Views Bangladesh Logo

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও ঘাটতি

আধুনিক বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন এই পৃথিবীকে আগামী ৬০০ বছরের মধ্যে ধ্বংশ করে দেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবী শুক্র গ্রহের মতো হয়ে যাবে, যেখানে তাপমাত্রা ২৫০ ডিগ্রি ছুঁয়ে যাবে, সালফার বৃষ্টি হবে। আমাদের সামনে এখন বড় বিপদ এই জলবায়ু পরিবর্তন।’

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের যেসব দেশ সবচেয়ে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। দেশটির লাখ লাখ নাগরিক নানা সময়ে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, দাবদাহ ও খরার মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের ৬৫ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে। যেভাবে উষ্ণতা বাড়ছে, তাতে আগামী কয়েক বছরে তিন থেকে চার কোটি মানুষ বাস্তুহারা হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ কতটুকু প্রস্তুত? আর এ ক্ষেত্রে ঘাটতিই বা কী আছে?

বিশ্বের অন্যন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়েছে। বিজ্ঞান ভিত্তিক আবহাওয়া ও জলবায়ুর উন্নততর পূর্বাভাস প্রদানের মাধ্যমে 'রূপকল্প-২০৪১' বাস্তবায়নে ‘বাংলাদেশ আঞ্চলিক আবহাওয়া ও জলবায়ু সেবা প্রকল্প (কম্পোনেন্ট-এ)' চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আবহাওয়া পরিষেবার মান বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনকে প্রাধান্য দিয়ে ১০০ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির কারণে বিশ্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট দুর্যোগও বাড়ছে। দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা ও দৈনন্দিন আবহাওয়া বার্তা জানতে মোবাইলে ‘১০৯০’ নম্বরে টোল ফ্রি সার্ভিস চালু করা হয়েছে। আমাদের সরকার কৃষি-আবহাওয়া পূর্বাভাস ও পরামর্শ সেবার মান উন্নয়নে ৭টি নতুন কৃষি-আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার স্থাপনসহ জোরদার করেছে কৃষি ও আবহাওয়া বিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম। ৫টি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার, ৯টি ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং ১৪টি নদীবন্দরে নৌ-দুর্ঘটনা প্রশমনের লক্ষ্যে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া স্থাপন করা হয়েছে ৩টি স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন। ২টি আধুনিক ডপলার রাডার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। দেশের ১৩টি উপকূলীয় জেলায় স্যাটেলাইট টেলিফোনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গৃহীত এ সকল পদক্ষেপ তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখছে।

১৯৭০ সালে সংঘটিত স্মরণকালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এই দুর্যোগের বিষয়ে আগাম কোনো সতর্কতাই দেয়নি তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। স্বাধীনতার পরপরই ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের লক্ষ্যে কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় দুইটি রাডার স্থাপন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রথমেই আসে ম্যানগ্রোভ বনের সংরক্ষণ। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভের সংরক্ষণের পাশাপাশি পুনরায় বৃক্ষ রোপণ, যেটি পরিবেশকে কার্বনমুক্ত করার পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবেও কাজ করছে। ম্যানগ্রোভ ক্রমবর্ধমান জীববৈচিত্র্য, মাছের আবাসস্থল ও ইকো ট্যুরিজম সুবিধাসহ কিছু অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করে। কিন্তু এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল, কারণ এই ব্যবস্থায় প্রতি বছর প্রায় ৪০ কিলোমিটার উপকূল রেখায় ম্যানগ্রোভ রোপণ করা হচ্ছে। সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবস্থিত ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণে পরবর্তী ৩০ বছরে প্রয়োজন হবে ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি, যা জলবায়ু তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। এছাড়া আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরি করা এবং আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। নিচু জমির চারপাশে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে, যা বন্যা থেকে কৃষি জমি, বাড়িঘর ও অবকাঠামোকে রক্ষা করবে। কৃষিতে নিয়োজিত শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে বিনিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পরবর্তী এক দশকে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ কমাতে ম্যানগ্রোভ দ্বারা সুরক্ষিত নয়-এমন এলাকায় বসবাসকারী ১০ লাখ মানুষকে স্থানান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দুই দশক ধরে সমুদ্রের লোনা পানি নদী, খাল, নালা, বিলে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এছাড়া চিংড়ি চাষি কর্তৃক সমুদ্রের লোনা পানি উপকূলের ভেতরে প্রবেশ করানোর ফলে কৃষি, মৎস্য, গো-খাদ্য, গাছপালা ও বনাঞ্চলের গাছপালার জীবন ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রাণিসম্পদ রক্ষায় অভিযোজন প্রযুক্তি গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযোজন হচ্ছে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানো। জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, সে পরিস্থিতি উত্তরণে গৃহীত কৌশলকে জলবায়ু ঝুঁকি অভিযোজন বলা হয়। এর মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ধারণ, পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কৌশল রপ্ত করা, ব্যবহৃত পানি পুনরায় ব্যবহার, লবণাক্ততা দূরীকরণ, গবাদিপ্রাণী ও পাখির জন্য পানি ব্যবহার। অঞ্চলভিত্তিক দুর্যোগ সহনশীল জাতের গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন সফল করা। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দুর্যোগ সহনশীল জাতের প্রাণী উৎপাদন করা। প্রাণি ব্যবস্থাপনায় যেসব শস্য সরাসরিযুক্ত সেসব শস্যের চাষকে উৎসাহিত করা, ফডার বৃক্ষ ও ফলমূলের চারা রোপণ, দুর্যোগ সহনশীল ঘাসের প্রচলন, অঞ্চলভিত্তিক ঘাস উৎপাদনের প্রযুক্তিগুলো জনসাধারণের মাঝে বিতরণ করা, কৃষি ব্যবস্থাপনার উন্নতি করা, ভূমি ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে বৃক্ষরোপণ।

পুনর্বিন্যাস ও পুনর্বাসন, প্রাণীর উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। চাহিদা মাফিক রাস্তা নির্মাণ, মেরামত এবং অবকাঠামো স্থাপন করা হচ্ছে। দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং যোগাযোগের জন্য আইসিটি ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে।

গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় প্রাণিসম্পদ খাত থেকে সম্ভাব্য গ্রিন হাউস গ্যাসকে রিসাইক্লিং করে পুনঃব্যবহারের প্রচলন করা হবে। যাতে প্রাকৃতিক নির্ভরতাকে কমিয়ে এনে সৌর বিদ্যুৎ বা রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন করা যায়।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (জলবায়ু পরিবর্তন অধিশাখা-১) লুবনা ইয়াসমীন ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, পরিবর্তিত জলবায়ু মোকাবিলায় দুর্যোগ প্রস্তুতি, ঝুঁকি কমানোর জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে, স্থানীয় জনসাধারণকে পূর্ব প্রস্তুতি সম্পর্কে ধারণা প্রদান, আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা প্রদান। আশ্রয়কেন্দ্রে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খাবার ও পানির ব্যবস্থাকরণ; পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেখানে দুর্যোগ ও অভিযোজন বিষয়ে নীতিমালা গ্রহণ করেছে সেগুলো অনুসরণ করা, সাইক্লোন রেজিলিয়েন্ট গৃহ নির্মাণ করা, দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ অভিযোজন বিষয়ে পুস্তিকা প্রণয়ন, জনসাধারণকে দুর্যোগ প্রতিরোধে নেতৃত্ব প্রদান ও সহযোগিতা করা, স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ও সিবিওদের কাজে সম্পৃক্তকরণ, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং মোকাবিলা করার জন্য ভলান্টিয়ার্স গ্রুপ তৈরি করা এবং তাদের সাপোর্ট প্রদানের ব্যবস্থা করা ও বিকল্প জীবিকায়নের ব্যবস্থা করা, যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এছাড়া অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি, গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, বিগত ১০ বছরে ১০৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৩০টি প্রকল্প বাস্তবান, দরিদ্রদের জন্য নগদ অর্থ ও খাদ্য বিতরণের মতো মানবিক কর্মসূচি, কাবিখা কর্মসূচি, ভিজিএফ, বন্যা প্রবণ ও নদী ভাঙন এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, দুর্যোগের আগাম বার্তা পাঠাতে মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার, সচেতনতা ও শিক্ষামূলক ব্যবস্থা, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইস্টিটিউট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়াম (উদ্ভিদ সম্পদের উপর ট্যাক্সোনমিক গবেষণা), বন ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ, ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানির গুণগত মান মনিটরিং, ব্লু-ইকোনমি সংক্রান্ত কার্যক্রম, জীববৈচিত্র ও জীব নিরাপত্তা বিধিমালা প্রণয়ন, শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ইটিপি স্থাপন, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং ও টেকশই অর্থায়ন ইত্যাদি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা বৃদ্ধি এবং আরও ঘন ঘন তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হবে এই বাংলাদেশের-প্রকৃতি। এ হুমকিগুলো দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে এবং লক্ষ লক্ষ লোক বাস্তুচ্যুত হতে পারে, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের তাপমাত্রা বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে। গত ৫০ বছরে গড় তাপমাত্রা ০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে দেশে অতিরিক্ত ১-২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ইতোমধ্যে মানব স্বাস্থ্যের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। যে চরম তাপের সংস্পর্শে পানি শূন্যতা (ডিহাইড্রেশন), ক্লান্তি এবং অন্যান্য তাপ সম্পর্কিত অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উল্লেখযোগ্য এবং এটি কেবল আরও খারাপ হতে থাকবে। উদাহরণস্বরূপ-নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৭০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তাপজনিত মৃত্যুর হার বাড়তে পারে। অভিযোজন না হলে ২০৩০ থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তাপজনিত মৃত্যুর হার প্রতি বছর ২ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। গরমের কারণে আরও কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রচন্ড তাপ ফসলের ক্ষতি করতে পারে, ফলন হ্রাস করতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য কুলিং সিস্টেমের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যার ফলে উচ্চতর শক্তি খরচ এবং গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন হয়। উচ্চ তাপমাত্রা জল বাষ্পীভবনের কারণ হতে পারে, যার ফলে খরা এবং পানীয় জলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা কৃষি, পানীয় জল সরবরাহ এবং স্যানিটেশনকে প্রভাবিত করতে পারে।

বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়নের সম্মুখীন হচ্ছে। আরও বেশি মানুষ শহরে চলে যাচ্ছে, বিশেষ করে ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরে। এ নগরায়ন তাপ দ্বীপের প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, যেখানে বিল্ডিং এবং রাস্তা নির্মাণের মতো মানুষের ক্রিয়াকলাপের কারণে শহুরে অঞ্চলগুলি গ্রামীণ অঞ্চলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি গরম হয়। গরম তাপমাত্রা ফসলের ক্ষতি করতে পারে, কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্য নিরাপত্তা হ্রাস করতে পারে। সামগ্রিকভাবে গরম তাপমাত্রার মতো চরম আবহাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উল্লেখযোগ্য এবং জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন হ্র্রাস, টেকসই ভূমি ব্যবহার অনুশীলন প্রচার এবং শহুরে অবকাঠামোর উন্নতির মতো সমাধানগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো হ্রাস করতে এবং এর প্রভাবগুলোর স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি রাষ্ট্র। জনগণকে সতর্ক করতে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হিটওয়েভ আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়নি। উন্নত রাস্তা, সেচ ব্যবস্থা এবং পানি সঞ্চয় সুবিধার মতো ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ চরম তাপের প্রভাব হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে। এ ব্যাপারে সরকার এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে স্বীকার করেছেন জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র।

দরিদ্র দুর্বল জনগোষ্ঠীকে বৈদ্যুতিক ফ্যানের মতো কুলিং সিস্টেমগুলোতে সুযোগ সরবরাহ করা তাপ-সম্পর্কিত অসুস্থতার ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। জ্বালানি শক্তি দক্ষতা এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির মতো টেকসই অনুশীলনগুলো প্রচার করে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো প্রশমিত করতে পারে এবং চরম আবহাওয়ার ইভেন্টগুলোর ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।

এ ব্যপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিল ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন ও প্রশমন কৌশল উভয় দিকে মনোনিবেশ করা অপরিহার্য। অভিযোজন ব্যবস্থা যেমন পানীয় জল ও জল ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং কৃষি অনুশীলন বাড়ানো, জনগণকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে। একই সময়ে প্রশমন কৌশল যেমন পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎস প্রচার এবং গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের পরিমাণ সীমাবদ্ধ করতে এবং এর প্রভাবগুলোর তীব্রতা হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু সরকার এ ব্যাপারে এখনো উদাসীন।

তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বেশ কিছু টেকসই সমাধান রয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে- সাইক্লোন এবং বন্যার মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো মোকাবিলা করতে পারে এমন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করা তাদের প্রভাবগুলো হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বন্যা এবং উচ্চ বাতাস প্রতিরোধী বাড়ি এবং অন্যান্য বিল্ডিং নির্মাণ, পাশাপাশি সমুদ্র প্রাচীর এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার মতো অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করা। বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনের অর্থ হলো বাংলাদেশ বন্যা এবং খরা উভয়ই সম্মুখীন হচ্ছে। সেচ এবং পানি সঞ্চয়সহ পানি ব্যবস্থাপনার উন্নতি এই ইভেন্টগুলোর প্রভাব হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌর এবং বায়ু শক্তির মতো পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎসগুলোর ব্যবহারকে উৎসাহিত করা গ্রামাঞ্চলে শক্তির সুযোগ সরবরাহ করার পাশাপাশি নির্গমন হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে। রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের শহরগুলোতে তাপপ্রবাহের প্রভাব কমাতে শহুরে সবুজায়ন একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আতিক রহমান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ''জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় থাকা দেশের মধ্যে একটি হচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার দিক থেকে বাংলাদেশের হয়তো খুব বেশি কিছু করার নেই। কারণ সমস্যাটা তো বৈশ্বিক। সেটার সমাধানের জন্য উন্নত দেশগুলোর দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে। আমাদের এখানে এখন দুর্যোগ বেশি হচ্ছে, নদী ভাঙন বাড়ছে, বেশি বেশি ঝড়- বন্যা হচ্ছে। সেইসঙ্গে উত্তরবঙ্গে শুষ্কতা তৈরি হচ্ছে আর দক্ষিণবঙ্গে লবণাক্ততা বাড়ছে। এসব কিছুই হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে।'

তিনি বলেন, ‘তাপপ্রবাহ এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা এবং জনস্বাস্থ্য শিক্ষার সুযোগসহ জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোর উন্নতি এই প্রভাবগুলো প্রশমিত করতে সহায়তা করতে পারে। উষ্ণ তাপমাত্রার প্রভাব হ্রাস করার জন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ, টেকসই কৃষির প্রচার, গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং পুনরায় বনায়ন এ সমস্ত ব্যবস্থা যা জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে এবং গরম তাপমাত্রার প্রভাব হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে।

আতিক রহমান আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উল্লেখযোগ্য এবং দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকিস্বরূপ। তবে অভিযোজন ও প্রশমন কৌশলে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হ্রাস করতে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দেশের টেকসই ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যত নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর সমাধান বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য।’

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ