Views Bangladesh Logo

ভিসা কূটনীতিতে ব্যর্থ বাংলাদেশ?

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

গে মুসলিম ঐতিহ্য সমৃদ্ধ দেশ উজবেকিস্তানের ই-ভিসা পাওয়া অত্যন্ত সহজ ছিল বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য। অনলাইনে আবেদন করে ৩০ মার্কিন ডলার দিয়ে সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা পাওয়া যেত ঘরে বসেই। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য ই-ভিসা সুবিধা স্থগিত রেখেছে উজবেকিস্তান। স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের কারণে দেশটির ই-ভিসার আবেদনে যেসব দেশের তালিকা আছে সেখানে বাংলাদেশের নাম নেই। আজ ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে এসেও বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য ই-ভিসার সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেনি উজবেকিস্তান সরকার। অথচ তাসখন্দে বাংলাদেশের দূতাবাস আছে এবং নিয়মিতভাবেই সেই বাংলাদেশী মিশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে উজবিকস্তানের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের বৈঠক, আলাপ-আলোচনা, যৌথ অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রভৃতি খবরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি কূটনৈতিক বিটের সাংবাদিকরা নিয়মিত পাচ্ছেন! বেশ বোঝা যাচ্ছে যাচ্ছে, বাংলাদেশ মিশনের কূটনীতিকরা নানা কার্যক্রমে তৎপর হলেও ভিসা কূটনীতিতে সফল হতে পারছেন না।

শুধু উজবেকিস্তান নয়, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাস থেকে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রায় বন্ধ করেছে ভিয়েতনাম। খুব গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পর্যায়ের কিংবা ব্যবসায়িক ফোরামের ইভেন্ট না হলে ভিসা দিচ্ছে না ভিয়েতনাম। অথচ কয়েকদিন আগে ঢাকাস্থ ভিয়েতনাম দূতবাসে সে দেশের রাষ্ট্রদূত কয়েকজন সাংবাদিককে বলেছেন, ঢাকা-হ্যানয় সরাসরি ফ্লাইট চালুর প্রক্রিয়া চলছে। হ্যানয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেও বাংলাদেশ-ভিয়েতনাম সম্পর্কের উন্নতির নানা খবর আসছে, কিন্তু বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য আগের মত সহজে ট্যুরিস্ট ভিসা চালুর কোন উদ্যোগই নেই।

শ্রীলংকায় আগে অন অ্যারাইভাল ভিসা ছিল বাংলাদেশী নাগরিকেদের জন্য। এখন আগাম ২০ মার্কিন ডলার দিয়ে ইটিএ (ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন) নিশ্চিত করে তারপর ফ্লাইটের টিকিট কাটতে হয়। আগে তালিকাভুক্ত ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করে থাইল্যান্ডের ট্যুরিস্ট ভিসা পাওয়া যেত তিন থেকে চার কার্যদিবসের মধ্যে। এখন ই-ভিসা চালু করেছে। তবে সেই ভিসার আবেদন করতে হয় নূন্যতম ৪৫ দিন আগে। আবেদনের সঙ্গে ফ্লাইটের নিশ্চিত টিকেটের কপি বা ইটেনারি যুক্ত করতে হয়। অর্থাৎ আপনার ভিসা নিশ্চিত হওয়ার আগেই প্লেনের টিকেট কাটতে হবে। ভিসা না পেলে কিছু টাকা গচ্চা যাবে, এই প্রস্ততি নিয়েই ভিসার আবেদন করতে হবে। অনেক আগে থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের জন্য শেনজেন ভিসা, নিউজিল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়ার মত নাক উঁচু নীল রক্তের দেশের ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রে আগাম নিশ্চিত প্লেনের টিকেট সংযুক্ত করতে হত। এখন ইউরোপ-অষ্ট্রেলিয়ার চোখে বাংলাদেশকে দেখছে থাইল্যান্ডও। মালয়েশিয়ার ভিসা কিছুটা সহজে পাওয়া গেলেও কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে নেমে ইমিগ্রেশন পার হতে পারবেন কি’না সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকেই যায়।

২০২১ সাল পর্যন্ত কোন ধরনের ভিসা ছাড়াই বা এনভিআর সুবিধায় (নো ভিসা রিকোয়ার্ড) শুধুমাত্র পাসপোর্ট নিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় প্রবেশ করতে পারতেন বাংলাদেশী নাগরিকরা। ২০২২ সালে সেই সুবিধা বন্ধ হয়ে গেল। এখন ইন্দোনেশিয়ার ভিসা একেবারেই সোনার হরিণ। ২৬ হাজার টাকা দিয়ে ভিসার আবেদন করতে হয়। তারপরও ভিসা না পাওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যের ভিসা কখনই সহজ ছিল না বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য। সর্বশেষ ট্রাম্প প্রশাসন ভিসা প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নামও অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ তালিকায় উজবেকিস্তানও আছে। আগেই বলেছি উজবেকিস্তানও বাংলোদেশী নাগরিকদের জন্যে ই-ভিসা বন্ধ করেছে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে নেপাল, মালদ্বীপ এবং ভুটানে অন অ্যারাইভাল ভিসায় এখনও যেতে পারছেন বাংলাদেশী নাগরিকেরা। তবে ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে আগের চেয়ে বেশ শক্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বাংলাদেশী নাগরিকেদের। বিশেষ করে প্রথমবার ভ্রমণে যাওয়া বাংলাদেশী নাগরিকদের চৌদ্দগুষ্টির খোঁজ ভালভাবেই নেওয়া হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের শীতলতা যেভাবে জমাট বরফে পরিণত হচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ভিসা কূটনীতি নিয়ে আলোচনা না করাই ভাল। তবে বর্তমান অন্তর্বতীকালীন সরকারের আমলে পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য ভিসা ফি মওকুফ করেছে। অনলাইনে আবেদনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে ভিসা পাচ্ছেন বাংলাদেশী নাগরিকেরা। কিন্তু এনভিআর চালু করেনি। চীন আগের চেয়ে কম সময়ে ও সহজে ভিসা দিচ্ছে। কিন্তু অন অ্যারাইভাল ভিসা কিংবা এনভিআর সুবিধা চালু করেনি। অন্য অনেক দেশের জন্য অন অ্যারাইভাল ভিসা, ইলেকট্রনিক ভিসা চালু থাকলেও পাসপোর্টে স্টিকার ভিসা লাগিয়েই এখনও চীনে যেতে হয় বাংলাদেশী নাগরিকদের। বিভিন্ন দেশ অর্থাৎ, সার্বিকভাবে বলতে গেলে, গত দেড় বছরে ভিসা কূটনীতিতে ব্যর্থ হয়েছে বা অনেক বেশী পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।

দু’টি দেশের মধ্যে ভিসা প্রক্রিয়া তখনই সহজ হয় যখন সেই দুই দেশের সম্পর্কে মধ্যে আস্থা ও শ্রদ্ধার বিষয়টি মজবুত থাকে। যেমন ল্যাটিন আমেরিকায় স্পেনের যেসব উপনিবেশ ছিল, সেসব দেশের নাগরিকেরা বিনা ভিসায় স্পেন যেতে পারেন, এমনকি সম্পত্তিও কিনতে পারেন। কারন স্পেনের সঙ্গে এক সময়ের উপনিবেশ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের মত দেশের সম্পর্কে আস্থা ও শ্রদ্ধার বিষয়টি দৃঢ়। বর্তমানে যুদ্ধাবস্থার কারণে ইউক্রেনের নাগরিকদের রাশিয়ায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে পুতিন প্রশাসন। এ ছাড়া এক সময়ের সোভিয়েত কনফেডারেশনে থাকা দেশের নাগরিকেরা বিনা ভিসায় রাশিয়া যেতে পারেন।

অন্যদিকে এক সময়ে ব্রিটিশ উপনিবেশে থাকা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের নাগরিকদের ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ নীতি কি? ভারতের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত সহজ হলেও পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের রাঘব-বোয়ালদের মধ্যেও কারও কারও যুক্তরাজ্যের ভিসা পেতে রীতিমত ঘাম ছুটে যায়। কারণ বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা ও শ্রদ্ধার বিষয়টি দাপ্তরিক নথি-পত্র বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে থাকলেও প্রকৃত অর্থে সেটা অনুপস্থিত, ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের অতি রক্ষণশীল আচরণই সেটার প্রমাণ। একইভাবে ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রে ইইউভুক্ত দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের আচরণই প্রমাণ করে দেয় এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা এবং শ্রদ্ধার বিষয়টি কতটা গুরুত্বহীন।

অবশ্য কূটনৈতিক সম্পর্কে আস্থা ও শ্রদ্ধার বিষয়টি নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় নির্ধারিত হওয়ার সুযোগ নেই। দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় কিংবা বহুপক্ষীয় সম্পর্ক মানেই সেখানে দ্বিপক্ষীয় কিংবা বহুপক্ষীয় সক্রিয় স্বার্থের বিষয় আছে। অতএব যে দেশের মধ্যে স্বার্থের দূরত্ব যত কম কূটনৈতিক সম্পর্কে আস্থার সম্পর্কও তত দৃঢ় হয়। স্বার্থের দূরত্ব যত বাড়ে আস্থা তত কমে যায়। যেমন দক্ষিণ এশিয়ায় দৃশ্যত, পাকিস্তান চীনের সবচেয়ে বন্ধু রাষ্ট্র। কিন্তু সেই পাকিস্তানের নাগরিকেরাও সে দেশে অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা পায় না। ভারত এবং চীনের অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী হলেও দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের নিদারুন টানা-পোড়েনের জন্য উভয় দেশই কেউ কাউকে অন অ্যারাইভাল বা ভিসামুক্ত প্রবেশের সুবিধা দেয়নি। অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র মালদ্বীপের নাগরিকেরা চীনে ৩০ দিন মেয়াদে ভ্রমণের জন্য ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ পান। অর্থাৎ, মালদ্বীপের সঙ্গে চীনের সম্পর্কে স্বার্থের গভীরতা অনেক বেশী, তাই আস্থার সম্পর্ক সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মজবুত।

এখন ভিসা কূটনীতিতে বাংলাদেশ ব্যর্থ কি’না সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা সব সময়ই বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী নাগরিকদের ভিসা পাওয়া নিয়ে সীমাবদ্ধতা কিংবা জটিলতার জন্য মানব পাচারের উদাহরণগুলো সামনে নিয়ে আসেন। এটা অবশ্যই একটা যুক্তিযুক্ত ও জোরালো উদাহরণ। এক সময় শ্রীলংকার ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদাহরণ প্রযোজ্য ছিল। অথচ শ্রীলংকা এখন অদক্ষ জনবলের জায়গায় দক্ষ ব্যবস্থাপক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব সূচকে তাদের পাসপোর্টের সক্ষমতাও বেড়েছে। অথচ আমরা এখনও অদক্ষ শ্রমিকের বাজার খুঁজে গলদঘর্ম হচ্ছি। শ্রীলংকার পররাষ্ট্র দপ্তর যখন গুগল কিংবা মাইক্রোসেফটে কতজন নতুন ব্যবস্থাপক শ্রীলংকা থেকে নিয়োগ করা যাবে সেই দর কষাকষি করছে, তখন আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা তাকিয়ে থাকেন ভূমধ্য সাগরের আবহাওয়ার খবরের দিকে, কখন কোন দুঃসংবাদ আসে!

আজকের দুনিয়ায় একেকজন সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর বিশ্ব দরবারে সে দেশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়ে ওঠেন। শ্রীলংকার কনটেন্ট ক্রিয়েটররা যখন শ্রীলংকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট স্পট, আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির চমকপ্রদ দিকগুলো নিয়ে অসাধারণ মেধা সম্পন্ন কনটেন্ট তৈরি করছেন, তখন বাংলাদেশী কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এমন ভাষায় গালিগালাজের প্রতিযোগিতা করছেন, যে ভাষা অনুবাদ করতে গুগলও লজ্জা পায়! কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই দুনিয়ায় অনলাইন প্লাটফর্মে অজানা বা অচেনা ভাষা বলে আর কিছু নেই। মুহুর্তেই একটি ভাষার কনটেন্ট শত ভাষায় অনুবাদ হয়ে যায়। অতএব এই রুচিহীন গালিবাজ কনটেন্ট ক্রিয়েটররা আমাদের দেশে যখন ভীষণ জনপ্রিয় হয়, তখন আমাদের শিক্ষা-রুচি সম্পর্কে বিশ্বের কাছে কোন বার্তা যায়, সেটা বুঝতে বাকী থাকার কথা নয়। একটি শিক্ষিত জাতি তৈরি না করার ব্যর্থতা, একটি প্রজন্মের মুখের ভাষা জঘন্য গালিগালাজে পরিণত করার এই অবস্থা আমাদের জাতীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতা, জাতীয় ব্যর্থতা। অতএব ভিসা কূটনীতিতে ব্যর্থতার জন্য পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের উপর দোষ চাপিয়ে আমরা সবাই দায় এড়ানোর চেষ্টা করতে পারি, দায়িত্ব এড়াতে পারি না।

রাশেদ মেহেদী, সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ