ব্যক্তিগত তথ্য পাচার হচ্ছে কী? বগুড়ায় শুধু ফেস ভেরিফিকেশনই নয়, নেয়া হয় পাসপোর্টের ছবিও
পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পাওয়ার কথা ছিল হাসেন আলীর। টাকার প্রয়োজনও ছিল তার। স্ত্রী আমেনা বেগম ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। পাসপোর্টও করেছিলেন স্বামী-স্ত্রী দুজন। কিন্তু অর্থের অভাবে শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি।
মাস তিনেক আগে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার রহিমাবাদ এলাকার ২৫ বছর বয়সী সৈকত ইসলাম ও মামুন নামে তার এক সহযোগী হাসেনকে বললেন, তাদের দুজনের পাসপোর্টের ছবি দিলেই পাওয়া যাবে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা। অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার কথা ভেবে রাজি হয়ে গেলেন হাসেন আলী।
একই উপজেলার ডেমাজানি ব্রিজের কাছে একটি গুদামে তাকে ও তার স্ত্রীকে নিয়ে যান সৈকত ও মামুন। সেখানে দুজনের ছবি তোলা হয়। করা হয় ফেস ভেরিফিকেশন। নেওয়া হয় স্বামী-স্ত্রীর পাসপোর্টের ছবিও। কাজ শেষে টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো টাকা না দিয়েই তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেই ঘটনার মাস তিনেক হলেও এখনো তাকে টাকা দেননি সৈকত।
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার রহিমাবাদ গ্রামের পান ব্যবসায়ী হাসেন এখন শুধু টাকার অপেক্ষায় নেই। তার আশঙ্কা নিজের ও স্ত্রীর পাসপোর্টের ছবি, মুখের ছবি এবং ফেস ভেরিফিকেশনের তথ্য কোথায় গেল?
হাসেন আলীর এই গল্প বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে আরও কয়েকজনের কাছ থেকে। তাদের কেউ কেউ পেয়েছেন সামান্য কিছু টাকা, কেউ পাননি কিছুই। সবার অভিযোগেই রয়েছে ছবি, পাসপোর্টের তথ্য এবং ফেস ভেরিফিকেশন। এ ধরণের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে অবৈধভাবে ব্যক্তিগত ও বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও পাচারের।
মাস দুয়েক আগে আড়িয়া বাজার এলাকার চা দোকানি মোহাম্মদ আলীর কাছ থেকেও ছবি ও পাসপোর্টের ছবি নেন সৈকত। বিনিময়ে তাকে প্রায় এক হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই টাকা আর দেননি সৈকত।
শুধু মোহাম্মদ আলীই নন, তার ছেলে শামীমও এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে জানা গেছে।
শামীম জানান, সৈকতের কথায় পাঁচজনকে সৈকতের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রত্যেকের জন্য ৫০০ টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে এক হাজার টাকা দেন সৈকত।
আড়িয়াবাজারের মিলন হোসেন ও ইলিয়াস হোসেন জানিয়েছেন, মাস তিনেক আগে তাদের পাসপোর্টের ছবি নেওয়ার পাশাপাশি ফেস ভেরিফিকেশন করা হয়। তাদের প্রত্যেককে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার কথা থাকলেও তারা সেই টাকা পাননি।
তাদের অভিযোগ, শুধু তাদেরই নয়, এভাবে আরও অনেক মানুষের পাসপোর্টের ছবি সংগ্রহ করেছেন সৈকত ও মামুন। এছাড়াও ভোটার আইডি কার্ড নেয়াসহ ফেস ভেরিফিকেশন করা হয়।
গত ১৯ জুলাই সৈকত ইসলাম ও তার তিন সহযোগী তিন স্কুলছাত্রকে কৌশলে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান বলে অভিযোগ ওঠে। সৈকতের বাড়িতে নিয়ে তাদের স্কুলের পোশাক পরিবর্তন করিয়ে ছবি তোলাসহ ফেস ভেরিফিকেশন করা হয়।
এ ঘটনার পরদিন ২০ জুলাই ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক শাজাহানপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগের পর ২১ জুলাই পুলিশ সৈকতকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। ওই সময় নিজের অবৈধ কার্যকলাপের কথা স্বীকার করেন সৈকত। সেইসাথে ভবিষ্যতে আর এ ধরনের কাজ করবেন না বলে মুচলেকা দেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে সৈকত ইসলাম ভিউজ বাংলাদেশকে জানান, তিনি অনলাইনে অবৈধভাবে পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজ ও ফেস ভেরিফিকেশনের কাজ করতেন। তবে পুলিশ একবার তাকে থানায় ধরে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে তিনও এসব কর্মকাণ্ডে আর জড়িত নেই বলে তার দাবি।
তবে স্থানীয় কয়েকজন জানান, সৈকত এখনো অনলাইনে অবৈধ কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছেন। এখন খুব গোপনে এলাকার বাহির থেকে লোকজন নিয়ে আসেন সৈকত।
গত ২১ সেপ্টেম্বর সকালে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার মহিপুর কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯ শিক্ষার্থীকে ডেকে নেওয়া হয়। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় শাজাহানপুরের রহিমাবাদ এলাকার একটি পরিত্যক্ত খামারে।
সেখানে অবৈধভাবে তাদের ফেস ভেরিফিকেশন করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শেরপুর থানা পুলিশের অফিসার্স (ওসি) এসএম মঈনুদ্দিন ভিউজ বাংলাদেশকে জানান, স্কুল শিক্ষার্থীদের ছবি তোলা ও ফেস ভেরিফিকেশনের ঘটনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় খুব শিগগিরই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এ ঘটনায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই খামারে শুধু ২১ সেপ্টেম্বরই নয়, গত তিন মাস ধরে বিভিন্ন বয়সী মানুষকে নিয়ে আসা হচ্ছে। তাদের মধ্যে স্কুলশিক্ষার্থীরাও আছে। খামারে তাদেরকে নিয়ে অল্প সময়ের ভিডিও ধারণ করা হত। এরপর করা হতো ফেস ভেরিফিকেশন।
তাদের নিয়ে আসা ব্যক্তিরা পেতেন মাথাপিছু ৫০০ টাকা করে। সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের দেওয়া হত ১০০ থেকে ২৫০ টাকা। পরিত্যক্ত ওই মুরগীর খামারে অবৈধভাবে ছবি তোলা ও ফেস ভেরিফিকেশনের কাজ করেন রহিমাবাদ এলাকার বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী সাব্বির হাসান রাকিব। তিনি অনলাইনে অবৈধ এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ২০২২ সাল থেকে জড়িত।
সাব্বির হাসান রাকিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি স্বীকারও করেন।
সাব্বির ভিউজ বাংলাদেশকে জানিয়েছিলেন, প্রায় তিন মাস ধরে একটি অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের ফেস ভেরিফিকেশন করাচ্ছেন তিনি।
সাব্বিরের দাবি, প্রতিটি ফেস ভেরিফিকেশনের জন্য তিনি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত পান। আর যারা লোকজনকে সেখানে নিয়ে আসেন, তাদের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়।
তবে এ বিষয়ে আউটসোর্সিং এর কাজ করা একজন জানান, এসব তথ্য অনলাইনে দিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট খুললেও ১৫ থেকে ১৬ ডলার পর্যন্ত পাওয়া যায়।
ফেস ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে কী করা হয়-জানতে চাইলে সাব্বির হাসান রাকিব জানিয়েছিলেন, ‘বিগপে’ নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে ফেস ভেরিফিকেশন করে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে দেশের বাইরে থেকে অনলাইনে কেনাকাটা করা হয়।
এ ব্যাপারে বগুড়ার আইটি বিশেষজ্ঞ মিল্লাত চৌধুরী জানান, বায়োমেট্রিক তথ্য ডিপ ওয়েব ও ডার্ক ওয়েবে বিক্রির ঝুঁকি রয়েছে। এসব তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি ও সাইবার অপরাধ করা হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের বায়োমেট্রিক তথ্য সাইবার অপরাধীদের হাতে গেলে ভবিষ্যতে তাদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। সেইসাথে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মতামত দিন