তিল ধারণের ঠাঁই নেই কারাগারে, ১০০ জনের জায়গায় বন্দী ২২৬
কারাগারের দেয়াল বন্দীদের আটকে রাখে, কিন্তু ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভিড় কেড়ে নেয় স্বস্তির শেষটুকুও। যেখানে থাকার কথা বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষা, সেখানে এখন ঠাঁই পাওয়াই যেন এক নীরব সংগ্রাম। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি মানুষের ভারে কারাগারগুলো আজ শুধু বন্দিত্বের নয়, হয়ে উঠেছে মানবিক সংকটেরও এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
চার দেয়ালের ভেতর একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস, মাথা গোঁজার সামান্য জায়গা কিংবা সুস্থভাবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম পরিবেশ—সবই যেন ক্রমে বিলাসিতা হয়ে উঠছে। দেশের কারাগারগুলোতে বন্দীর ভিড় এতটাই বেড়েছে যে, ১০০ জনের থাকার জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে ২২৬ জনকে।
ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের (ডব্লিউপিবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরে দেশের সব কারাগারে গড়ে ১০০ জনের জায়গায় বন্দী ২২৬ জন। তাদের প্রায় তিনজনের দুজনেরই বিচার শেষ হয়নি। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দীর চাপে দেশের কারাগারগুলোতে বাড়ছে মানবিক সংকট; দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া সেই সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কারাগারের ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দীর হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। সরকারি হিসাবে দেশের কারাগারগুলোতে ৪৫ হাজার ১৮৬ জন বন্দী রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ গত সেপ্টেম্বরের হিসাবে সেখানে বন্দী ছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ১৮০ জন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার ২২৬ দশমিক ১ শতাংশ বন্দীকে জায়গা দিতে হচ্ছে কারাগারগুলোতে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কারা অধিদপ্তরের হিসাবে বন্দীর সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৬ হাজারে।
যুক্তরাজ্যের বার্কবেক, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ইনস্টিটিউট ফর ক্রাইম অ্যান্ড জাস্টিস পলিসি রিসার্চ পরিচালিত ডব্লিউপিবি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগারসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দীর দিক থেকে বাংলাদেশের কাছাকাছি রয়েছে শ্রীলঙ্কা, যেখানে ধারণক্ষমতার ২১৬ শতাংশ বন্দী রয়েছেন।
পাকিস্তানে এই হার ১৬৩ শতাংশ, নেপালে ১৪৪ শতাংশ, ভারতে ১১৩ শতাংশ এবং মিয়ানমারে ১১২ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে, যেখানে ধারণক্ষমতার ৬১৭ শতাংশ বন্দী রয়েছেন। বিপরীতে নাউরুতে এই হার মাত্র ১৪ শতাংশ।
বাংলাদেশের কারাগারে বন্দীর সংখ্যা বৃদ্ধির ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০০০ সালে দেশে বন্দী ছিলেন ৬২ হাজার ৬৬৯ জন। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬ হাজার ৮৩৮ জনে। ২০২০ সালে বন্দীর সংখ্যা ছিল ৮৮ হাজার ৮৪ জন। ডব্লিউপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, সরকার পতনের আগের দিন কারাগারগুলোতে বন্দী ছিলেন প্রায় ৮৮ হাজার। ১২ আগস্ট সেই সংখ্যা নেমে আসে ৪৯ হাজারে। এরপর আবার বাড়তে থাকে বন্দীর সংখ্যা।
ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, দেশে সাধারণত ৮০ থেকে ৮২ হাজার বন্দী থাকেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, মাদক, সাইবার অপরাধ ও কিশোর অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার বৃদ্ধির কারণে কারাগারগুলোর ওপর চাপ বেড়েছে বলে জানান তিনি।
তবে সংকটের গভীরে রয়েছে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। ডব্লিউপিবির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কারাগারে মোট বন্দীর ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশ বিচারপূর্ব বন্দী। অর্থাৎ, কারাগারে থাকা প্রতি তিনজনের প্রায় দুজনেরই এখনো বিচার শেষ হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার পাকিস্তানে ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ, ভারতে ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নেপালে ৫৩ শতাংশ। বিচারাধীন বন্দীর হারে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে সান মারিনো, যেখানে সব বন্দীই বিচারাধীন বলে উল্লেখ করেছে ডব্লিউপিবি।
দেশে বর্তমানে ৭৫টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রীয় এবং ৬০টি জেলা কারাগার। ১৭৮৮ সালে ঢাকায় একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে কারাগারব্যবস্থার সূচনা। দুই শতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বন্দীর সংখ্যা ও ধারণক্ষমতার মধ্যে তৈরি হওয়া ব্যবধান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবু তারিক ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দী থাকায় অনেককে মানবেতর পরিবেশে থাকতে হচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে নতুন কারাগার নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান কারাগার সম্প্রসারণও জরুরি। তাঁর মতে, আদালতে একজন বিচারকের ওপর হাজার হাজার মামলা থাকায় বিচার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিচারপূর্ব বন্দীদের ওপর।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম মনে করেন, বিচারক বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ই-জুডিশিয়ারি, বিচারিক কার্যক্রমের স্বয়ংক্রিয়করণ, দেওয়ানি মামলায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ফৌজদারি মামলায় প্লি বার্গেনিং চালু করা গেলে আদালতের চাপ কমতে পারে।
কারাগারের দেয়াল উঁচু করলেই বন্দিত্বের সংকট মেটে না। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পর্যাপ্ত চিকিৎসা, মানসম্মত খাবার এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে বন্দীর ভিড় আরও ঘনীভূত হবে। সবচেয়ে বড় কথা, যাঁদের বিচার এখনো শেষ হয়নি, তাঁদের দিনের পর দিন কারাগারে আটকে থাকার বাস্তবতা নতুন করে প্রশ্ন তোলে বিচারব্যবস্থার গতি ও মানবিকতা নিয়ে। ১০০ জনের জায়গায় যখন ২২৬ জনের ঠাঁই হয়, তখন সংকট শুধু কারাগারের দেয়ালের ভেতরে আটকে থাকে না, তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিচারব্যবস্থার ওপর।
মতামত দিন