শজিমেক হাসপাতালে সক্রিয় ‘বকশিশ সিন্ডিকেট’, সেবা পেতে দিতে হয় টাকা
বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত বৃদ্ধ মোবারককে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান স্বজনরা। হাসপাতালে ভর্তির পর প্রথমেই মোবারককে রাখা হয় তৃতীয় তলার মেঝেতে। স্বজনদের জানানো হয়, কোনো বেড খালি নেই। তবে এর কিছুক্ষণ পরই তরিকুল নামের এক ওয়ার্ডবয় এসে বলেন, বেডের ব্যবস্থা করা যাবে, এর বদলে তাকে দিতে হবে ১০০ টাকা বকশিশ। সেই বকশিশ দেওয়ার পরই মোবারকের ভাগ্যে জুটে বেডে শুয়ে মৃত্যু।
এর আগে, চিকিৎসক কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেন। এর মধ্যে ছিল একটি হৃৎপিণ্ডের ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষা (ইসিজি)। পরীক্ষাটি সম্পন্ন হলেও রিপোর্ট হাতে পেতে পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। সেখানে তাদেরকে জানানো হয় বকশিশ দিলে সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হবে ইসিজির প্রতিবেদন। তবে সেখানে তারা বকশিশ দেননি। সে কারণে ইসিজি রিপোর্টও সেদিন পাননি।
হাসপাতালে বেড পাওয়ার আগে মোবারকের শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকলেও শুরুতে কিছু সময় অক্সিজেন দিয়ে তা খুলে রাখা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে দায়িত্বে থাকা ওয়ার্ডবয় তরিকুলকে দীর্ঘ সময় খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রায় ৩০ মিনিট পর তাকে পাওয়া গেলেও তিনি অনেকটা বাধ্য হয়ে আবার অক্সিজেন সংযোগ দেন।
ঘটনাটি গত ২৪ জুনের। ওই দিন দুপুরে শজিমেক হাসপাতালে মোবারক আলীকে ভর্তি করা হয়। পরদিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মোবারক। মোবারক আলী বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার লালদহ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। মোবারকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দেন তার মেয়ে মুন্জু বেগম, নাতি হামদুল ইসলামসহ অন্যান্য স্বজনরা।
মোবারকের মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি সরকারি হাসপাতালের বকশিশ নেওয়া। ভর্তির পরদিন মরদেহ নিয়ে হাসপাতাল ছাড়ার প্রস্তুতির সময় এক ওয়ার্ডবয় স্বজনদের কাছে ৪৫০ টাকা দাবি করেন।
সেই ওয়ার্ডবয়ের ভাষ্য, এটি মারা যাওয়ার পরের ইসিজি বিল, যা পরিশোধ করতেই হবে। তবে স্বজনদের একজন সেই ইসিজির রসিদ দেখতে চাইলে ওই ওয়ার্ডবয় শেষ পর্যন্ত ৪৫০ টাকা না নিয়ে ১০০ টাকা বকশিশ নিয়েই চলে যান।
স্বজনদের অভিযোগের শেষ এখানেই নয়। হাসপাতালের ভেতরে রোগী উঠানো-নামানোর জন্য স্ট্রেচার ব্যবহারেও নির্ধারিত কোনো রসিদ ছাড়াই ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। রোগী ও স্বজনদের পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে শজিমেক হাসপাতালে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালটিতে ভর্তি থাকা অন্তত ১০ জন রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শজিমেক হাসপাতালে সেবা পেতে হলে প্রতিটি ধাপে টাকা দিতে হয়। রোগীর অবস্থা হঠাৎ করে অবণতি হলেও ডাক দিয়ে নার্সদের সাড়া মেলে না। বকশিশ না পেলে ওয়ার্ডবয়েরা রোগীর স্বজনদের সাথে দুর্ব্যবহার করা শুরু করেন। শজিমেক হাসপাতালে সেবা নিতে গিয়ে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা।
শজিমেক হাসপাতালের আগের একটি গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। বকশিশ না পেয়ে এক অস্থায়ী কর্মচারী রোগীর অক্সিজেন মাস্ক খুলে দেন। এতে রোগীর মৃত্যু হয়। সেই রোগীর নাম বিকাশ (১৮)।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার পুটিমারী গ্রামের বাসিন্দা বিকাশ সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর তাকে শজিমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে মাথায় ব্যান্ডেজ ও মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে স্ট্রেচারে করে সার্জারি বিভাগের তৃতীয় তলায় নিয়ে যান হাসপাতালের অস্থায়ী কর্মচারী আসাদুল ইসলাম মীর ধলু।
বিকাশের স্বজনদের অভিযোগ, তৃতীয় তলায় পৌঁছানোর পর বিকাশের বাবা বিশু চন্দ্র কর্মকারের কাছে বকশিশ হিসেবে ২০০ টাকা দাবি করেন ধলু। বিশু ১৫০ টাকা দিলে বাকি ৫০ টাকা না পেয়ে ক্ষুব্ধ হন ধলু।
অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে মুমূর্ষু রোগী বিকাশের মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক খুলে দেন ধলু। এতে বিকাশের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পরে মারা যান তিনি। এ সময় আশপাশের রোগী ও স্বজনরা ছুটে এলে ধলু আবারও তার মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে যান।
বিকাশের মৃত্যুর ঘটনার পরদিন বগুড়া সদর থানায় একটি মামলা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সেই মামলায় ধলুকে আসামি করা হয়। মামলায় গ্রেপ্তারও হন ধলু। অভিযুক্ত ধলু গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কুমিরাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা।
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে শজিমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. মঞ্জুর-এ-মুর্শেদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন অংশে আমাদের ফোন নম্বর (অভিযোগ জানানোর নম্বর) দেওয়া আছে। রোগীর স্বজনরা যদি আমাদের অভিযোগ দেন, আমরা তাৎক্ষণিক সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নেব। এখন পর্যন্ত মুঠোফোনে স্বজনদের এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
মতামত দিন