সেলেসাওদের শুরুতেই মরক্কো পরীক্ষা
‘হেক্সা’ জয়ের স্বপ্ন যাত্রায় মাঠে নামছে ব্রাজিল
ফুটবল বিশ্বকাপে রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে এবার তাদের সামনে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ অর্থাৎ হেক্সা জয়ের হাতছানি। সেই স্বপ্ন পূরণে প্রথম ম্যাচে মাঠে নামছে সেলেসাওরা। যদিও শুরুতেই তাদের সামনে এটলাস লায়ন্স মরক্কো। যারা গত বিশ্বকাপের সেমি ফাইনাল খেলেছে। বাংলাদেশ সময় রোববার ভোর ৪টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে ম্যাচটি। যেখানে হবে এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচও।
বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল। ফুটবলের সবচেয়ে সফল দেশটির নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পেলের জাদু, রোমারিওর গোল, রোনালদোর বিস্ময় কিংবা নেইমারের শিল্পময় ফুটবল। কিন্তু ২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপ ট্রফি আর ছুঁতে পারেনি সেলেসাওরা। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষায় থাকা ব্রাজিল এবার উত্তর আমেরিকার মাটিতে সেই আক্ষেপ ঘোচানোর স্বপ্ন দেখছে।
তবে সেই যাত্রার শুরুটা মোটেও সহজ নয়। প্রতিপক্ষ মরক্কো এখন আর আফ্রিকার সাধারণ কোনো দল নয়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তারা ইতিহাস গড়ে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয়। স্পেন ও পর্তুগালের মতো ইউরোপিয়ান পরাশক্তিকে বিদায় করে বিশ্ব ফুটবলে নতুন শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে আটলাস লায়ন্সরা।
দুই দলের অতীত পরিসংখ্যান অবশ্য ব্রাজিলের পক্ষেই কথা বলে। বিশ্বকাপে একমাত্র দেখায় ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে ৩-০ গোলের জয় পেয়েছিল ব্রাজিল। এছাড়া দুটি প্রীতি ম্যাচে উভয় দল একটি করে জয় পেয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে তানজিয়ারে অনুষ্ঠিত ম্যাচে মরক্কো ২-১ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিলকে। ফলে আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামার যথেষ্ট কারণ রয়েছে আফ্রিকান দলটির।
এবারের বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে কোচিং বেঞ্চে। দীর্ঘদিনের জল্পনা শেষে ইতালিয়ান কিংবদন্তি কার্লো আনচেলত্তি দায়িত্ব নিয়েছেন দলটির। ব্রাজিলের ১১২ বছরের জাতীয় দলের ইতিহাসে তিনিই প্রথম বিদেশি প্রধান কোচ। ক্লাব ফুটবলে অসাধারণ সাফল্যের মালিক আনচেলত্তির হাতে এখন বিশ্বের অন্যতম প্রতিভাবান দল। তবে জাতীয় দলের মঞ্চে বিশ্বকাপ জেতার চ্যালেঞ্জ একেবারেই ভিন্ন।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ব্রাজিলের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে কয়েকটি অপ্রত্যাশিত হারের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছিল দলটি। কোচ পরিবর্তন, ইনজুরি এবং ছন্দহীন পারফরম্যান্সের কারণে একসময় সমর্থকদের মধ্যেও শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আনচেলত্তির অধীনে দলটি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে প্রথম ম্যাচে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি ব্রাজিলের জন্য উদ্বেগের কারণ। ইনজুরির কারণে নেই রদ্রিগো, এস্তেভাও, এদের মিলিতাও ও ওয়েসলি। সবচেয়ে বড় ধাক্কা অবশ্য নেইমারকে ঘিরে। দীর্ঘদিন ধরে চোটে ভোগা এই তারকা এখনও পুরোপুরি ফিট নন। ফলে আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া ও মাতেউস কুনিয়াদের ওপরই বেশি দায়িত্ব পড়বে।
রক্ষণভাগেও কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। অভিজ্ঞ মার্কিনিওস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েস সেন্টার-ব্যাকে ভরসা দিলেও রাইট-ব্যাক পজিশনে এখনো নিশ্চিত সমাধান পাননি আনচেলত্তি। দানিলো, ইবানেজ কিংবা মিডফিল্ডার এদেরসনের মধ্যে কাউকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে মরক্কোর শিবিরেও পরিবর্তনের হাওয়া। বিশ্বকাপের কয়েক মাস আগে দায়িত্ব ছাড়েন সফল কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুই। তার জায়গায় আসেন মোহামেদ উহবি। যুব পর্যায়ে দারুণ সাফল্য পাওয়া এই কোচ গত বছর মরক্কোকে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়েও তিনি আত্মবিশ্বাসী।
উহবির দলে ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ একাডেমিতে বেড়ে ওঠা এক ঝাঁক প্রতিভাবান ফুটবলার রয়েছেন। অধিনায়ক হাকিম জিয়েখ, আশরাফ হাকিমি, সেলিম আমাল্লাহ কিংবা আজেদিন উনাহির মতো খেলোয়াড়রা বড় ম্যাচের চাপ সামলাতে অভ্যস্ত। তাদের দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং সংগঠিত রক্ষণই মরক্কোর সবচেয়ে বড় শক্তি।
তবে ইনজুরির সমস্যা তাদেরও তাড়া করছে। নরওয়ের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে চোট পেয়ে ছিটকে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্ডার নায়েফ আগের্দ এবং উইঙ্গার আবদে ইজ্জালজৌলি। ফলে দল নির্বাচনে কিছুটা সমন্বয় করতে হচ্ছে কোচ উহবিকে।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ অনেক সময় পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ব্রাজিলের জন্য এটি শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়, বরং হেক্সা জয়ের অভিযানে নিজেদের সামর্থ্যের ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ। অন্যদিকে মরক্কো চাইবে আবারও প্রমাণ করতে যে কাতার বিশ্বকাপের সাফল্য কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আলোয় তাই আজ মুখোমুখি হচ্ছে দুই ভিন্ন বাস্তবতার দুই দল—একদিকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দেশ ব্রাজিল, অন্যদিকে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় রূপকথার নাম মরক্কো। হেক্সার স্বপ্নে বিভোর সেলেসাওরা কি উড়ন্ত সূচনা পাবে, নাকি আবারও চমক দেখাবে আটলাসের সিংহরা—সেই উত্তর মিলবে রোববার ভোরেই।

মতামত দিন