ছিলেন বোধহয়। কর্মিসংকটের কারণে ওনার স্টেশনের কাজ মন্থরগতিতে হচ্ছিল এবং সেই সঙ্গে বাড়ছিল লোকজনের হয়রানি। ‘এনাফ লোক নাই এদের।’ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বিরক্তির স্বরে বললেন। তার প্রত্যুত্তরে একজন রেগে বললেন: ‘ওরা কর্মচারী হায়ার করে নাই, সেটা কি আমাদের সমস্যা? যত্তসব হয়রানি এই জনগণের ভাগ্যেই জোটে। মানুষ মনে করে না আমাদের’। ‘হ হ, ঠিক কইছেন’ ইত্যাদি বলে মৃদুভাবে সোচ্চার হলো অনেকে তার সঙ্গে। অনেকে টিটকারি দিতে শুরু করল: ‘এই হইল গিয়া আপনার সোনার বাংলা। বুঝছেন? ডিজিটাল বাংলাদেশ। ইশ্মাট বাংলাদেশ।’

তিক্তবিরক্ত লোকজন গজগজ করতে করতে সামনে এগোতে থাকলো লাইন। কখন দেখতে দেখতে কাউন্টারের ঠিক সামনে চলে আসলাম, এবং ‘পড়বি পড় মালির ঘাড়ে’, তখনই আমার সেবাদাতার বিরতি নেয়ার সময় হলো। বিরতি নেয়াটা অবশ্য খুবই স্বাভাবিক। বিশেষ করে উনি যে কাজটা করেন, সেটা বিবেচনা করলে। এত বেশি লোকজন এবং এই ধরনের পরিবেশ সামলানো চাট্টিখানি কথা না; কিন্তু যেখানে এতগুলো লোক অস্থির হয়ে আছে, বিশেষ করে বসিলা অফিসের মতো ছোট জায়গায়, সেখানে ব্যাকআপের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যবহারও একটি সমস্যা এই জায়গায়। পাশ্চাত্যের অফিসগুলোতে নতুন প্রজন্মের সরকারি কর্মচারীরা এই ধরনের সেবা দিতে দেরি হলে ব্যক্তিগতভাবে লাইনে দাঁড়ানো লোকজনের সামনে এসে বলে, কতো মিনিট দেরি হবে। পাঠক যদি ভেবে থাকেন, এ ধরনের দাপ্তরিক আদব কায়দা এশিয়ান মাটিতে চলবে না, তাদের মনে করিয়ে দেব যে, জাপানে ট্রেন দেরি করলে কন্ডাক্টর নিজে যাত্রীদের সামনে এসে নতজানু হয়ে ক্ষমা চান। জাপান পারলে আমাদের না পারার, অন্তত শেখার চেষ্টা না করার কোনো কারণ নেই। সেবার নাম করে ডাঁট দেখানোর বদভ্যাস যদি থাকে আমাদের, অচিরেই তা শুধরাতে হবে।

একজন সেবাপ্রার্থীর সঙ্গে সহমর্মিতা দেখিয়ে মানবিক আচরণ প্রকাশ করা যেমন একজন সরকারি কর্মচারীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, ঠিক তেমনই কোনো অফিসে সেবা নিতে আসা লোকজনেরও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে অফিসের কর্মরত মানুষদের সঙ্গে শালীনতা এবং সহমর্মীতার সঙ্গে আচরণ করার। উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন সরকারি অফিস ও যানবাহনে zero tolerance লেখা পোস্টার আঁটা থাকে, যেখানে লেখা থাকে: Swearing, threats or any act of violence will not be tolerated. Anyone giving verbal abuse to members of staff will be asked to leave the premises! অর্থাৎ ‘কোনো প্রকার গালিগালাজ, দুর্ব্যবহার কিংবা সহিংস আচরণ সহ্য করা হইবে না। নিয়ম ভঙ্গ করিলে তৎক্ষণাৎ প্রাঙ্গণ ত্যাগ করিতে বাধ্য করা হইবে।’

একে তো নিজের কাজ ফেলে সরকারি অফিসে আসা, তার উপরে যানজটের ঝক্কি সামলানো, এবং তারও ওপরে অফিসারের ‘এই দলিল আনেন, সেই দলিল আনেন, অমুক অফিসে যেতে হবে, তমুক লোকের সই নিতে হবে’ ধরনের বাণী শোনাতে যে কারোর ধৈর্য্যরে সীমা অতিক্রান্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। আনসার ভাইটি অবস্থা সামাল দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন; কিন্তু আবেদন জমা নেয়ার পুরুষ ও মহিলা লাইনের দু-দুটি পোস্টের অফিসারই অনেকক্ষণ ধরে লাপাত্তা হওয়ার কারণে লোকজন অসহ্য হয়ে উঠছিল। এতক্ষণ ধরে যে লাইনদুটি অন্তত মন্থর গতিতে চলছিল, সেগুলো গতিহীন হয়ে যাওয়াতে লোকজনের মনের সমস্ত রাগ ও হয়রানিজনিত কষ্টবোধ দুর্ব্যবহারের রূপে বের হতে শুরু করলো, যার লক্ষ্য ছিল বেচারা আনসার। একটা সময়ে আমার পেছনের ভদ্রলোকটি লোকজনকে একটু বোঝানোর চেষ্টা করলেন: ‘এগুলো আপনি অফিসারদের জিজ্ঞেস করবেন। উনি তো আনসার, ওনার কাছ থেকে কী ‘আনসার’ আশা করেন?’ অতিষ্ঠ লোকজনের মাথার ওপর দিয়ে গেল ওনার pun, কিন্তু কথাটি আনসার সাহেবের কানে গেছে ঠিকই। এই বিরূপ সময়ে এইটুকু সহমর্মীতার প্রত্যুত্তরে আন্তরিক ভাবেই একটু ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘অন্তত একজন তো বুঝতে পারলো আমার অবস্থাটা! ভাই, আপনার এই কথার জন্য আমি আপনাকে কফি খাওয়াবো!’

মোট চারটি কাউন্টারের মধ্যে দুই লিঙ্গে বিভক্ত দুটি কাউন্টার আবেদনপত্র জমা করার জন্য নির্দিষ্ট। আর বাকি যে দুটি কাউন্টারে পাসপোর্ট প্রদান করা হয়, সে দুটিও দুই লিঙ্গে বিভক্ত। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার কাউন্টারের গতিবিধি থেমে থাকার কারণে পাসপোর্ট প্রদানের কাউন্টারের অফিসারেরও টুকটাক কথাবার্তা সহ্য করতে হচ্ছিল। এর মধ্যে পাসপোর্ট প্রদানের মহিলাদের লাইনে ছিল একটি ছোট মেয়ে। মেয়েটির পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন স্যুট পড়া ফিটফাট সৌম্য চেহারার মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক। মেয়েটির অভিভাবক হবেন হয়তো। যেহেতু কোনো নাবালক বা নাবালিকা পাসপোর্টধারী অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে পাসপোর্ট গ্রহণ করতে পারবে না, সেহেতু আমি ধরে নিলাম যে লোকটি তার মেয়ের পাসপোর্ট তুলতে এসেছেন। কাউন্টারের অফিসার পাসপোর্টের দিকে এক নজর তাকালেন, তারপর তাকালেন মেয়েটির দিকে এবং শেষে রাগান্বিত হয়ে তাকালেন ভদ্রলোকের দিকে। ‘কাজটা কিন্তু একদম ঠিক করেননি! আপনাদের মতো সিনিয়ার আর শিক্ষিত মানুষই যদি এরকম কাজ করে তো বাকিরা কি শিখবে? আপনারা ‘দুর্নীতি-দুর্নীতি’ বলে চিল্লাবেন, আর এটা দুর্নীতি না?’

ভদ্রলোকের মুখমণ্ডলের সৌম্যভাব মুছে গিয়ে চোখেমুখে সদ্য ধরা পড়া কোনো চোরের কাচুমাচু ভাব ফুটে উঠলো। মহিলাদের লাইন যেহেতু ছোট, তিনি তার ছোট মেয়েকে সেখানে দাঁড় করিয়ে নিজের পাসপোর্ট উদ্ধার করলেন এবং একই সঙ্গে মেয়েটিকে স্বহস্তে হাতে খড়ি দিলেন দুর্নীতিতে। অফিসার তো দয়া করে পাসপোর্ট হস্তান্তর করলেন। অফিসারের জায়গায় আমি হলে ভদ্রলোককে পুরুষদের লাইনের পেছনে পাঠিয়ে দিতাম। হয়তো অফিসার সাহেব মেয়ে কিংবা বাকি সবার সামনে বয়োজ্যেষ্ঠকে এর বেশি অপমান করতে চাননি।

শেষ পর্যন্ত আবেদন জমা নেয়ার অফিসার ফেরত আসলেন (মহিলা কাউন্টারের অফিসার তখনও লাপাত্তা)। কাগজপত্র দেখে বললেন, যে আমার জন্ম সনদপত্র লাগবে, যদিওবা ইমেলের ডকুমেন্টে লেখা ছিল যে এনআইডি কার্ড ও পাসপোর্ট সঙ্গে থাকলেও হবে। আমার অনলাইন ফর্মে একটা ভুল থাকাতে জন্মনিবন্ধনপত্রের প্রয়োজন হচ্ছিল সম্ভবত; কিন্তু এর আদৌ কোনো দরকার ছিল কি না, সন্দেহ, কেননা যে তথ্যটি অফিসার সাহেব খুঁজছিলেন, সে তথ্য আগের পাসপোর্টেই ছিল।

আমাকে পত্রপাঠ চলে যেতে বলা হলো। অফিস থেকে বের হতেই এক আগন্তুক আমার কাছে এসে বললেন যে ফাইল ওনার হাতে দিলে কিছু অর্থের বিনিময়ে সে ফাইল অনুমোদন ‘করিয়ে’ আনবেন। বুঝে গেলাম. পাসপোর্ট অফিসের দেয়ালে দেয়ালে টাঙানো পোস্টারগুলোতে যে সমস্ত দালালের ব্যপারে সাবধানবাণী দেওয়া হচ্ছিল, ইনি তাদেরই একজন। আমার হতভম্ব ভাব দেখে আমার অনভিজ্ঞতা আঁচ করলেন পাশে দাঁড়ানো একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। কাউন্টারের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বললেন: ‘দিয়া দ্যান। হ্যাগো লগে কানেকশন আছে। পয়সাপাতি দিলেই কাজ হইয়া যায়।’ এটি সত্যি কি মিথ্যা আমি জানি না, যাচাই করার ইচ্ছাও আমার ছিল না; কিন্তু ব্যাপারটা খুব একটা ভালো লাগলো না। প্রথমত, অচেনা কোনো ব্যক্তির হাতে কেনই বা আমি আমার ব্যক্তিগত দলিল তুলে দেব, এবং দ্বিতীয়ত, এই ধরনের অপকর্মকেই বা কেন আমি প্রশ্রয় দেব। অগত্যা বাসার দিকে রওনা হলাম কাগজপত্র নিয়ে আনতে। শিক্ষা হলো এই যে বাংলাদেশের যে কোনো দাপ্তরিক কাজের জন্য বের হলে দরকারি/অদরকারি, বলা/না বলা সব কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে বের হওয়াই শ্রেয়।

কেবল নিজের নয়, এক অর্থে চৌদ্দ গুষ্টির ঠিকুজি নিয়েই আবার হাজির হলাম সেদিনই। অফিসার সাহেব কাগজ পাওয়া মাত্র আমাকে পাঠিয়ে দিলেন ওপরের তলায়। ‘কোন কক্ষে?’ অফিসার সাহেব নিরুত্তর। আনসার সাহেব ইঙ্গিত দিলেন ওপর তলায় যেতে। গিয়ে দেখি, বিভিন্ন কক্ষে বিভিন্ন কাজ চলছে; কিন্তু ঠিক কোথায় নবায়নের জন্য ছবি তুলতে হবে, তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। কোন কক্ষে, কার হাজির হওয়ার কথা তারও কোনো ভালো নির্দেশনা নেই। লাইনের কোনো বালাই নেই, জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল লোকজন এখানে ওখানে।

আশেপাশের লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলে একেক দরজার সামনে একেক জন লাইন ধরলাম। প্রায় আধা ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর একজন অফিসার আসলেন। ইতিমধ্যে ঘটলো আরেক ঘটনা। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সবাইকে উপেক্ষা করে মধুরভাষী এক ভদ্রমহিলা তার ছেলেকে নিয়ে সবার আগে ঢুকে পড়লেন কক্ষে। কেউ কেউ ‘লাইন কেন কাটছেন’ জিজ্ঞেস করাতে খুবই কোমল স্বরে দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে তিনি তার যুক্তিগুলো পেশ করলেন: ‘১. বাবুর ছুটি তো সহজে মেলে না, ২. আমি তো বাংলাদেশ বেতারে কাজ করি।’ খেয়াল করছিলাম অনেকক্ষণ ধরে, যেখানে লোকজন ধাক্কাধাক্কি-হয়রানি সহ্য করে লাইন ধরে দাঁড়াচ্ছিল, তিনি অবাধে বিচরণ করছিলেন পাসপোর্ট অফিসের এই কক্ষ থেকে সেই কক্ষে। হয়তো ওনার চেনাজানা কেউ আছেন এখানে। অথবা বাংলাদেশ ‘বেতালের’ (দুঃখিত, ‘বেতারের’) সদস্য হওয়াতে তার এমন কোনো বিশেষ অধিকার ছিল, যা আমাদের মতো আম জনতার ছিল না। কারণ লাইনে দণ্ডায়মান বাকি সবার এবং তাদের বাবুদেরও ছুটি পাওয়া কঠিন; কিন্তু উনি ছাড়া বাকি সবাই কাগজ-পত্রের জন্য লাইন ধরে হয়রানি সহ্য করে যাচ্ছিলেন।

আবেদনপত্রের ভুল তথ্য শুদ্ধিকরণ শেষ হয়ে গেল খুবই চট করে। ছবি তোলার সময় জানানো হলো যে আগের পাসপোর্ট এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি লাগবে। এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি পেলাম ছবি তোলার ঠিক আগে। আগে থেকে অবগত হলে ব্যবস্থা নিতাম। অফিসের বাইরে পাশেই ছিল ফটোকপির দোকান (তথ্যটি আমাদের কাছে না থাকাতে অন্তত ওনার ব্যাবসার সুবিধা হচ্ছে)। বার বার এ রকম সিঁড়ি ভেঙে ওঠানামা করা আমার জন্য ঠিক আছে; কিন্তু যারা বয়স্ক, কিংবা হাঁটাচলায় যাঁদের কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা আছে, তাদের কথা চিন্তা করছিলাম। দ্বিতীয় একটি শিক্ষাও পেলাম: কেবল দলিল নয়, বাংলাদেশের কোনো দাপ্তরিক কাজে একই দলিলের একাধিক কপি নিয়ে বেরোনো উচিত।

সঙ্গদোষে নষ্ট। আর লাইন ধরলাম না। দরজায় গিয়ে অনুমতি চাইলাম ঢোকার। ছবি তোলা হয়ে গেল। যেহেতু হাতে সময় কম, ই-পাসপোর্টের নবায়নের জন্য সুপার-এক্সপ্রেস ডেলিভারির আবেদন করে সেই যাত্রায় ঘরে ফিরে আসলাম। এর মধ্যে কেবল অসম্পূর্ণ তথ্যের জন্য কিছু দৌড়াদৌড়ি করতে হলো, এই যা। কিছু কিছু মুহূর্তে এক অদ্ভুত দাপ্তরিক গোলকধাঁধাঁর মাঝখানে দুই ব্যাটের মাঝখানে নিজেকে পিংপং বলের মতো মনে হচ্ছিল। ভাবছিলাম, খুব একটা পড়াশোনা যাঁরা জানেন না, কিংবা সুদূর গ্রাম থেকে এসেছেন যারা, তাদের কেমন হেনস্তার শিকার হতে হয় এসব জায়গায়।

কিছুদিনের মধ্যেই একটা টেক্সট আসলো মোবাইলে: পিক আপের জন্য আমার পাসপোর্ট প্রস্তুত রিজিওনাল অফিসে। চলে গেলাম আবার বসিলায় কাগজপত্র সমেত। আগের মতোই সেই এলাহী কাণ্ড। লোকজনের ভিড়, ধাক্কাধাক্কি, অসন্তুষ্ট মনোভাব, চিৎকার চেঁচামেচি তো আছেই, অনেকে আগের দিনের তুলনায় কটুতর মন্তব্য করছিলেন কর্মরতদের কর্মদক্ষতা নিয়ে। আমি কাউন্টারে যাওয়ার পর জানতে পারলাম যে বসিলায় নয়, পাসপোর্ট নিতে আমাকে যেতে হবে আগারগাঁও। একটু হতাশ হলাম। ‘এটা তো লেখাই আছে’- বললেন অফিসার সাহেব। কোথায় লেখা আছে? টেক্সটে উক্ত রিজিওনাল অফিস যে আগারগাঁও, সেটাই বা আমি কীভাবে জানবো? যারা ঢাকার নন, বা যারা প্রবাসে থাকেন, তাদের জন্য এই ধরণের অসম্পূর্ণ তথ্য প্রচণ্ড হয়রানির কারণ। পিক আপ অফিসের ঠিকানাসহ টেক্সট মেসেজেটি পাঠানো কি সম্ভব ছিল না? আশা করছি প্রশাসন এই ফিচারটি ওদের প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করবেন।

আগারগাঁওতে যাওয়ার সময় ভয়ই পাচ্ছিলাম যে ওখানে না আবার নতুন কোনো সার্কাসের মুখোমুখি হতে হয় আমাকে; কিন্তু আগারগাঁও আগাগোড়া অবাক করে দিল। কেবল আনসার নয়, ওখানে গার্ড হিসেবে ছিল সেনাবাহিনীর সদস্য। সুন্দর ব্যবস্থাপনা, গুছানো সিস্টেম, একটু রূঢ় (সহ্যের মধ্যে) কিন্তু কর্মদক্ষ অফিসার, সব কিছু ক্রমিক নম্বর মেনে চলা, ইত্যাদি। অনেক লোক জড়ো হওয়া সত্তেও এক ঘন্টারও কম সময়ে পাসপোর্ট আমার হাতে চলে আসে। পাঠক বলতে পারেন: ‘আগারগাঁওয়ের অফিস বড়, এবং সেনাসদস্য থাকাতে এত সুন্দর ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে।’ কিন্তু যেখানে শতশত লোক প্রতিদিন হেনস্তা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন, তারা কি এই যুক্তিগুলো শুনতে চাইবেন? যিনি গুরুতর ব্যাধিতে আক্রান্ত এবং চিকিৎসার জন্য যার বিদেশে যেতে হবে শিগগিরই এবং আশু পাসপোর্টটি হাতে পাওয়া অপরিহার্য, তার কাছে এই যুক্তিগুলোর কী মূল্য আছে?

প্রবাসের সরকারি অফিসে কাজ করা এক বন্ধু তার কর্মস্থানের গল্প করছিল। সহকর্মীরা মিলে একবার তাদের কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ করেছিল করপোরেট অফিসগুলোর মতো তাদের অফিসেও যেন ফ্রি চা বা কফির ব্যবস্থা থাকে। কর্মকর্তা সেই দাবি মানেননি, কেননা কর্মচারীদের বেতনসহ অফিসের যাবতীয় খরচের অর্থের উৎসের পেছনে আছে নাগরিকদের বহু কষ্টে প্রদত্ত আয়কর। করদাতাদের সেবার প্রয়োজনে অপরিহার্য যা যা খরচ আছে, সেগুলো তিনি করতে রাজি আছেন; কিন্ত চা-কফি অপরিহার্য নয়। কর্মকর্তা বলতে চান: ‘পাশে দু তিনটে কফিশপ আছে। আপনারা বিরতির সময় গিয়ে নিজের খরচে কফি খাবেন। জনগণের পয়সায় নয়।’ তিনি বারংবার মনে করিয়ে দেন: ‘ফাইলগুলো কেবল নম্বর নয়। এগুলো এককটি লোকের জীবন। একেকটি লোকের স্বপ্ন। সবসময় মনে রাখতে হবে যে আমরা হচ্ছি public servant। জনগণের সেবক ব্যতিত কিছুই নই আমরা। যেহেতু জনগণ আমাদের মালিক এবং অন্নদাতা, সেহেতু তাদের সম্মান করে কাজ করতে হবে।’

সবাই কি এভাবে চিন্তা করে আমার বন্ধুর অফিসে? অবশ্যই না; কিন্তু যেহেতু তাদের কর্মদক্ষতা প্রতিনিয়ত যাচাই করা হয়, ভদ্রতা ও শালীনতার সঙ্গে কর্মচারী জনগণকে সেবাদান করছে কি না তা নজরে রাখা হয়, এবং custmer service গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়, সেহেতু অফিসাররা তাদের পোস্টের উপযুক্ত আচরণ করতে বাধ্য থাকেন। নতুবা পদোন্নতির ব্যাপারে সংকট দেখা দিতে পারে। সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘনঘন নালিশ আসলে চাকরি থেকে তার বহিষ্কারেরও সম্ভাবনা আছে।

পাঠক মনে করে থাকতে পারেন যে আমি আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখছি, এ সব বাংলাদেশের মতো দেশে সম্ভব নয়। আপনি যদি সে ধরনের ধারণা পোষণ করে থাকেন, তবে প্রিয় পাঠক, আপনি সমাধানের অংশ নন, বরং সমস্যা-সৃষ্টির একজন অংশীদার। আপনি চাইলেই নালিশ করতে পারেন বারবার। গণমাধ্যমে লিখতে পারেন। হেনস্তার শিকার হলে গণমাধ্যমে ভিডিও ছাড়তে পারেন। যদি দশ শতাংশ মানুষও যদি দেশের বিভিন্ন সরকারি অফিস নিয়ে এরকম করতে থাকে, প্রশাসনের টনক নড়বে এবং আপনার সেবাদানের প্রক্রিয়ায় লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন আসতে বেশি দিন লাগবে না। প্রশাসনেরও এর পেছনে দায়িত্ব আছে। সকল সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহির জন্য নাম এবং পোস্টের ট্যাগ বহন করাতে বাধ্য করে নাগরিকদের সমালোচনা করার সুযোগ করে দিতে হবে এবং কেউ যদি ট্যাগ না পরে থাকে কিংবা সেবাপ্রার্থী তার নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক থাকে, তবে তার শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

আমার যে কাজ ছিল সেটা হাসিল হয়েছে। পাসপোর্টটা হাতে পেয়ে কিছুক্ষণ সেটির দিকে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। প্রধান পরিচয়পত্রের পৃষ্ঠতলে ছবি এবং জন্মতারিখ দিয়ে জালিয়াতিরোধী নিরাপত্তার জন্য আলোর প্রতিসরণের প্রয়োগ দেখে ভালো লাগল; কিন্তু প্রতিসরণের প্রয়োগ কেবল ব্যবহারিক দিক দিয়ে হয়নি, হয়েছে শৈল্পিক চিন্তাধারার একটি ছাপ রেখে। পাসপোর্টটি নাড়ালেই আলোর খেলায় মনে হচ্ছে আমাদের সবার পরিচিত এবং প্রিয় লাল সবুজ পতাকাটি পাসপোর্টের পৃষ্ঠার এক কোনে যেন পতপত করে উড়ছে। যারা এই পাসপোর্টের পরিকল্পনা করেছেন, তাদেরকে আমি বাহবা জানাচ্ছি।

আমি মনে করি যে একটি রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে তার জনগণের জীবন যাপন ও মননের সার্বিক মান বৃদ্ধি করা। কেবল ডিগ্রিভিত্তিক শিক্ষা, কিংবা মাথাপিছু জিডিপি দিয়ে নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উদাহরণস্বরূপ সামগ্রিক শিক্ষা, শিষ্টাচার, সহনশীলতা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে আমাদের সেবার মান বৃদ্ধি করতে হবে। এর ফলে জনগণের আচরণ ও মননের মানও চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়বে। আমি বিশ্বাস করি, সরকারি সেবার মান যদি বৃদ্ধি হয়, কেবল স্মার্ট বাংলাদেশ নয়, গড়ে তুলব আমরা স্মার্ট বাংলাদেশি। দেশের অভ্যন্তরে শুধু নয়, গোটা বিশ্বের সামনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একজন ভালো প্রতিনিধি/রাষ্ট্রদূত হয়ে উঠবে পারবে উচ্চ মানের একেক জন নাগরিক। এক দিনে নীতিশিক্ষায় এই কঠিন পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। সবার দায়িত্ববোধ জাগ্রত হওয়া চাই এবং নিয়মভঙ্গের জন্য চাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

একজন পাসপোর্ট অফিসার তার অন্নদাতা জনগণের সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করে, সেই দুর্ব্যবহারের অধিকার তাকে কে দিয়েছে? একটি স্থানীয় পাসপোর্ট অফিসে জনগণের জন্য কেন পর্যাপ্ত সুবিধা রাখা হবে না? কেন থাকবে না সেখানে পরিচ্ছন্ন একটি শৌচালয়? প্রশাসন কোন অধিকারে অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে জনগণের সময় ও অর্থ নষ্ট করছে। এই অপ্রয়োজনীয় বাস্তবতাকে প্রশ্রয় দিতে দিতে গিয়ে গোটা জাতির সময়, শ্রম, মেধা ও অর্থের এমন ক্ষয় হচ্ছে, যার হিসাব করাও অসম্ভব প্রায়।

আশা করছি, কেবল স্যাটেলাইট, মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, রূপপুর এবং সুন্দর পাসপোর্টেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বাংলাদেশের এই টেকসই উন্নয়ন ও ইতিবাচক পরিবর্তন। জনগণ নিজের এবং বিশেষ করে তাদের সরকারি কর্মচারীদের সেবার মান বৃদ্ধি করে এই পরিবর্তনকে এমন একটি নবজাগরণের দিকে নিয়ে যাবে, যেটি একটি ইতিবাচক অবদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে আগামি দিনের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করবে।

প্রিয় পাঠক, এই লেখাটিকে প্রতিবাদ ও গঠনমূলক সমালোচনার একটি স্ফূলিঙ্গ বিবেচনা করুন। এতে খড়কুটো ফেলে ফুঁ দিতে ভুলবেন না, যদি আপনি চান যে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে ইতিবাচক পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের আগুন ঠিকঠাকমতো জ্বলে উঠুক।

লেখক: কবি, লেখক ও সমাজচিন্তক

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ