ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
মাঠের প্রচারণায় এগিয়ে বিএনপি, অনলাইনে জামায়াত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অংশগ্রহণকারী সব দলের প্রচারণা এখন তুঙ্গে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে মাঠে নেমে প্রচার-প্রচারণা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করেছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে মাঠ-পর্যায়ের প্রচারণায় দলগতভাবে বিএনপি অনেকটাই এগিয়ে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় নেতারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একযোগে বড় বড় সমাবেশ ও জনসভা এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন এলাকায় পথসভা ও সাংগঠনিক সভা করছে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছে। এর বাইরে জামায়াতে ইসলামীও ভোটের মাঠে ধারাবাহিকভাবে সক্রিয় রয়েছে। দলটি বিভিন্ন এলাকায় জনসংযোগ, কর্মীসভা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অনলাইনে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণায় দলটি সবার থেকে এগিয়ে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি (জাপা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ ও এনসিপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলও নিজ নিজ শক্ত ঘাঁটিতে প্রচারণা চালাচ্ছে।
মাঠের প্রচারণায় এগিয়ে বিএনপি: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মাঠ-পর্যায়ের তৎপরতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বড় সমাবেশ, জনসভা, পথসভা ও সাংগঠনিক বৈঠকের মাধ্যমে বিভিন্ন দল নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বর্তমানে মাঠ-পর্যায়ের প্রচারণায় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় নেতারা বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে নিয়মিত কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। বিএনপির প্রচারণার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- বিভাগীয় ও জেলা শহরে বড় জনসভা ও সমাবেশ, নিয়মিত পথসভা ও গণসংযোগ কর্মসূচি, সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে ঘাঁটি পুনর্গঠনের চেষ্টা।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সমাবেশ ও প্রচারণা
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় সমাবেশ, জনসভা ও প্রচারণা কর্মসূচি চালাচ্ছেন। নির্বাচন ঘিরে তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জনসংযোগ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি জোরদার করছেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বরিশাল নগরীর বেলস পার্ক মাঠে অনুষ্ঠিত বড় জনসভায় তিনি বক্তব্য দেন। সমাবেশে তিনি জামায়াতকে ‘গুপ্ত সংগঠন’ আখ্যা দিয়ে বলেন, দলটি নতুন জালেম রূপে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে। এ সময় সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে থাকার আহ্বান জানান। একই দিন তিনি ফরিদপুরে সমাবেশে যোগ দেন। এদিকে, দক্ষিণাঞ্চল ও খুলনা বিভাগে বিএনপির প্রচারণা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া তারেক রহমান চট্টগ্রাম নগরীর পোলো গ্রাউন্ডে আয়োজিত জনসভায় অংশ নেন। সেখানে তিনি চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জনগণকে আন্দোলনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলেও প্রচারণা চালিয়েছেন তারেক রহমান। তিন দিনের সফরে তিনি রাজশাহী ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় কর্মসূচিতে অংশ নেন। এ সফরে রাজশাহী, নওগাঁ ও বগুড়াসহ একাধিক এলাকায় সমাবেশ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালান।
এদিকে সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরুর পর তিনি ওই বিভাগের একাধিক এলাকায় তিনি সমাবেশ করেন। পাশাপাশি নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় এরই মধ্যে তিনি সমাবেশ ও পথসভা করেছেন। দলীয় নেতারা বলছেন, নির্বাচনের প্রচারণার শেষ দিন পর্যন্ত তারেক রহমান আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় জনসভা করবেন।
অনলাইন প্রচারণায় এগিয়ে জামায়াতে ইসলামী
মাঠে প্রচারণায় জামায়াতে ইসলামীও ধারাবাহিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। তবে তাদের কর্মসূচি তুলনামূলকভাবে বেশি সাংগঠনিক সভা, কর্মীসভা ও সীমিত জনসংযোগকেন্দ্রিক। বড় বড় সমাবেশ দলটি কম করছে। দলটির আমির শফিকুর রহমান বিভিন্ন জেলায় প্রচারণা চালাচ্ছেন। সংগঠনিক শক্তি বেশি থাকা নির্দিষ্ট কিছু জেলায় জামায়াত ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে। দলটি বড় জনসভার চেয়ে নেটওয়ার্কভিত্তিক প্রচারণাতে জোর দিচ্ছে এবং ধীরে ধীরে তা বেড়েই চলছে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের প্রচারণা শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নেই, অনলাইন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অনলাইনভিত্তিক প্রচারণায় বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (সাবেক টুইটার) ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জামায়াতের কনটেন্ট নিয়মিত ও সংগঠিতভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। দলটির পক্ষ থেকে ভিডিও বার্তা, গ্রাফিক পোস্ট, বক্তব্যের ক্লিপ ও ব্যাখ্যামূলক কনটেন্টের মাধ্যমে রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা হচ্ছে। জামায়াতের অনলাইন প্রচারণার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত সমন্বিত ডিজিটাল কনটেন্ট, তরুণ ও প্রবাসী ভোটারদের লক্ষ্য করে নিয়মিত প্রচার, বক্তব্যের পাশাপাশি আইডিয়া ও ইস্যুভিত্তিক উপস্থাপন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রজন্মের ভোটারদের একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর হওয়ায় অনলাইন প্রচারণা নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সেই বিবেচনায় জামায়াতে ইসলামী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে বিএনপি মাঠ-পর্যায়ের কর্মসূচিতে অনেক বেশি সক্রিয় হলেও অনলাইন প্রচারণায় তাদের উপস্থিতি এখনও সেভাবে সংগঠিত নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনলাইন কনটেন্ট মাঠের কর্মসূচিকেন্দ্রিক হলেও নিয়মিত ও পরিকল্পিত ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। যেখানে জামায়াত অনেক এগিয়ে।
প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে বিভাগভিত্তিক প্রচারণার চিত্র
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন বিভাগে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠ-পর্যায়ের তৎপরতা বাড়ছে। কোথাও বড় জনসভা, কোথাও পথসভা ও সাংগঠনিক বৈঠকের মাধ্যমে প্রচারণা এগোচ্ছে। বিভাগভেদে প্রচারণার ধরন ও গতি ভিন্ন হলেও সামগ্রিকভাবে বিএনপির মাঠে উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। জামায়াতও সর্বাত্মক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা বিভাগ
ঢাকা বিভাগে রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ঢাকা মহানগরীর পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ, ফরিদপুরসহ পুরো বিভাগের সবগুলো জেলায় নিয়মিত পথসভা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিএনপির ও জামায়াতের পাশাপাশি অন্যান্য দলগুলো এসব এলাকায় জনসংযোগ কার্যক্রম জোরদার করেছে। মহানগরভিত্তিক কর্মসূচির পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক সভাও হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিভাগ
চট্টগ্রাম নগরী ও কুমিল্লা অঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারণায় তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় বিএনপি। তারা বড় সমাবেশের পাশাপাশি ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে সভা-সমাবেশ করছে। চট্টগ্রাম বিভাগের সবকটি জেলায় বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য জনসমাগম করছেন এবং ঘরে ঘরে ভোট চাইছেন। জেলার হিসেবে দলগতভাবে জামায়াত কুমিল্লায় সবচেয়ে বেশি প্রচারণা চালাচ্ছে।
খুলনা বিভাগ
খুলনা বিভাগে খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ অঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারণা এখন তুঙ্গে। খুলনা বিভাগীয় শহরকে কেন্দ্র করে বড় সমাবেশের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত।
রাজশাহী বিভাগ
রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া ও পাবনা এলাকায় নিয়মিত জনসভা ও কর্মীসভা করছে বিএনপি। উত্তরাঞ্চলে দলটি সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠনে জোর দিচ্ছে। ছোট, বড় ও মাঝারি সমাবেশের পাশাপাশি গ্রামভিত্তিক জনসংযোগ কার্যক্রম চালাচ্ছে। জামায়াতও এই বিভাগে তাদের প্রচারণা ব্যপকভাবে চালাচ্ছেন।
রংপুর বিভাগ
রংপুর বিভাগে রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাট অঞ্চলে প্রচারণা ধীরে ধীরে গতি পাচ্ছে। বড় সমাবেশের তুলনায় এখানে বেশি হচ্ছে কর্মীসভা ও স্থানীয় পর্যায়ের বৈঠক। তবে নির্বাচনী সময় ঘনিয়ে এলে বড় কর্মসূচির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে দলীয় সূত্র জানায়।
সিলেট বিভাগ
সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ এলাকায় নির্বাচনী মাঠের প্রচারণায় বিএনপি ও জামায়াতসহ অংশগ্রহণকারি সবগুলো দলই সক্রিয়। রাত-দিন পথসভা ও জনসভা করছে সব দল। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতে ও বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড় ও হাওর এলাকায় বিএনপি ও জামায়াত ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে। এই বিভাগে এ দুই দলেও শক্তির পার্থক্যও তুলনামূলক কম।
ময়মনসিংহ বিভাগ
এই বিভাগের নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলায় ব্যাপাক প্রচারণা চালাচ্ছে বিএনপি। দলটির নেতাকর্মীরা দিন রাত চষে বেড়াচ্ছে প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে। ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনেও প্রচারণায় এগিয়ে দলটি। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীও এই বিভাগের সব আসনেই ব্যাপক প্রচারণায় নেমেছে। তবে তাদের জনবল বিএনপির তুলনায় কিছুটা কম বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
বরিশাল বিভাগ
নদী বিধৌত বরিশাল বিভাগে বরিশাল শহর ও আশপাশের জেলাগুলোতে বড় জনসভা ও সমাবেশের মাধ্যমে প্রচারণা জোরদার করেছে বিএনপি। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এই বিভাগ বরাবরই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই এই বিভাগের ৬টি জেলায় ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে বিএনপি। তবে জামায়াতও বরিশাল বিভাগের সব জেলায় ছোট-বড় সমাবেশ ও পথসভা করছে। ভোট চাইছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে। দলটির বেশি প্রচারণা দেখা যাচ্ছে পিরোজপুর ও ভোলায়। যদিও বরিশাল বিভাগে জামায়াতের প্রচারণা বিএনপির তুলনায় কিছুটা কম।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে