সাম্বার ছন্দে ব্রাজিলের জয়, সামনে অপেক্ষায় নতুন পরীক্ষা
বিশ্বকাপের রাতগুলো কখনও কখনও শুধু ফুটবলের গল্প বলে না, বলে প্রত্যাবর্তনের, স্বপ্নের এবং নতুন অভিযাত্রার গল্প। কানাডার আকাশের নিচে যখন শেষ বাঁশি বেজে উঠল, তখন ব্রাজিলের হলুদ জার্সিগুলোয় যেন ঝলমল করছিল আত্মবিশ্বাসের আলো। স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ ষোলো নয়, নতুন ফরম্যাটের বিশ্বকাপে রাউন্ড অব ৩২-এর টিকিট নিশ্চিত করেছে সেলেসাওরা। তবে সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। কারণ দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ হতে পারে নেদারল্যান্ডস, জাপান কিংবা সুইডেনের মতো শক্তিশালী কোনো দল।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল ব্রাজিলের আধিপত্যের আরেকটি প্রদর্শনী। প্রথম দুই ম্যাচে ভালো খেলার ধারাবাহিকতা ধরে রেখে কার্লো আনচেলত্তির দল পুরো ম্যাচেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। আক্রমণে গতি, মাঝমাঠে সৃজনশীলতা এবং রক্ষণে দৃঢ়তা—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
তবে ম্যাচের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে ৭৬ মিনিটে। প্রায় ৯৮১ দিন পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে আসেন নেইমার। ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সিধারী মাঠে নামতেই গ্যালারিজুড়ে তৈরি হয় অন্যরকম আবহ। দীর্ঘ চোটজর্জর সময় পেরিয়ে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন যেন ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য নতুন আশার নাম।
মাত্র কয়েক মিনিট মাঠে থেকেও নিজের উপস্থিতির জানান দেন নেইমার। কয়েকটি আক্রমণ তৈরি করেন, কর্নার নেন এবং সতীর্থদের সঙ্গে আক্রমণের ছন্দ গড়ে তোলেন। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁকে দেখে মনে হয়নি তিনি দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে ছিলেন। বরং মনে হয়েছে, বড় মঞ্চের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেই ফিরেছেন।
ব্রাজিল গ্রুপ পর্ব শেষ করেছে সাত গোল করে এবং মাত্র এক গোল হজম করে। এমন পরিসংখ্যান শুধু আক্রমণভাগের শক্তির নয়, পুরো দলের ভারসাম্যেরও প্রমাণ। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো, মাতেউস কুনিয়া এবং এখন নেইমারের প্রত্যাবর্তন—সব মিলিয়ে আক্রমণভাগ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
তবে এখন ব্রাজিলের চোখ দ্বিতীয় রাউন্ডে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ আসবে গ্রুপ ‘এফ’ থেকে। সবচেয়ে সম্ভাব্য দুই নাম নেদারল্যান্ডস ও জাপান। তবে শেষ ম্যাচে অঘটন ঘটলে সুইডেনও হতে পারে সেলেসাওদের প্রতিপক্ষ।
নেদারল্যান্ডস হলে ব্রাজিলের জন্য সেটি হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ইউরোপিয়ান দলটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল, শক্তিশালী মাঝমাঠ এবং দ্রুত ট্রানজিশনের জন্য পরিচিত। ইতিহাসও ব্রাজিলকে খুব বেশি স্বস্তি দেয় না। বিশ্বকাপের মঞ্চে ডাচদের বিপক্ষে একাধিক স্মরণীয় লড়াইয়ে হোঁচট খেতে হয়েছে সেলেসাওদের। ফলে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচটি হতে পারে আগাম ফাইনালের মতোই কঠিন।
অন্যদিকে জাপান বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সংগঠিত দলগুলোর একটি। অসাধারণ ফিটনেস, দ্রুতগতির আক্রমণ এবং কৌশলগত শৃঙ্খলা তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। বড় দলগুলোর বিপক্ষে চমক দেখানোর ইতিহাসও আছে সামুরাই ব্লুদের। তাই নামের বিচারে দুর্বল মনে হলেও জাপানকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
আর যদি সুইডেন আসে, তবে শারীরিক শক্তি ও সেট-পিসে তাদের দক্ষতা ব্রাজিলের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ইউরোপীয় ফুটবলের পরিচিত দৃঢ়তা এবং লড়াকু মানসিকতা নিয়ে তারা যে কোনো প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলতে সক্ষম।
তবে প্রতিপক্ষ যেই হোক, ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস এখন আকাশছোঁয়া। নেইমারের প্রত্যাবর্তন, আক্রমণভাগের ধার এবং আনচেলত্তির অভিজ্ঞ নেতৃত্ব—সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বকাপের পথে নতুন করে গতি পেয়েছে সাম্বার দেশ। গ্রুপ পর্বের গল্প শেষ। এখন শুরু নকআউটের নির্মম বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতার প্রথম অধ্যায়ে ব্রাজিলের সামনে অপেক্ষা করছে এক কঠিন কিন্তু রোমাঞ্চকর পরীক্ষা।
মতামত দিন