বাংলাদেশ এখন পারমাণবিক শক্তিধর দেশ
বিশ্ব জ্বালানি মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল বাংলাদেশ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি সংযোজনের মধ্য দিয়ে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করেছে। বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে এই সক্ষমতা অর্জন করেছে। এটি শুধু একটি প্রতীকী অর্জন নয় বরং একটি সুপরিকল্পিত ধাপে ধাপে বাস্তবায়নাধীন জাতীয় জ্বালানি কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি স্বপ্নের বাস্তবায়ন। প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি রিয়্যাক্টর রয়েছে, প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, কেন্দ্রটি পূর্ণমাত্রায় চালু হলে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ সরবরাহ করতে সক্ষম হবে, যা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
২৮ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করেছে। এই ধাপকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা হয়। জ্বালানি লোডিংয়ের পরপরই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয় না; বরং একাধিক ধাপের নিরাপত্তা পরীক্ষা, রিয়্যাক্টর স্টার্টআপ এবং ধীরে ধীরে পাওয়ার বাড়ানোর একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এই প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। শুরুতে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৫–৩০ শতাংশ। এরপর প্রতি মাসে ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়িয়ে ৮ থেকে ১০ মাসের মধ্যে ইউনিটটি পূর্ণ সক্ষমতায় অর্থাৎ ১,২০০ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্ট নাগাদ প্রথম বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যদি সব প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়। একই সময়ে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং একই বছরেই সেখানে জ্বালানি লোডিং শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে অতিরিক্ত ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। ফলে পুরো রূপপুর কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ২,৪০০ মেগাওয়াট, যা দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনবে।
এই প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর অর্থনৈতিক প্রভাব। যদিও প্রাথমিক বিনিয়োগ অত্যন্ত বেশি, তবে দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক বিদ্যুৎ তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। কারণ ইউরেনিয়াম জ্বালানির শক্তি ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, ফলে অল্প পরিমাণ জ্বালানিতে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এতে উৎপাদন ব্যয় কমে আসে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধারাবাহিক উৎপাদন সক্ষমতা। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো যায়, ফলে উৎপাদনের স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। বড় পরিসরের উৎপাদনের কারণে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় খরচ কমে যায়, যা “ইকোনমি অব স্কেল” হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দামের ওঠানামা এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলে না, ফলে বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে।
প্রযুক্তিগতভাবে রূপপুরে ব্যবহৃত হচ্ছে ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর, যা রাশিয়ার রোসাটম (Rosatom) উন্নয়ন করেছে। এটি একটি আধুনিক প্রেসারাইজড ওয়াটার রিয়্যাক্টর প্রযুক্তি, যেখানে নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিটি ইউনিট থেকে প্রায় ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এতে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় শাটডাউন সিস্টেম, প্যাসিভ কুলিং ব্যবস্থা এবং বহুস্তরীয় কনটেইনমেন্ট স্ট্রাকচার, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘ ৬০ থেকে ৯০ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
রূপপুর থেকে বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি খরচ এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। তবে বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি গড়ে ৪ থেকে ৪.৫ টাকা প্রতি ইউনিট হতে পারে, বিশেষ করে প্রাথমিক দুই দশকে। আবার কিছু আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে এটি ৮ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যা নির্ভর করে ঋণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয়ের ওপর। দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই বিদ্যুৎ দেশের অন্যতম সাশ্রয়ী উৎসে পরিণত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. ইকবাল মাহমুদ ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘রূপপুর প্রকল্প দেশের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াবে এবং নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে।’ তিনি বলেন, পারমাণবিক নিরাপত্তা ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (নিনমাস) এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই প্রকল্প বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানও শক্তিশালী করবে। রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে দেশটি একটি নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে, যা ভবিষ্যতে আরও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার পথ খুলে দেবে।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে পারমাণবিক শক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশও সেই ধারায় যুক্ত হয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পারমাণবিক শক্তির সমন্বয়ে একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার মাধ্যমে দেশ প্রথমবারের মতো পারমাণবিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করেছে, যা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই কেন্দ্র থেকে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, ফলে শিল্পখাত, কৃষি ও অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’ তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রকল্প দেশের জন্য সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ নিশ্চিত করবে এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাবে। পাশাপাশি এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে বিশ্ব দরবারে দেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে