Views Bangladesh Logo

শিশুদের নিষ্পাপ হৃদয়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ফুটবল উন্মাদনা

Anjan Kar

অঞ্জন কর

বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই এক বিশেষ দৃশ্য চোখে পড়ে। গ্রামের মেঠোপথ থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি, স্কুলের মাঠ থেকে ছাদের রেলিং—সব জায়গায় উড়তে থাকে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক শিশুই এসব দেশের ইতিহাস, ফুটবল ঐতিহ্য কিংবা খেলোয়াড়দের সম্পর্কে কিছু না জেনেও কোনো একটি দলের সমর্থক হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, কেন বাংলাদেশের শিশুরা বুঝে না বুঝে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে? এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানা কারণ।

পারিবারিক প্রভাব সবচেয়ে বড় কারণ
একটি শিশুর প্রথম শিক্ষালয় তার পরিবার। সে তার বাবা-মা, বড় ভাই-বোন কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে ধারণা পায়। বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারে দেখা যায়, বাবা যদি ব্রাজিলের সমর্থক হন, তাহলে সন্তানও ছোটবেলা থেকেই ব্রাজিলের জার্সি পরে বড় হয়। আবার বাবা বা বড় ভাই যদি আর্জেন্টিনার সমর্থক হন, তাহলে শিশুটিও সেই দলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। অনেক সময় শিশুরা জানেই না ব্রাজিল কোথায় কিংবা আর্জেন্টিনা কোন মহাদেশে অবস্থিত। কিন্তু পরিবারের প্রিয় দলকেই তারা নিজের দল হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে সমর্থনটি হয়ে ওঠে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একটি পরিচয়।

সামাজিক পরিবেশের প্রভাব
বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলা নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক উৎসব। বিশ্বকাপ এলেই পাড়া-মহল্লা ভাগ হয়ে যায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা শিবিরে। রাস্তায় পতাকা টানানো, ব্যানার লাগানো, মিছিল করা; সবকিছুই শিশুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একজন শিশু যখন দেখে তার আশপাশের অধিকাংশ মানুষ একটি দলকে সমর্থন করছে, তখন সেও সেই দলের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কারণ শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই সমাজের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে চায়। তাই বন্ধু বা প্রতিবেশীদের প্রভাবে তারা কোনো একটি দলকে সমর্থন করতে শুরু করে।

বন্ধুদের অনুসরণ করার প্রবণতা
শিশুদের মনস্তত্ত্বে বন্ধুদের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। স্কুলে গিয়ে যদি সে দেখে তার চার-পাঁচজন বন্ধু আর্জেন্টিনার সমর্থক, তাহলে সেও আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে যেতে পারে। আবার অন্য পরিবেশে ব্রাজিল সমর্থকদের সংখ্যা বেশি হলে সে ব্রাজিলের ভক্ত হয়ে উঠতে পারে। অনেক সময় শিশুদের মধ্যে দল নির্বাচন নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা, তর্ক কিংবা খেলার মাঠে মজা করার জন্যও তারা কোনো একটি দলের সমর্থক হয়ে যায়।

তারকা খেলোয়াড়দের জনপ্রিয়তা
ফুটবলের ইতিহাসে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সবসময়ই বিশ্বসেরা খেলোয়াড়দের জন্ম দিয়েছে। ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে, রোনালদিনহো ও নেইমার কিংবা আর্জেন্টিনার মহান তারকা দিয়েগো ম্যারাডোনা এবং লিওনেল মেসি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় জয় করেছেন। শিশুরা সাধারণত তারকাদের অনুসরণ করতে ভালোবাসে। তারা প্রিয় খেলোয়াড়ের জার্সি পরে, তার মতো চুল কাটে, এমনকি খেলার সময় তার ভঙ্গিমাও অনুকরণ করে। ফলে খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তা থেকেই অনেক শিশু একটি নির্দিষ্ট দেশের সমর্থক হয়ে ওঠে।

মিডিয়া ও টেলিভিশনের প্রভাব
বাংলাদেশে বিশ্বকাপের সময় টেলিভিশন, ইউটিউব, ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে। সংবাদমাধ্যমগুলোও এই দুই দলকে কেন্দ্র করে নানা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। শিশুরা যখন বারবার এই দুই দলের নাম শুনতে থাকে, তখন তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ তৈরি হয়। অন্যান্য দেশের তুলনায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা বেশি আলোচনায় থাকার কারণে শিশুরাও সেগুলোর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়।

দীর্ঘদিনের ফুটবল সংস্কৃতি
বাংলাদেশে ফুটবল সমর্থনের ইতিহাস বহু পুরোনো। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশক থেকেই ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে আসছে। সেই ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। আজকের শিশুরা যখন দেখে তাদের বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদীরা বহু বছর ধরে একই দল সমর্থন করছেন, তখন তারাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হয়ে যায়। ফলে সমর্থনটি একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ে রূপ নেয়।

রঙিন জার্সি ও পতাকার প্রতি আকর্ষণ
শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই উজ্জ্বল রঙের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ জার্সি এবং আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি শিশুদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় মনে হয়। বিশ্বকাপের সময় বাজারে বিভিন্ন ধরনের জার্সি, পতাকা, ব্যাজ ও খেলনা পাওয়া যায়। এসব রঙিন উপকরণ শিশুদের মধ্যে দলের প্রতি আবেগ তৈরি করে। অনেক সময় শুধু জার্সি ভালো লাগার কারণেও একটি শিশু কোনো দলের সমর্থক হয়ে যায়।

বিজয়ী দলের প্রতি আকর্ষণ
মানুষ সাধারণত সফলদের অনুসরণ করতে পছন্দ করে। ব্রাজিল পাঁচবার এবং আর্জেন্টিনা একাধিকবার বিশ্বকাপ জিতেছে। ফুটবল ইতিহাসে এই দুই দেশের সাফল্য অত্যন্ত উজ্জ্বল। শিশুরা যখন শুনে কোনো দল অনেকবার বিশ্বকাপ জিতেছে বা বিশ্বসেরা খেলোয়াড়দের জন্ম দিয়েছে, তখন তারা সেই দলের সমর্থক হতে আগ্রহী হয়। কারণ তারা বিজয়ীদের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে চায়।

আবেগের সহজ সংক্রমণ
শিশুরা স্বভাবগতভাবেই খুব দ্রুত অন্যের আবেগ ও অনুভূতি গ্রহণ করে। পরিবারের সদস্যরা যখন ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার খেলা দেখে উল্লাসে মেতে ওঠে, গোল হলে আনন্দে চিৎকার করে কিংবা হেরে গেলে হতাশা প্রকাশ করে; তখন সেই আবেগ শিশুর মনেও গভীর প্রভাব ফেলে। খেলার কৌশল বা ইতিহাস সম্পর্কে না জানলেও তারা পরিবারের আনন্দ-দুঃখের অংশ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সেই আবেগগত সংযোগ তাদের নির্দিষ্ট একটি দলকে সমর্থন করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং সেটিই তাদের ফুটবল-ভালোবাসার সূচনা হয়ে ওঠে।

জাতীয় দলের দুর্বল উপস্থিতি
বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি। ফলে বিশ্বকাপ এলে দেশের ফুটবলপ্রেমীরা নিজেদের জাতীয় দলকে সেখানে দেখতে পান না। এই শূন্যতা থেকে অনেকেই ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার মতো জনপ্রিয় দলকে নিজেদের ‘দ্বিতীয় দল’ হিসেবে বেছে নেন। পরিবারের বড়দের এই আবেগ ও সমর্থন শিশুদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। তারা ছোটবেলা থেকেই বাবা-মা, ভাই-বোন বা আত্মীয়দের অনুসরণ করে নির্দিষ্ট একটি দলের প্রতি অনুরাগ গড়ে তোলে এবং ধীরে ধীরে সেই দলের নিবেদিত সমর্থকে পরিণত হয়।

পরিচয়ের একটি অংশ হয়ে ওঠা
অনেক শিশুর কাছে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার সমর্থক হওয়া শুধু ফুটবল ভালোবাসার বিষয় নয়, বরং এটি তাদের একটি বিশেষ পরিচয়ে পরিণত হয়। কেউ গর্ব করে নিজেকে ব্রাজিলের সমর্থক বলে পরিচয় দেয়, আবার কেউ আর্জেন্টিনার ভক্ত হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে। স্কুল, খেলার মাঠ কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় এই পরিচয় তাদের আলাদা গুরুত্ব ও অবস্থান তৈরি করে। একই দলের সমর্থকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, আবার প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকদের সঙ্গে মজার তর্ক-বিতর্কও চলে। ফলে একটি দলের প্রতি তাদের আবেগ, আনুগত্য ও সমর্থন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে এবং সময়ের সঙ্গে তা তাদের ব্যক্তিত্বের অংশে পরিণত হয়।

উৎসবের আনন্দে অংশগ্রহণ
বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে এক অনন্য উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যার অন্যতম আনন্দভোগী হলো শিশুরা। রাস্তাঘাট, বাড়ির ছাদ ও অলিগলিতে প্রিয় দলের পতাকা টানানো, দলের জার্সি পরে ঘুরে বেড়ানো, পরিবারের সঙ্গে খেলা দেখা এবং বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল নিয়ে আলোচনা করা তাদের কাছে দারুণ আনন্দের বিষয়। অনেক শিশু হয়তো কোনো দলের ইতিহাস, কৌশল বা খেলোয়াড়দের সম্পর্কে খুব বেশি জানে না, কিন্তু বিশ্বকাপকে ঘিরে তৈরি হওয়া উৎসবের আবহ তাদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। তাই অনেক সময় তারা খেলার বিশ্লেষণের চেয়ে এই আনন্দ-উৎসবের অংশ হওয়ার জন্যই কোনো একটি দলকে সমর্থন করে এবং সেই সমর্থনের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্বকাপ উন্মাদনার সঙ্গে যুক্ত রাখে।

বাংলাদেশের শিশুরা ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে শুধুমাত্র ফুটবল বোঝার কারণে নয়; বরং পরিবার, সমাজ, বন্ধু, মিডিয়া, তারকা খেলোয়াড়, রঙিন জার্সি এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রভাবে। অনেক ক্ষেত্রে তারা দল সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনেও সমর্থক হয়ে যায়। তবে এটিকে নেতিবাচকভাবে দেখার কারণ নেই। বরং ফুটবলের প্রতি এই আগ্রহ শিশুদের খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করে, সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলে এবং আনন্দ ভাগাভাগি করার সুযোগ সৃষ্টি করে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ